Pages

Tuesday, 17 December 2019

মিখাইল নুআইমাহ


মিখ়াইল নুআইমাহ্‌
(১৮৮৯ – ১৯৮৮ খ্রি)
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
 
জন্ম ও পরিচয়ঃ
উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে যে সব শিক্ষাবিদ ও সুসাহিত্যিক আরবী ভাষা ও সাহিত্যের আধুনিকীকরণ ও বিশ্বসাহিত্যে তার পরিচয় তুলে ধরার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন তাঁদের মধ্যে প্রখ্যাত ভাষাবিদ ও সাহিত্যিক মিখ়াইল নুআইমাহ্ও ছিলেন অন্যতমতিনি ১৮৮৯ সালে বাস্‌কান্‌তাতে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর নাম মিখ়াইল নুআইমাহ্‌ বাল্যকালে তিনি পিতামাতার পরম আদরস্নেহে লালিত পালিত হন। ছোটবেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী এবং খুবই বিনয়ী ও নম্র প্রকৃতির ছিলেন। মেধা ও চরিত্রগুণে মা-বাবার মন জয় করতে পেরেছিলেন। ফলে পুরো পরিবারের পরম আদরের পাত্র ছিলেন
 
শিক্ষার্জনঃ
জন্মস্থানেই প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। অতঃপর ১৮৯৯ সালে রুসিয়া মাদ্‌রাসায় ভর্তি হন। এই মাদ্‌রাসাটি অর্থোডক্স বংশধরদের খিদমত করার জন্য সে দেশে তৈরি হয়েছিল। অতঃপর তিনি ১৯০২ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য ফিলিস্তিনের নাসেরাহ্‌-তে যান। সেখানে দীর্ঘ ছয় বছর অতিবাহিত করেন। চতুর্থ বছরের পাঠ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই উচ্চ শিক্ষার জন্য সরকারের পক্ষ হতে বৃত্তি লাভ করেনঅতঃপর ১৯০৬ সালে বোলতাফার আর্‌-রূহীতে চলে যান। সেখানে রাশিয়া সাহিত্য অধ্যয়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং টলস্টয়ের রচনাসমূহ অধ্যয়নে মনোসংযোগ করেন। কিন্তু ১৯১১ সালে তিনি রাশিয়ার প্রতি বিদ্রোহী মনোভাব নিয়ে লেবাননে ফিরে আসেন। অতঃপর এ বছরে তিনি নিজ ভাইয়ের সাথে ওয়াশিংটনে সফর করেন। এবং সেখানে ইংরেজী সাহিত্য পড়া শুরু করেন, যা তাঁকে পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পাঠে সহযোগিতা করেছিল।
 
উচ্চশিক্ষা ও কর্মব্যস্ততাঃ
মিখ়াইল নুআইমাহ্‌ ১৯১১ সালে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পর লেবানন থেকে ফিরে আসেন এবং আমেরিকার সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। কিছুদিন সেনাবাহিনীতে চাকুরী করার পর ফ্রান্স যাত্রা করেন। অতপরঃ সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ফ্রান্সের ইতিহাস ও সাহিত্য অধ্যায়ন করেন। ক’বছর বাদে মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রে তিনি প্রত্যাবর্তন করে  সেখানে এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ আরম্ভ করেন। ১৯১৬ সালে তিনি ওয়াসিংটন বিশ্বাবদ্যালয় থেকে আইন শাস্ত্রে ডক্টরেট লাভ করেন।
 
ব্যাক্তিগত জীবনে তিনি জিব্‌রান খালীল জিব্‌রানের ঘনিষ্ট সহচর ছিলেন। জিব্‌রানের ইয়াসূ’ ইব্‌নু ইন্‌সান গ্রন্থে সংকলিত মিখ়াইল নুআইমাহ্‌র অনেকগুলো চিঠি তার উল্লেখযোগ্য প্রমাণ। ১৯২০ সালে তিনি আর্‌-রাবেতাহ্‌ আল্‌-কালামিয়্যাহ্‌ প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেন। ১৯৩১ সালে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী খালীল জিব্‌রানের মৃত্যুর পর লেবাননে ফিরে আসেন।
 
চিন্তাধারাঃ
এরপর মিখ়াইল নুআইমাহ্‌ নিজ কাজে গভীর ভাবে মনোযোগী হয়ে পড়েন। চিন্তাচেতনার জগতে ডুবে যেতে লাগলেন। খানিকটা নির্জনতা প্রিয় হয়ে পড়লেন। কোলাহলপূর্ণ জনসমাজ থেকে দুরে থাকতে আরম্ভ করলেন। চিন্তাভাবনা দ্বারা উম্মুক্ত ও উদ্ভাসিত অবস্থার মূল এবং অস্তিত্বের রহস্য উদঘাটনে চেষ্টা করতে লাগলেনআর নির্দিষ্ট পরিকল্পনা মাফিক কাজের মাধ্যমে চুপিচুপি নিজ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলেন
 
পাশ্চাত্য কাব্যকবিতা ও সাহিত্যের প্রভাব বিংশ শতাব্দীর প্রথম তিন দশকের যে সব কবিদের উপর প্রকট মিখ়াইল নুআইমাহ্‌ও তার ব্যতিক্রম নন। এই প্রভাব তাঁর চেতনার রাজ্যে যুগান্তকারী ক্রিয়া করে এবং তারই প্রতিফলন বিধৃত হয়েছে তাঁর সমগ্র শিল্পকর্মে। কবি ধ্যানস্থ, আত্মস্থ এবং সর্বোপরি বিদ্রোহী। বিবর্তন-প্রয়াসী কবির কাব্য-গ্রন্থ দীওয়ানগুলি সেই ধারারই জ্বলন্ত স্বাক্ষর। অত্যাচারিতশোষিত সমাজ জীবনের ধ্বংসস্তুপের উপর দাঁড়িয়ে কবির প্রশ্ন আমরা কোথায় আছি, কোথায়? কোথায়? আত্মীয়স্বজন নেই আমাদের; নেই প্রতিবেশী। কবির বিদ্রোহ ক্লেদাক্ত সমাজ জীবনের বিরুদ্ধে। কবির সমস্থ যন্ত্রনা দলিত-মথিত হয়ে এমন কাব্য-কুসুমের জন্ম দিয়েছে যার ঘ্রাণ সমগ্র বিশ্বের হাওয়ায় স্পন্দিত। কবিতার ধ্বংসস্তুপের উপর নব পদ্ধতির প্রাসাদ রচনার তিনি প্রয়াসী। এই শিল্প চেতনাই তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে নব রুপায়ণের লক্ষ্যে। কবি অতি মাত্রায় পাশ্চাত্য প্রভাবে প্রভাবিতআর এর একমাত্র কারণ হল এই যে লেবানে জন্মগ্রহণ করলেও কবির দীর্ঘজীবন কেটেছে রাশিয়া এবং আমেরিকায়।
 
সৃজনশীল ব্যাক্তিত্বঃ
আইন বিধানের শিক্ষক হওয়ার জন্য তিনি অতুলনীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম, মেধা ও চিন্তা শক্তির দ্বারা আরবী সাহিত্যের আধুনিকীকরণ করেছেন। তিনি অসংখ্য সাহিত্য রচনা করে আরবী সাহিত্যের জগৎকে নতুন রুপ দিয়েছেনআরবী সাহিত্যের আধুনিকীকরণ ও সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো বেশ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেতিনি ২৫টিরও বেশী গ্রন্থ বহু প্রবন্ধ রচনা করেছেন, যেমন— যাদুল্‌ মা‘আদ, আল্‌—য়াদির, আল্‌-আওসান, সাওতুল্‌ ‘আলাম, আন্‌-নূর ওয়াদ্‌ দাইহূর, ফী মাহাব্‌বির্‌ রীহ, দারূব, আব্‌‘আদু মিন মোস্কো ওয়া মিন্‌ ওয়াশিন্‌তান, আল্‌-মারাহিল। এছাড়া তিনি অনেক গল্প কাহিনী লিখেছেন যেমন— হাওয়ামিশ, আবূ বাত্‌তাহ্‌, কানা মা কানা, ইয়া ইব্‌না আদাম, আল্‌-ইয়াওমুল্‌ আখীর, মির্‌দাদ, লেকা, মুজাক্‌কারাতুল্‌ আর্‌কাশ, আকাবির। তিনি বহু নাটক রচনা করেছেন যেমন— আইয়ুব, আল্‌-ওয়ারাকাতুল্‌ আখীরাহ্‌, আল্‌-আবাউ ওয়াল্‌ বানূন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক গ্রন্থ রচনা করে আরবী সাহিত্যের জগতে এক নতুন দিগন্তের সুচনা করেন। প্রবন্ধ, গল্প, কাহিনী, নাটক, রম্য রচনা, দৃষ্টান্ত মুলক কবিতা, চিঠিপত্র, পূর্বের ইতিহাস ঐতিহ্য, বিভিন্ন মনীষীদের জীবনী সংক্রান্ত বিষয়ে পৃথক পৃথক গ্রন্থ রচনা করে স্বীয় অবদান অক্ষুন্ন রেখেছেন
 
মৃত্যুঃ
প্রায় এক শ’ বছরের দীর্ঘ জীবনে নানা বিষয়ে অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করে, আরবি সাহিত্য ও আরব সমাজকে নানা আঙ্গিকে নানা ভাবে সমৃদ্ধ করে ২২শে ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮ সালে আশ্‌-শাখ্‌রূব গ্রামে ইহলোক ত্যাগ করেন।

তুমি ভালোবাসাকে ভয় পেয়ো না!


তুমি ভালোবাসাকে ভয় পেয়ো না!
জিব্‌রান খালিল জিব্‌রান, লেবানন  
অনুবাদ- আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

তুমি বলছ, তুমি ভালোবাসাকে ভয় পাও!  
কিন্তু কেন ভয় পাও ভালোবাসাকে?
তুমি কি বসন্ত আসবে বলে ভয় পাও ভালোবাসাকে!
 
দেখো, ভয় পেয়ো না কী হবে ভয় পেয়ে!   
আমরাই তো একদিন আশ্রয় নেবো ভালোবাসার কাছে 
যদিও ভালোবাসা সুখের আবেশে যাতনা বয়ে আনে।  
ভালোবাসা তো খানিকটা মৃত্যুর মতো, বদলে দেয় সবকিছু।
 
তুমিও জানো, ভালোবাসার দিনগুলি কী মিষ্টি!
কত ভালো লাগে বলো, জেগে স্বপ্ন দেখতে!
যদিও সে পথে অবশেষে জোটে যাতনা
আর যাতনার রাতগুলো ভীষণই বিষাদময়
অত্যন্ত ভয়ঙ্কর তার প্রতিটা মুহূর্ত।
 
তবে তুমি ভেবো না, ভালোবাসাকে তুমি চালিত করবে; 
এটা হবে না। বরং ভালোবাসাই
যদি তুমি উপযুক্ত হও ঘুরিয়ে দেবে তোমার পথ
চালিত করবে তোমাকে তার পথে তার মতো করে।
 
আর যে ভালোবাসা স্নাত হয় আঁখিজলে
সেই ভালোবাসাই হয়ে ওঠে সুন্দর
হয়ে ওঠে পবিত্র ও নির্মল, হয়ে ওঠে চিরস্থায়ী।
 
শোনো, দিনের শেষে যখন ভালোবাসা
তোমায় ইশারা করে, তোমার কাজ তার আনুগত্য করা  
যদিও ভালোবাসার পথ অমসৃণ ও কাঁটায় ভরা।
 
 
الحب - جبران خليل جبران
 
تقولين لي أنك تخافين الحب
لماذا تخافينه يا صغيرتي؟
أتخافين مجيء الربيع؟!
 
فلا تخافي الحب يارفيقة قلبي
علينا أن نستسلم إليهِ
رغم ما فيه مِن الألم والحنين
فالحب كالموت يغير كل شيء
 
فَما أحلى أيّامَ الحُبِّ!
ومَا أعذَبَ أحلامَها!
ومَا أمرَّ ليَاليَ الحُزنِ
ومَا أكثرَ مَخاوِفَها!
 
فلا تفكري يا حبيبتي
أن توجهي الحب في مساره
فالحب إن وجدكِ جديرةً به
هو الذي يوجه مسارك
 
والحب الذي تغسله
العيون بدموعها
يظل طاهراً وجميلاً وخالداً
 
وأخيراً
عندما يومئُ إليكم الحبّ اتبعوه
حتى لو كانت طرقاته وعرة وشائكة

Friday, 13 December 2019

আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ


আব্বাস মাহ়্মুদ আল্‌-‘আক়্ক়াদ

(১৮৮৯১৯৬৪ খ্রি)
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
  
আব্বাস মাহমুদ আল্‌-আক্কাদ একাধারে সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্য সমালোচক ছিলেন তিনি আরবি ভাষা আকাদেমির সদস্য ছিলেন জীবনে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তাঁর লেখনী কখনও থেমে থাকেনি তাঁকে বিংশ শতাব্দীর বিদগ্ধ মিশরীয় লেখকদের মধ্যে গণ্য করা হয় তিনি রাজনীতি ও সাহিত্য উভয় ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন অগাধ পাণ্ডিত্বের অধিকারী ছিলেন তিনি মানব সভ্যতার ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য ও সমাজ বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে তাঁর বুৎপত্তি ছিল ঈর্শনীয়

জন্ম ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা
আল-আক্কাদ মিশরের আসওয়ান শহরে ২৮ জুন ১৮৮৯ মোতাবেক ২৯ শাওয়াল ১৩০৬ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন তাঁর পিতা ছিলেন মিশরীয় আর মা ছিলেন কুর্দিশতাঁর বাবা মূলত দামিট্টার বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল খুব সামান্য কেবলমাত্র প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করতে পেরেছিলেন পরে তিনি বই কিনে এবং স্বশিক্ষণের মাধ্যমে অগাধ পাণ্ডিত্বের অধিকারী হয়েছিলেন  তিনি তাঁর সাপ্তাহিক ভাতা দিয়ে নানা ধরণের বই কিনতেন ধর্ম, ভূগোল, ইতিহাস এবং অন্যান্য অনেক বিষয় সম্পর্কে পড়াশোনা করেনদুর্দান্ত ইংরেজি এবং ফরাসি জন্য তাঁর খুব নামডাক ছিল । তিনি বিশেষ ভাবে জার্মান সাহিত্যে ওয়াকিবহাল ছিলেন ।

জীবন যাপন
তিনি একজন স্পষ্টবাদী রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ছিলেন এবং নিজ দেশের সরকারের সমালোচনা করার জন্য ১৯৩০ থেকে ১৯৩১ সালের মধ্যে কিছু সময়ের জন্য তাঁকে জেলও যেতে হয়েছিল১৯৪২ সালে যখন অ্যাডল্ফ হিটলারের বাহিনী মিশরের দিকে অগ্রসর হয়, তখন হিটলারের সমালোচনার জন্য প্রতিশোধের ভয়ে আল-আক্কাদ সুদানের দিকে পালিয়ে যায হিটলারের সামরিক আগ্রাসন ও নাৎসিবাদের তীব্র সমালোচনা ও বিরোধিতা করে তিনি বলেছিলেন, স্বাধীনতা, আধুনিকতা ও মানব অস্তিত্বের ক্ষেত্রে হিটলার সবচেয়ে বড় হুমকি তাছাড়া তিনি ফ্যাসিজম এবং কমিউনিজম উভয়ের বিরুদ্ধেও সরব ছিলেন তিনি দু'দিনের জন্য ওয়াফদ পার্টির সদস্য এবং পরবর্তীকালে চেম্বার অব ডেপুটিসের সদস্য হিসাবে মিশরের সংসদ সদস্যও হয়েছিলেন।

তিনি আল্‌-কুরআনের দার্শনিক অধ্যয়নের পাশাপাশি বহু ঐতিহাসিক মুসলিম নেতার জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি  দর্শন, ধর্ম এবং কবিতা সম্পর্কে শতাধিক বই লিখেছিলেন। ইব্রাহিম আল-মাজিনি এবং আব্দুর রহমান শুক্রিরকে সাথে নিয়ে মাদ্রাসাতুদ্ দিওয়ান নামে একটি কবিতা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার মাধ্যমে আধুনিক কবিতার পথ আরও প্রশস্ত হয় এবং নতুন নতুন আঙ্গিক আরবি কাব্যজগতকে অধিক সমৃদ্ধ করে তোলে  


মৃত্যু
আল-আক্কাদ ১২ মার্চ ১৯৬৪ মোতাবেক ২৬ শাওয়াল ১৩৮৩ হিজরিতে সকাল বেলা মৃত্যু বরণ করেন সেদিনই তাঁর লাশ দাফনের জন্য তার নিজ শহর আসওয়ান স্থানান্তরিত করা হয়।

সৃজনশীলতা ও রচনাসমূহ 
আল-আক্কাদ একজন বড় মাপের চিন্তক ও সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি শতাধিক বই এবং কয়েক হাজার প্রবন্ধনিবন্ধ রচনা করেছেন সাতটা বই নিয়ে গঠিত তাঁর আল্‌-‘আব্কারিয়্যাত সিরিজ পাঠককুলের কাছে বিশেষ ভাবে সমাদৃত হয়েছে তাঁর রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হলইয়াকজাতুস্সাবাহ (তাঁর প্রথম কাব্যসংকলন প্রকাশিত হয় ১৯১৬ সালে, তাঁর মোট দশটি দিওয়ান বা কাব্যসংকলন রয়েছে), আদ্‌-দীওয়ান ফিন্‌-নাক্দি ওয়াল্‌-আদাব (১৯২১), সারা (১৯৩৮), ওয়াহ্ইউল্আর্বায়ীন (১৯৪২), আল্‌-ফাল্সাফাতুল্কুর্আনিয়্যাহ্‌ (১৯৪৭), আদ্‌-দিমুকিরাতিয়্যাহ্ফিল্ইস্লাম (১৯৫২) ইত্যাদি  

ভেজাল প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা


ভেজাল প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা

আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
ইসলাম একটি কল্যাণকর এবং পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। তাই মানব জীবন ও সমাজ ব্যবস্থার জন্য যা কিছু অকল্যাণকর, ক্ষতিকারক ও নিকৃষ্ট সে-সব বস্তু, বিষয় ও পণ্য বর্জন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বভাবতই ভেজাল পণ্যের উৎপাদন, বিপণন ও সংরক্ষণ করা নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। বিষয়টির গুরুত্ব এতটাই যে কেয়ামতের দিন প্রাথমিক পর্বেই এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে; “(কেয়ামতের দিন) আদম সন্তানের পা তার প্রভুর সামনে থেকে একটুও নড়বে না যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাকে প্রশ্ন করা হবে, (১) সে তার জীবন কী কাজে ব্যয় করেছে, (২) যৌবন কীভাবে কাটিয়েছে, (৩) তার অর্থসম্পদ কীভাবে আয় করেছে (৪) এবং কোন পথে ব্যয় করেছে, () যে জ্ঞান অর্জন করেছিল সে অনুযায়ী কতটুকু আমল (কাজ) করেছে?” [তিরমিযি ২৪১৬; সিল্‌সিলাহ্‌ সাহীহাহ্‌, আল্‌বানি ৯৪৬]
ইসলাম ও ব্যবসাবাণিজ্য— ইসলাম ব্যবসাকে হালাল করেছে এবং সুদকে হারাম [আল্‌-বাকারা ২৭৫]। কারণ আদানপ্রদান সমাজ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম। তাই ইসলামে ব্যবসা একটি মহতী পেশা। নবী (সা) বলেছেন, “বিশ্বস্ত ও সৎ ব্যবসায়ীরা কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদগণের সঙ্গে থাকবেন।” [তিরমিযি ১২০৯] এবং ব্যবসাসহ উপার্জনের নান মাধ্যমে জীবিকা অনুসন্ধান করার নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন, “সালাত সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করো।” [সূরা আল্‌-জুমুআ’হ্‌ ১০]
শুধু অনুসন্ধানের নির্দেশ নয়, হাদিসে স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছে যে, ইসলামের দৃষ্টিতে জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে একটি অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে নিষ্ঠা ও সততার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করা। এমন এক প্রসঙ্গেই একবার রাসুল (সা)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “নবীজি (সা), সর্বোত্তম উপার্জন কোনটি?” জবাবে তিনি (সা) বলেছিলেন, ব্যক্তির শ্রমলব্ধ উপার্জন এবং সততার সঙ্গে ক্রয়-বিক্রয় করা।” [মুস্‌নাদ আহমাদ; সাহীহুত্‌ তারগীব ২/১৬৮৮]
তাছাড়া নবী মুহাম্মদ (সা) নিজেও একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসা ক্ষেত্রে তাঁর সততা ও দূরদর্শিতায় মুগ্ধ হয়ে মা খাদিজা (রা) তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তাই তাঁর জীবনাদর্শের এই দৃষ্টিকোণ সম্বন্ধেও চর্চা করা ভীষণ জরুরী। যাতে পারস্পরিক লেনদেনের এ উত্তম পন্থাকে কেউ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে কলুষিত না করে ফেলে। এবং এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্‌ এভাবে সতর্ক করেছেন যে, “হে মোমিনরা! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো নাতবে তোমাদের জন্য পরস্পর সম্মত হয়ে ব্যবসা করা বৈধ।” [সূরা আন্‌-নিসা ২৯]
ইদানীং সমাজের প্রায় সব স্তরেই আর্থিক মুনাফাই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আজকাল লোকজন সব কিছুতেই মুনাফা খোঁজে; এমনকি আত্মীয়তা করা থেকে সামাজিক কাজকর্ম সব ক্ষেত্রেই। যার কারণে দুর্নীতি, অসৎ উপায়, অপকৌশল সমাজ ব্যবস্থাকে জীর্ণ করে তুলেছে। অতএব এসব বিষয়ে একজন মুসলিমের জ্ঞাত হওয়া ও বাস্তব জীবনে তার অনুশীলন করা আবশ্যক বলে আমি মনে করি।
বিক্রির জন্য মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া অনৈতিক— বর্তমানে হাটেবাজারে অহরহ চোখে পড়ে, বিক্রেতা কখনো বাড়িয়ে দাম বলে বা লিখে রাখে তো কখনো জিনিসপত্রের গুণগত মান নিয়ে কারসাজি করে। এবং সব শেষে এসব প্রমাণ করতে মিথ্যা কথা তো কখনো মিথ্যা কসম (শপথ)-এর আশ্রয় নেয়। যার কারণে অধিকাংশ সময় ক্রেতা প্রতারণার শিকার হয়। তাই ইসলাম অসৎ ব্যবসায়ীদের সাবধান করেছে। নবী (সা) বলেছেন, হে ব্যবসায়ী লোকেরা! (মনে রেখো) কেয়ামতের দিন ব্যবসায়ীরা মহাপাপীরূপে হাজির হবে। তবে তারা নয়, যারা আল্লাহকে ভয় করে এবং সততা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে ব্যবসা করে।” [তিরমিযি ১২০৯, সিল্‌সিলাহ্‌ সাহীহাহ্‌ আল্‌বানি ৯৯৪]
যেহেতু প্রাক্‌-ইসলামী যুগ থেকেই ভেজাল, নকল ও নিম্নমানের পণ্য ক্রেতার হাতে গছিয়ে দেওয়ার জন্য মিথ্যা বলা ও মিথ্যা শপথ করার প্রচলন রয়েছে। তাই এই ঘৃণ্য প্রথাকে রুখতে ইসলাম মিথ্যুক ও অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন শাস্তির বিধান দিয়েছে। রাসুল (সা) বলেছেন, “আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিনে তিন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলবেন নাতাদের দিকে তাকাবেন নাতাদেরকে পবিত্র করবেন না। এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” তিনি তিনবার এ কথাগুলি বললেন। অতঃপর আবু যার (রা) জিজ্ঞেস করলেন, ওরা কারা? উত্তরে বললেন— “(১) যে ব্যক্তি অহংকারবশত টাখনুর (পায়ের গিঁট) নিচে কাপড় পরে, () যে ব্যক্তি দান করে খোঁটা দেয়, () আর যে ব্যক্তি মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রি করে।” [মুসলিম ১০৬] এজন্যই নবী (সা) প্রায়শই ব্যবসায়ীদেরকে এ বিষয়ে সতর্ক করে বলতেন, ওয়াসিলা ইব্‌নু আল্‌-আস্‌কা’ হতে বর্ণীত, হে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, মিথ্যাচার থেকে দূরে থাকো।” [তাবারানি ২২/১৩২, সাহীহুত তারগীব ৩/১৭৯৩]
অন্য একটি হাদিসে, যারা মিথ্যা শপথের আশ্রয় নিয়ে ভেজাল পণ্য বা নিম্ন মানের জিনিস চড়া দামে বা অধিক দামে বিক্রি করে, তাদের জন্য তিরস্কার ও অভিশাপও উচ্চারিত হয়েছে। নবী (সা) বলেছেন, “যদি তারা সত্য বলে ও যথাযথ অবস্থা বর্ণনা করে; তবে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ে বরকত হবে। আর যদি পণ্যের প্রকৃত অবস্থা গোপন করে ও মিথ্যা বলে তবে ক্রয়-বিক্রয়ের বরকত চলে যাবে।” [বুখারি ১৯৭৩, মুসলিম ১৫৩২]
পণ্যে ভেজাল মেশানো একধরণের প্রতারণা— সাধারণত মানুষ শাকসবজি থেকে আসবাবপত্র, জমিজায়গা থেকে ঘরবাড়ি কোনো কিছু কেনার সময় একজন বিশ্বস্ত বিক্রেতা বা মাধ্যম খোঁজে। যাতে তার কেনা জিনিসপত্রের গুণগত মান ঠিক থাকে এবং তা সাশ্রয়ী হয়। তাই পণ্যে ভেজাল মিশিয়ে ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়া আক্ষরিক অর্থেই ক্রেতার প্রতি অবমাননা এবং তার ক্ষতি করা। সহজ করে বলতে গেলে ক্রেতার সাথে প্রতারণা করা। এবং যেকোনো রকমের প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা ইসলামে হারাম। প্রতারণা এতটাই ঘৃণ্য যে প্রতারককে বহিষ্কারের শাস্তি শোনানো হয়েছে। এক ব্যক্তি ভেতরে ভেজা এবং উপরে শুকনো খাবার রেখে পসরা সাজিয়েছিল। তা জানতে পেরে নবী (সা) তাকে বলেছিলেন, “যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” [মুসলিম ১০২, তিরমিযি ১৩১৫]।
অতএব ব্যবসার এই অসাধু পদ্ধতি বা পণ্যে ভেজাল মেশানো ইসলামি আদর্শের বহির্ভূত কাজ। কেননা, পণ্যে ভেজাল মিশিয়ে বিক্রি করলে ক্রেতারা জুলুমের শিকার হন। বলা বাহুল্য, এটি অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ বা কবজা করার অপকৌশল। এবং অন্যের সম্পদ হরণ ইসলামে যে নিষিদ্ধ তা সবার জানা। মহান আল্লাহ বলেছেন, “হে বিশ্বাসীরা! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।” [সূরা আন্‌-নিসা ২৯]
ভেজাল একটি মানবতা-বিরোধী জঘন্য অপরাধ— ভেজাল খাদ্য ও পণ্য পরিবেশন করে আমরা অন্যের মারাত্মক ক্ষতি করি। তাই এটি মানবতাবিরোধী একটি জঘন্য অপরাধ। এতে ব্যক্তি শুধু অপরের ক্ষতি করে তা নয়, সে নিজেও অন্যের ভেজালে আচ্ছাদিত হয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সহজ করে বললে, আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে ধ্বংসের পথে এগিয়ে দিচ্ছি। আর এধরণের সকল বিষয়ে মহান আল্লাহ সতর্ক করে বলেছেন, “তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না।” [সূরা আন্‌-নিসা ২৯], বা “তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে ধ্বংস করো না।” [আল্‌-বাকারা ১৯৫] এবং এই বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে নবী (সা) আদেশ করেছেন, “তোমরা নিজেদের ক্ষতি করো না এবং অন্য কারও ক্ষতি করো না।” [ইব্‌নু মাজাহ্‌ ২৩৪০]।
বর্তমান সময়ে খাদ্যজাতীয় পণ্যে ভেজালের প্রবণতার ফলে খাদ্যদ্রব্য অস্বাস্থ্যকর এমনকি বিভিন্ন মারণ রোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে; এ কথা আমরা সকলে জানি। ভেজালের এই বিষাক্ত ছোবলে আজ বর্তমান প্রজন্ম ধ্বংসের সম্মুখীন। তাই আমি মনে করি ভেজালের এই রমরমা বাজার আদতে একধরণের গুপ্ত হত্যার বা সমাজের জন্য আত্মহননের নামান্তর। আর যা কিছুই প্রাণ নাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায় সেসবই অপরাধের আওতায় পড়ে। এবং হত্যা ও ধ্বংসলীলা যে সর্বাধিক জঘন্যতম অন্যায় ও অপরাধ তা শিশুরও জানা কথা। আর হত্যার জঘন্যতা প্রকাশ করে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্‌ ঘোষণা করেছেন, নরহত্যা অথবা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কর্ম করা হেতু ব্যতীত কেউ যদি কাউকে হত্যা করে সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকে হত্যা করল।” [সূরা আল্‌-মায়িদা ৩২]
অসাধু ব্যবসায়ীর পরিণতি— ব্যবসা জীবিকা উপার্জনের একটি অন্যতম মাধ্যম। তাই ব্যবসাবাণিজ্যকে বৈধ করা হয়েছে। এবং ব্যবসার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে নবী (সা) এ ক্ষেত্রে বরকত (সমৃদ্ধি)-এর জন্য বিশেষভাবে দুয়া করেছেন। তাই একজন ব্যবসায়ীর জন্য ব্যবসার ক্ষেত্রে আল্লাহর আদেশনিষেধ মেনে চলা একান্ত কর্তব্য। এবং অবহেলা ও অপকৌশল থেকে দূরে থাকা অপরিহার্য। কেননা আমরা যেখানেই থাকি না কেন আল্লাহ্‌ আমাদের সঙ্গে আছেন (অর্থাৎ জ্ঞান দিয়ে আমাদেরকে পরিব্যপ্ত করে রেখেছেন)। আর আমরা যা কিছু করছি তিনি দেখছেন। [সূরা আল্‌-হাদিদ ৪] তাই পণ্যে ভেজাল মিশিয়ে দুনিয়ায় পার পেয়ে গেলেও পরকালীন প্রায়শ্চিত্ত অবশ্যম্ভাবী। ঠিক একারণেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল একটি মেয়ে, যখন তাকে তার মা দুধে জল মেশানোর জন্য পীড়াপীড়ি করছিল, মেয়েটি বলেছিল, “খলীফা না দেখলেও আল্লাহ্‌ তো দেখছেন।” এবং খলীফা উমার (রা) ছদ্মবেশে গিয়ে তার এই সততার কথা শুনে তাকে পুত্রবধূ করেছিলেন।
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রয়েছে। রাসুল (সা) বলেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে নিঃস্ব ব্যক্তি হলো সে, যে কেয়ামতের দিনে নামায-রোযা-যাকাতসহ বহু ইবাদত নিয়ে উপস্থিত হবে; তবে পার্থিব জীবনে সে বহু অন্যায় করেছিল, কাউকে গালি দিয়েছিল, কাউকে অপবাদ দিয়েছিল, কারো অর্থসম্পদ আত্মসাৎ করেছিল, কাউকে আঘাত বা হত্যা করেছিল, অতঃপর এসব গোনাহের ক্ষতিপূরণ স্বরূপ তার পুণ্য থেকে পীড়িতদের অংশ দিয়ে দেওয়া হবে। যদি পুণ্য কম পড়ে যায়; তাহলে দাবিদারদের গোনাহগুলো তার ঘাড়ে চাপানো হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। [মুসলিম ২৫৮১]
ভেজালকারীদের জন্য পার্থিব শাস্তির বিধান— ইসলাম সব ক্ষেত্রেই মানুষকে নৈতিকভাবে উজ্জীবিত করেছেযাতে সে স্বেচ্ছায় অন্যায় ও অপরাধ থেকে বিরত থাকে। যেহেতু শুধু উপদেশ সবসময় ফলপ্রসূ হয় না; তাই ইসলাম অপরাধ নির্মূলে শাস্তির বিধানও দিয়েছে। ইসলামে শাস্তিযোগ্য অপরাধগুলোর জন্য তিন ধরণের শাস্তির বিধান রয়েছে— (১) হুদুদ (জঘন্যতম কতিপয় অপরাধ ও পাপের জন্য যে নির্দিষ্ট শাস্তির বিধান রয়েছে), (২) কিসাস (হত্যা বা জখমের ক্ষেত্রে অনুরূপ নীতিভিত্তিক ন্যায়বিচার), (৩) তা’যির (কিসাস ও হুদুদ ব্যতিত অন্যান্য সকল অপরাধের ক্ষেত্রে সমাজ বা রাষ্ট্রের শরিয়ৎবিদগণ অপরাধের প্রকার-প্রকৃতি ও পরিণামের কথা ভেবে যে শাস্তি নির্ধারণ করেন)।
যেহেতু পণ্যে ও খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল মিশ্রণ প্রতারণামূলক ও মানব বিধ্বংসী অপরাধ। তাই এক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান রয়েছে; যাতে এ অপরাধ নির্মূল করা সহজসাধ্য হয়। এবং এটি মূলত তা’যির জাতীয় অপরাধ। অতএব ভেজালের পরিমাণ, আকৃতি-প্রকৃতি, পরিণামের ভয়াবহতা ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করে ভেজাল প্রতিরোধ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি নির্ধারণ করা ইসলামী বিধিসম্মত একটি পদক্ষেপ বলে আমি মনে করি।
এবং আমি বিশ্বাস করি, পণ্যের দোষক্রটি গোপন করা এবং পণ্যে ভেজাল মেশানো ইসলামী আদর্শের একেবারেই পরিপন্থি কাজ। অতএব বিক্রেতাকে অবশ্যই পণ্যের দোষক্রটি ক্রেতার সামনে তুলে ধরতে হবে। এবং কোনো মুসলমানের জন্য কোনোভাবেই পণ্যের দোষ গোপন করা সমীচীন নয়; রাসুল (সা)-এর ভাষায়, “এটা কোনো মুসলমানের জন্য বৈধ নয় যে, সে তার ভাইয়ের কাছে ত্রুটিযুক্ত বস্তু বিক্রি করবে, অথচ সে তাকে সে-বিষয়ে জানাবে না।” [বুখারি ১৩০৩, ফাত্‌হুল বারী ৪/২০৭৯]
[পূবের কলম, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯-এর দ্বীনদুনিয়া ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত]