Pages

Tuesday, 17 February 2026

আধ সের দুধ - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



সকালের সূর্য সবে খানিকটা উপরে উঠেছে। সূর্যের প্রতিবিম্বটা পুকুরের টলটল জলের তোলে খাবি খাচ্ছে। বেলা হয়ে গেছে দেখে লোকজন মাঠের কাজকর্ম থামিয়ে আলে বসে ভাতপন্তা খাচ্ছে। তাদের কেউ কেউ মেঠো পথ বেয়ে বাড়ি ফিরছে, লাহারি খাবে বলে।  আমি তখন আমাদের বৈঠকখানার সামনে দাওয়ায় বসে আপন মনে খেলা করছিলাম। চটের একটা বস্তা বিছিয়ে, তাতে একদিকে কাঠের তৈরি স্কুল, একদিকে কঞ্চির তৈরি বাড়ি, আর কটা মাটির পুতুল, এসব নিয়ে ঘর-সংসার খেলা খেলছিলাম। হঠাৎ পাশে কোথাও একটা কান্নার রোল উঠলো। হুড়মুড় করে সবাই সেদিকে ছুটছে দেখে আমিও ছোট ছোট পায়ে গুটি গুটি কদমে এগিয়ে গেলাম। দেখি, জাহানারা চাচি হাউমাউ করে কাঁদছেন। আর থেকে থেকে দু’ হাতে বুক চাপড়াচ্ছেন। প্রায় মূর্ছা যাওয়ার মতো অবস্থা তাঁর। এমন আহাজারির কারণ, তাঁর দুধেল গাইটা কিছুক্ষণ আগেই মারা গেছে। সেই গাইটাই ছিল তাঁর একমাত্র সম্বল। ওই গাইয়ের দুধ বিক্রি করে যে দু’ পয়সা ঘরে আসত তা দিয়েই তাঁর সংসার চলতো। তাই এবার আক্ষরিক অর্থেই তাঁর পথে বসার মতো অবস্থা। তিনি এবার সম্পূর্ণ রূপে নিঃস্ব ও অসহায় হয়ে পড়েছেন।  
 
ওই ক’বছর আমাদের গ্রামে এক অদ্ভুত রকমের বালা-মসিবত নেমে এসেছিল। হঠাৎ হঠাৎ লোকজনের গরু মরে যেতো—কখনো পোষানি গরু, কখনো হালের, কখনো দুধেল গাই, কখনো বা বাছুর। আজ এ বাড়ি তো কাল ও বাড়ি—কার ঘরে কখন যে বিপদ সেঁধিয়ে যায়, কেউই জানে না। আমাদের বাড়িও সেই অদৃশ্য ছায়ার বাইরে ছিল না। একদিন গোধূলি বেলায় আমাদের গাভীটাও আমাদের সবাইকে ছেড়ে পাড়ি জমাল না-ফেরার দেশে।   
 
আমি তখন খুব ছোট। প্রাইমারী স্কুলের পাশাপাশি গ্রামের মক্তবে পড়াশোনা করি। শরীরটা ছিল বেশ নরমসরম, রোগা-পাতলা। সেই কারণেই যখন আমাদের বাড়ির গাভীটা মারা গেল, বাবা আমার জন্য আলাদা করে উঠানি দুধের ব্যবস্থা করলেন। গ্রামের এক পরিচিত ভরসাযোগ্য লোকের বাড়ি থেকে রোজ আধ সের দুধ আসত—শুধু আমার জন্য। কেননা তখন গ্রামে প্রায় দুধের আকাল চলছিল।  
 
আর পাঁচটা দিনের মতো সেদিনও দুধ এনে রাখা হয়েছিল হেঁশেলের পাশে একটা হাঁড়িতে। বাবা বাইরে কোথাও কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আমি উঠোনে খেলছিলাম—ছোটদের খেলা যেমন হয়, কখনো দৌড়চ্ছি, কখনো লাফাচ্ছি, এটা ধরছি, ওটা ছুঁড়ছি। খেলতে খেলতেই অসাবধানতায় আমার পা লেগে গেল দুধের হাঁড়িতে। মুহূর্তের মধ্যে ছলাৎ করে সব দুধ মাটিতে পড়ে গেল। ঝুকে দেখলাম, হাঁড়িতে এক ফোঁটাও নেই। আমি স্থির দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। বিস্মিত ও হতবাক। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। ভয় আর অপরাধবোধ একসাথে চেপে বসল মনে। ঠিক তখনই বাবা বাড়ি ফিরলেন। ঢুকেই তাঁর চোখ পড়ল খালি হাঁড়ির দিকে। একটু থেমে বললেন,
—“হায় আল্লাহ্‌, দুধলা কী হলি?”
 
কণ্ঠে রাগের চেয়ে উৎকণ্ঠাই ছিল বেশি। আমি কিছু বলার আগেই মা এগিয়ে এলেন। তাঁর চোখেমুখে তখন অদ্ভুত এক তাড়াহুড়ো, যেন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে তাঁকে। বাবা আবার বললেন,
—“ভায়া আইজ কী খাবি? দুধ না খাইলে ওর শরীর চলবি কেমন করি?”
 
মা এক মুহূর্ত থেমে খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন,
—“মোর হাত লাগি পড়ি গেইছে। হাঁড়িটা নড়োবা যাই উল্টেই ফেলেইছু।”
 
আমি অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকালাম। মা চোখ ফেরালেন। খুব নিচু স্বরে বললেন,
—“চুপ করি থাক, তুই এটা কাথাও কইবানিস।”
 
বাবার রাগ তখন যেন কেবল দুধের উপর নয়, গিয়ে পড়লো নিয়তির উপর। আপন মনে বিড়বিড় করে উঠলেন,
—“গাইটা মরি গেল, মাইনষের বাড়ি থাকি এনা দুধ আইন্‌ছু, সেইটাও পড়ি গেল! ছোয়ালটা মোর খাবি কী? কপালত যে কী আছে আল্লাহ্‌...!”
 
মা জানতেন, তিনি যদি সত্যি কথাটা বলে দেন— “মাতিন ফেলেই দিছে”, এই রাগের মুহূর্তে বাবার হাতও উঠতে পারে। সন্তানের গায়ে আঁচড় লাগুক, এটা তিনি কোনোভাবেই চাননি। কোনো মা-ই তা চাইতেন না। তাই সব দোষ নিজের কাঁধেই তুলে নিলেন।  
 
কিন্তু বাবার উৎকণ্ঠা কমল না।
—“এনা সাবধানে থাকিবু তো। এই ছোয়ালটার দুধেই তো ভরসা। কী খাবি ছোয়ালটা এখন!”
 
মা এবার আরও সংযত হলেন। বললেন,
—“মাইনষেরই তো ভুল হয়। মুই তো আর ইচ্ছা করি ফেলাওনি।”
 
কথার পিঠে কথা জমতে জমতে দুশ্চিন্তা রূপ নিল বিরক্তির, বিরক্তি রূপ নিল ঝগড়ার। তাঁদের উভয়েরই কণ্ঠে তখন আবেগ, উৎকণ্ঠা, নিয়তি ও অসহায়ত্ব একে অপরকে ধাওয়া করছিল। আমি এক পাশে দাঁড়িয়ে, হতবুদ্ধি ও নির্বাক। ঝগড়ার কেন্দ্রে আমি—যার জন্য দুধ, যার জন্য রাগ, যার জন্য মিথ্যে, যার জন্য এই সমস্ত অশান্তি।
 
সেদিন তাঁদের কেউ আমাকে একটা চড়ও মারেনি। কিন্তু দু’জনেরই বুক কেঁপে উঠছিল আমার জন্য। দু’জনেরই উৎকণ্ঠা ছিল আমাকে ঘিরে। আজ অনেক বড় হয়ে বুঝি— ওটা আসলে ঝগড়া ছিল না। ওটা ছিল ভালোবাসার দু’ রকম প্রকাশ। ভিন্ন রকমের দু’টি অভিব্যক্তি। একজন বাবার কঠিন কণ্ঠের আড়ালে লুকিয়ে ছিল অসহায় প্রশ্ন— “ছেলে আজ কী খাবে?” আর একজন মায়ের নীরব আত্মত্যাগ— যেখানে সত্য নয়, সন্তানের নিরাপত্তাই ছিল সবচেয়ে বড় সত্য।
 
সেদিন উঠোনের শুষ্ক মাটিতে ওই আধ সের দুধ অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই শুকিয়ে গেছিল, কিন্তু সেই স্মৃতি আজও আমার মানসপটে ভেজা। সেদিন মায়ের মিথ্যায় কোনো ছলনা ছিল না, বাবার রাগ ও উৎকণ্ঠায় নির্মমতা ছিল না, ছিল নিখাদ ভালোবাসা, যে-ভালোবাসা এই পার্থিব জীবনে মা-বাবা ছাড়া আর কেউ যে দিতে পারে না...!  
 
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা

No comments:

Post a Comment