Pages

Friday, 9 November 2018

জিবরান খালিল জিবরানঃ গান ধরো তুমি বাঁশিটি ধরিয়ে আমায়


মূলঃ জিবরান খালিল জিবরান
 গান ধরো তুমি বাঁশিটি ধরিয়ে আমায় 
অনুবাদ- আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

গানে যে আছে বাঁচার রসদ, তাই
গান ধরো তুমি বাঁশিটি ধরিয়ে আমায়;
এই বাঁশির সুরই অনুরণিত হয় 
ধ্বংসের পরেও ভবে ও নিরালায়।

তুমিও কি আমার মতো
প্রাসাদ ছেড়ে জঙ্গলে ঘর বেঁধেছো,
ছোট নদীর পাড় ধরে
উঠে পড়েছো পাথরের পীঠে?
সুগন্ধের ফোয়ারায় স্নান সেরে
গা মুছেছো আলোর তোয়ালায়?
পান করেছো সকালকে
মদিরা রূপে স্বর্গীয় পেয়ালায়?
তুমিও কি প্রতিদিন বিকেল বেলায়
গিয়ে বসো আমার মতো আঙুর-তলায়
যেখানে ঝুলে আঙুরগুচ্ছ
স্বর্ণে মোড়া সপ্তর্ষির ন্যায়?
তুমিও কি শোও রাতের বেলায়
আকাশমুড়ি দিয়ে ঘাসের বিছানায়;
যা ঘটেছে অতীতে সে-সব ভুলে গিয়ে,
তপস্বীরূপে ভবিষ্যতের সব মামলায়!

একপাশে রেখে রোগ-আরোগ্যকে
গান ধরো তুমি, বাঁশিটি ধরিয়ে আমায়;
মানুষ তো আর কিছুই নয়, ক’টি পঙক্তি মাত্র 
জল দিয়ে লেখা এই জীবন-খাতায়।



أعطني الناي وغنّ               فالغنا سر الوجود
وأنين الناي يبقى                 بعد أن يفنى الوجود
هل اتخذت الغاب مثلي       منـزلاً دون القصور
فتتبّعت السواقي                 وتسلّقت الصخور
هل تحمّمت بعطر                وتنشّفت بنور
وشربت الفجر خمراً            من كؤوس من أثير
هل جلست العصر مثلي     بين جفنات العنب
والعناقيد تدلّت                    كثريات الذهب
هل فرشت العشب ليلاً         وتلحّفت الفضاء
زاهداً في ما سيأتي           ناسياً ما قد مضى
أعطني الناي وغنّ               وانس داء ودواء
إنما الناس سطورٌ              كتبت لكن بماء

[শব্দের মিছিল, মার্চ ২৩, ২০১৭-তে প্রকাশিত]

দারিন তাতুরঃ প্রতিহত করো হে আমার জাতি, তুমি প্রতিহত করো তাদের


প্রতিহত করো হে আমার জাতি, তুমি প্রতিহত করো তাদের 
মূল- দারিন তাতুর, ইজ়রায়েল  
অনুবাদ- আব্দুল মাতিন ওয়াসিম 

[দারিন তাতুর। ছত্রিশ বর্ষীয় এক ফিলিস্তিনি কবি, চিত্রগ্রাহক ও সক্রিয় সমাজকর্মী। থাকেন ইজ়রায়েলে, নাজারেথ-এর কাছে রেইনে। ২০১৫ সালে নিজের লেখা এই কবিতাটি ইউটিউবে পাঠ করেছিলেন তিনি। এই কবিতার মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদকে হাওয়া দেওয়া ও সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করার অভিযোগ এনে  ২০১৫-র অক্টোবরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ক’মাস বন্দি থেকে ২০১৬-তে ছাড়া পেলেও গৃহবন্দি থাকেন আরও চার মাস। সে-সময়ে ফোন, ইন্টারনেট সহ যোগাযোগের সকল মাধ্যম থেকে তাঁকে দূরে রাখা হয়েছিল। শেষের দিকে, কোনো আত্মীয় সঙ্গে থাকলে সপ্তাহান্তে মাত্র দু’ঘণ্টার জন্য বাইরে যেতে দেওয়া হত। কারণ, ইজ়রায়েল সরকারের ধারণা, তাতুর জনগণের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিপদজনক। এবং গত ৩১শে জুলাই তাঁকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ডও দিয়েছে তেলআবিব। 
তাঁর এই কবিতার শব্দমালা নিঃসন্দেহে ফিলিস্তিন-ইজ়রায়েল সংঘাতের আবহ টেনে আনে। তবে আমার ধারণা, কবিতাটি আসলে কবির মনের এক শৈল্পিক প্রকাশ। একে ‘হিংসা’র পর্যায়ে ফেলা যায় না। এ প্রসঙ্গে তাঁর আইনজীবী গ্যাবি ল্যাস্কিও মনে করেন- ‘আদালতের এই রায় বাকস্বাধীনতা ও অনুভূতি প্রকাশের অধিকার খর্ব করেছে। ইজ়রায়েলে বসবাসকারী সংখ্যালঘু ফিলিস্তিনিদের সাংস্কৃতিক অধিকারও লঙ্ঘন করা হয়েছে এই রায়ের মাধ্যমে’।    

দারিনের লেখা দু’টি কবিতার বইও আছে। তাঁর প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থটির নাম ‘আল্‌-গাজ়্‌উল্‌ আখীর’ (দ্য ফাইনাল ইনভেশন)। আর দ্বিতীয়টি ‘হিকায়াল্‌ কানারি’ (দ্য ক্যানারি টেলস)। কারান্তরালে থাকার সময় ‘শায়েরাতুন্‌ মিন্‌ ওরায়িল্‌ ক্বুয্‌বান’ (আ পোয়েট বিহাইন্ড দ্য বারস) নামে একটি বিখ্যাত কবিতাও লেখেন তিনি। সম্প্রতি ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত লেখক নাওমি ফোয়েলি-র বহুল চর্চিত বই ‘আ ব্লেড অব গ্রাস’-য়ে স্থান পেয়েছে তারিক হায়দারের করা তাঁর কয়েকটি কবিতার ইংরেজি অনুবাদও। এবং প্রকাশের পথে রয়েছে তাঁর উপন্যাস, ‘মাওয়িদুন মাআল হীতান’ (তাঁর পিতা তারিক তাতুর-এর মন্তব্য অনুযায়ী, এই উপন্যাসটির একই সাথে আরবি, ইংরেজি ও হিব্রুতে প্রকাশিত হবার কথা)। দারিন মনে করেন, তাঁর এই বই তাঁকে করা অনেক প্রশ্নের উত্তর আরও স্পষ্ট করে দেবে। 

অন্যদিকে, ন’জন পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী-সহ একশো পঞ্চাশ জন আমেরিকান লেখক-কবি, সেই সাথে সারা পৃথিবীর সাহিত্যকর্মীরা দারিনের কারাদণ্ডের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাঁরা মনে করেন, ইজ়রায়েল সরকার অন্যায় ভাবে গত কয়েক বছর ধরে লাগাতার ফিলিস্তিনের কবি-সাহিত্যিকদের বন্দি করে নির্মম অত্যাচার করে চলেছে।]

প্রতিহত করো হে আমার জাতি, তুমি প্রতিহত করো তাদের    
কুদ্‌সে, এই কুদ্‌সেই আমি লাগিয়েছি প্রলেপ নিজ ক্ষততে 
আর ছুঁড়ে ফেলেছি আমার সকল হতাশা ‘আল্লাহ্‌র’ নামে;   
নিজ হাতেই আমি বহন করেছি আমার প্রাণ 
আরব ফিলিস্তিনিদের উদ্দেশে।       
ঐ মিথ্যা শান্তিচুক্তি আমি মানি না—   
এই দেশ, এই পতাকা আমার
আমি কখনই একে নীচু হতে দেবো না।   
আমিই তাড়াবো তাদেরকে আমার এ ভিটে থেকে 
বাধ্য করবো মাথা নোয়াতে কোনো এক প্রহরে ভাবীকালের;     
হে আমার জাতি প্রতিহত করো, তুমি প্রতিহত করো তাদের।  
সাম্রাজ্যবাদীদের প্রতাপকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দাও তুমি  
শামিল হও শহীদদের কাফেলায় 
টুকরো টুকরো করে ছুঁড়ে ফেলো লজ্জার সেই দস্তুর 
যে দস্তুর বয়ে এনেছে লাঞ্ছনা 
দাঁড়াতে দেয়নি আমাদেরকে ন্যায়ের পক্ষে 
কোনো অপরাধ ছাড়াই জ্বালিয়ে দিয়েছে আমাদের শিশুসন্তানদের 
প্রকাশ্যে বধ করেছে আমাদের পায়রাগুলো 
এমনকি দিনের আলোয় হত্যা করেছে তাদের;  
হে আমার জাতি প্রতিহত করো, তুমি প্রতিহত করো তাদের।  
ভেঙে গুঁড়িয়ে দাও সাম্রাজ্যবাদীদের থাবা 
আর কর্ণপাত করো না সেই পিশাচদের কথায় 
শান্তির মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে আমাদের বেঁধে রেখেছে যারা   
ভয় পেয়ো না তুমি তাদের মারকাফা ট্যাংকের হুঙ্কার 
তোমার হৃদয়ে লালিত সত্য যে অধিক দৃঢ়;  
যতদিন তুমি লড়ে যাবে মাতৃভূমির জন্য 
বেঁচে থাকবেন মহান যোদ্ধারা, বেঁচে থাকবে বিজয়।  
ওদিকে আলি, হ্যাঁ সিংহবীর আলি
হাঁক ছেড়েছেন তাঁর কবর থেকে–  
প্রতিরোধ গড়ে তোলো হে আমার ক্ষুব্ধ জাতি
আর লিখে রাখো আমায় গদ্যের রূপে ধূপগাছের ডগায় 
তুমিই এখন প্রতিষেধক আমার জীর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের 
প্রতিহত করো হে আমার জাতি, প্রতিহত করো  
তুমি প্রতিহত করো তাদের।   


قاوم يا شعبي قاومهم
دارين طاطور

قاوم يا شعبي قاومهم
في ‏القدس
في القدس ضمدت جراحي
ونفثت همومي لله
وحملت الروح على كفي
من أجل فلسطين العرب
لن أرضى بالحل السلمي
لن أُنزل أبداً علم بلادي
حتى أُنزلهم من وطني
أركعهم لزماني الآتي
قاوم يا شعبي قاومهم
قاوم سطو المستوطن
واتبع قافلة الشهداء
مزق دستوراً من عار
قد حمل الذل القهار
أردعنا من رد الحق
حرقوا الأطفال بلا ذنب
وهديل قنصوها علناً
قتلوها في وضح نهار
قاوم يا شعبي قاومهم
قاوم بطش المستعمر
لا تصغِ
لا تصغِ السمع لأذناب
ربطونا بالوهم السلمي
لا تخشى ألسن ماركافا
فالحق في قلبك أقوى
ما دمت تقاوم في وطنك
عاش العظماء والنصر
فعليٌّ
فعليٌّ نادى من قبره
قاوم يا شعبي الثائر
واكتبني نثراً في الندّ
قد صرتَ الرد لأشلائي
قاوم يا شعبي قاوم
قاوم يا شعبي قاومهم. 

[শব্দের মিছিল, অক্টোবর ৩১, ২০১৮-এ প্রকাশিত] 

ঈদ মীলাদুন নবীঃ কিছু কথা - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



আমাদের উপমহাদেশে, হিজরি সনের তৃতীয় মাস, রবিউল্‌ আউয়াল-এর বারো তারিখের রাতটি বেশ আড়ম্বরের সাথে উদযাপিত হয়। এ রাতে খাওয়া-দাওয়া, আনন্দ-উৎসব, জালসা-মহফিলে মুখরিত হয়ে ওঠে অনেক পাড়া-মহল্লা। কোথাও আবার দেওয়াল-লিখনের পাশাপাশি ঠোঁটেও উচ্চারিত হতে থাকে- সকল ঈদের সেরা ঈদ, ঈদ-ই-মিলাদ
এসব দেখে-শুনে মাথার মধ্যে কিলবিল করে কিছু প্রশ্ন- ঈদ-এর অর্থ কী? মিলাদুন্‌ নবি বলতে কী বোঝায়? ইসলামে ঈদ আসলে ক’টি? নির্ভরযোগ্য তত্ত্ব ও তথ্যের ভিত্তিতে নবি (সা)-র প্রকৃত জন্মদিন কোনটি? নবি (সা) বা তাঁর অনুগামীরা কি এদিনটিকে উদযাপন করতেন! করলে কীভাবে করতেন? শরিয়তের দৃষ্টিতে এসব রীতিরেওয়াজের বিধানই বা কী? এধরণের প্রশ্নগুলো মাঝে মাঝেই মনকে জারণ করে।
ঈদ একটি আরবি শব্দ। অর্থ উৎসব, এমন উৎসব যা ফিরে আসে বারবার। আর মিলাদ শব্দের অর্থ জন্ম বা জন্মতিথি। তাই, মিলাদুন্‌ নবি বলে নবি (স)-এর জন্মদিনকে বোঝানো হয়।   
নবি মুহাম্মদ (সা)-এর জন্ম কোন দিনে?- তা সবার জানা, সোমবারে। কিন্তু, কত তারিখে?- তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে রয়েছে বিস্তর মতভেদ অনেকের মতে তাঁর জন্ম ১২ই রবিউল আউয়াল। আবার অনেকের মতে ৯ই রবিউল আউয়াল। তবে বিশ্ববরেণ্য ও বিশুদ্ধতম সিরাত-গ্রন্থ আর্‌-রাহীক্বুল্‌ মাখতূম-এ বলা হয়েছে রাসূল (সা) ৫৭১ খ্রিস্টাব্দে ৯ই রবিউল আউয়াল, মোতাবেক ২০শে এপ্রিল সোমবার প্রত্যুষে জন্ম গ্রহণ করেন (পৃ-৪৫)একই অভিমত বিখ্যাত ইসলামি বিদ্বান আল্লামা মুহাম্মদ সুলাইমান সাল্‌মান মানসূরপুরি (রাহ্‌মাতুল্‌ লিল্‌-‘আলামীন পৃ-৩৪) ও মিশরের প্রখ্যাত জোতির্বিজ্ঞানী মাহমূদ পাশা’র আল্লামা শিবলি নোমানি ও সাইয়েদ সুলাইমান নাদভি তাঁদের সীরাতুন্‌ নাবী গ্রন্থে লিখেছেন- নবি (সা)-এর জন্মদিন সম্পর্কে মিশরের বিখ্যাত জোতির্বিজ্ঞানী মাহমূদ পাশা একটি পুস্তিকা রচনা করেছেন। তাতে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, নবি (সা)-এর জন্ম ৯ই রবিউল আউয়াল, রোজ সোমবার, মোতাবেক ২০শে এপ্রিল ৫৭১ খ্রিস্টাব্দে’ (১ম খণ্ড, পৃ-১৩৬, ১৩৭) বহু সহিহ হাদিসে নবি (সা) নিজেই বলেছেন যে, তাঁর জন্ম সোমবারে হয়েছে (মুসলিম ১১৬২)এই তথ্যকে ভিত্তি করে মাহমূদ পাশা গবেষণা ও হিসেব করে দেখিয়েছেন যে, সে-বছর ১২ই রবিউল আউয়াল পড়েছিল বৃহস্পতিবার। আর সোমবার ছিল ৯ই রবিউল আউয়াল (সীরাতুন্‌ নাবী ১/১৩৭) পাশার এই গবেষণালব্ধ অভিমতকে এখনো কেউ খণ্ডন করতে পারেনি। বরং বর্তমানে অনেকেই এই মতকে গ্রহণ করেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, নবি (সা)-এর জীবনাবসান হয়েছিল সর্বসম্মতভাবে ১২ই রবিউল আউয়াল-এ।  
তাছাড়া, জন্মদিন পালন করা ইসলামের কোন বিধিবদ্ধ নিয়ম নয়। এমনকি অধিকাংশের মতে, জন্মদিন পালন ইসলামি সংস্কৃতির পরিপন্থী একটি রীতি। তাই কারো জন্মদিন পালন করা-কে ইসলাম অনুমোদন করে না। ইসলামের ইতিহাস ও হাদিস অধ্যয়নে আরও স্পষ্ট হয় যে, নবি (সা) নিজে তাঁর জন্মদিন পালন করেননি। এমনকি তাঁর সাহাবারাও (অনুগামী) না। অথচ তাঁরা নবি-প্রেমের বহু অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁদের সামনেই খ্রিষ্টানেরা ঈসা (যীশু) (আ)-এর জন্মদিন (বড়দিন) উদযাপন করত। কিন্তু তাঁরা কখনো নবি (সা)-এর জন্মদিনে ঈদ বা অনুষ্ঠান করেননি। তাই ইসলামি শাস্ত্রের পণ্ডিতেরা একে একটি ‘নব আবিষ্কৃত রীতি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, উমার (রা) একদিন সকল সাহাবাদের নিয়ে বৈঠকে বসেন, একটি নতুন বর্ষগণনা-পদ্ধতি প্রবর্তন করার উদ্দেশ্যে। কেউ কেউ পরামর্শ দেন, নবি (সা)-এর জন্ম তারিখ থেকে সন গণনা শুরু করা হোকআবার কেউ বলেন, তাঁর (সা) মৃত্যুদিন থেকেউমর (রা) তৎক্ষণাৎ এসব প্রস্তাব বাতিল করে বলেন, এ পদ্ধতি খ্রিষ্টানদের। অতঃপর, কিছুক্ষণ আলাপ-আলোচনার পর সর্বসম্মতিক্রমে হিজরতের দিন থেকে ইসলামি সন গণনা আরম্ভ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় (বুখারি ৩৯৩৪, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ, ইবনু কাসির ৪/৫১০-৫১২)
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, জন্মদিবস কেন্দ্রিক উৎসব-অনুষ্ঠান অ-মুসলিমদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রীতি। যেমন- বড়দিন, জন্মাষ্ঠমী, বৌদ্ধপূর্ণিমা ইত্যাদি। আর এ মর্মে মনে রাখতে হবে, যে ব্যক্তি অন্য কোনো জাতির সাদৃশ্যতা গ্রহণ করবে সে তাদেরই অন্তর্ভূক্ত বলে গণ্য হবে। (আবু দাউদ ৩৫১২, সহিহ আবু দাউদ, আল্‌বানি ৩৪০১) উল্লেখ্য যে, এ কারণেই আযান প্রচলনের ঘটনায় নবি (সা) আগুন জ্বালানো (পারসিক), ঘণ্টা ধ্বনি (খ্রিষ্টান), বাঁশি বাজানো (ইহুদি)-র প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন (তিরমিযি ১৮৯, আবু দাউদ ৪৯৯, ইবনু মাজাহ্‌ ৭০৬)   
এবার প্রশ্ন, ইসলামে ঈদ ক’টি? কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে, ইসলামে ঈদ হল দু’টি- ঈদুল্‌ ফিত্‌র ও ঈদুল্‌ আয্‌হা। আর এ কথা নবি (সা) মদিনা-জীবনের শুরুতেই ঘোষণা করেছেন। তিনি মদিনায় পৌঁছে দেখলেন, বছরের দু’টি দিন মদিনাবাসীরা বেশ আনন্দ-ফুর্তি করছে। এবং প্রাক-ইসলামি যুগ থেকেই এ দু’দিন তারা আনন্দ-ফুর্তি করে আসছে। নবি (সা) তাঁদেরকে সম্বোধন করে বললেন, মহান আল্লাহ্‌ এ দুদিনের পরিবর্তে এর চেয়ে উত্তম দু’টি দিন তোমাদেরকে দিয়েছেন। তা হল ঈদুল্‌ আয্‌হা ও ঈদুল্‌ ফিত্‌র” (আবু দাউদ ১১৩৪) আর এ বিষয়টি (ইসলামে ঈদ দুটি) যেমন সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, ঠিক তেমনই ‘ইজ্‌মা-য়ে উম্মাত’ দ্বারাও প্রতিষ্ঠিত। অতএব কোনো তৃতীয় ঈদের প্রচলন কখনই বিধিবদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হবে না বলে আমার বিশ্বাস কারণ, আমাদের এই দ্বীনে যে নতুন কোনো বিষয়ের প্রচলন করবে সে প্রত্যাখ্যাত হবে” (বুখারি ২৬৯৭, মুসলিম ৪৪৯২)এবং “নব-প্রবর্তিত প্রতিটি বিষয়ই বিদ‘আত (ধর্মীয়-অনুশীলন বিষয়ক নতুন রীতি) আর প্রতিটি বিদ‘আতই পথভ্রষ্টতা” (আবু দাউদ ৪০৬৭)   
এ মর্মে এও উল্লেখ্য যে, নবি (সা) জীবনভর সোমবার ও বৃহস্পতিবার নফল (ঐচ্ছিক) রোযা রেখেছেন। তাই অনেকে মনে করেন, জন্মদিন উপলক্ষে তিনি (সা) সোমবারে রোযা রাখতেন। আর প্রমাণস্বরূপ তারা উল্লেখ করেন, একবার নবি (সা)-কে সোমবারের সিয়াম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন- “এ দিনে আমার জন্ম এ দিনেই আমি নবুওয়াত (নবিত্ব) লাভ করেছি এবং এ দিনেই আমার উপর প্রথম অহি (সুরাতু আল্‌-আলাক্ব-এর প্রথম পাঁচ আয়াত) অবতীর্ণ হয়েছিল” (মুসলিম ১১৬২) এ হাদিস উল্লেখ করে তারা বলতে চেয়েছেন যে, ঐ দিনে রোযা পালন করে তিনি (সা) জন্মদিন উদযাপন করেছেন। অতএব ঈদ-ই-মিলাদ সুন্নত। কিন্তু তারা বেমালুম ভুলে যান যে, খুদ সে-হাদিসেই আরও কয়েকটি কারণের উল্লেখ রয়েছে। তাছাড়া নবি (সা) সোমবার ছাড়া বৃহস্পতিবারও রোযা রাখতেন। এবং এ বিষয়ে তাঁর (সা) স্পষ্ট বিবৃতিও রয়েছে, ,“সোমবার ও বৃহস্পতিবার মানুষের সম্পাদিত কর্মসমূহ আল্লাহ্‌র নিকট পেশ করা হয়। কাজেই আমি পছন্দ করি, যখন আমার আমলসমূহ পেশ করা হবে তখন যেন আমি রোযা অবস্থায় থাকি” (সাহিহুল্‌ জামে’, আল্‌বানি ১৫৮৩)আরও একটা কথা মনে রাখা দরকার যে, তিনি ঐ দিনে রোযা রেখেছেন। আর ঈদ আসে রোযার শেষে; ঈদের দিন রোযা হয় না আর রোযার দিন ঈদও হয় না। তাছাড়া, এক লহমার জন্য যদি মেনে নেওয়া হয় যে, সোমবারে রোযা রাখার মাধ্যমে তিনি (সা) জন্মদিন পালন করেছেন, তাহলে তো প্রতি সোমবারে আমাদের ঈদ-ই-মিলাদ উদযাপন করতে হয়; আর তা হতে হবে সিয়াম পালনের মাধ্যমে; খেয়ে-দেয়ে, নানা রকমের আলোকসজ্জার মাধ্যমে কখনই নয়!
বরং আমি মনে করি, সারা বছর ধরে তাঁর (সা) জীবন ও কর্ম নিয়ে আলাপ-আলোচনা, সমাজে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য কর্মসূচী গ্রহণ, নিজ আচার-আচরণ ও দৈনন্দিন কাজকর্মে তাঁর বিধি-নিষেধ মেনে চলা-ই হবে তাঁর (সা) প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন।
[পূবের কলম, ৯ নভেম্বর ২০১৮-তে প্রকাশিত]

Friday, 2 November 2018

বদিউর রহমানঃ সব ভুলে যাচ্ছি, কিন্তু...


সব ভুলে যাচ্ছি, কিন্তু...


বদিউর রহমান

প্রতিদিন অনেক কিছুই ভুলে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ আগের কথাই ধরুন না, একটা বাজারের থলে নীচে আমাদের দারোয়ানের হাতে দেওয়ার ছিল। নীচে গিয়ে তপনের দোকানের পাশে দশ নম্বর ট্যাংকের বাস স্টপেজের সুন্দর করে সাজানো সিটে প্রায় আধ ঘণ্টা বসে বিভিন্ন মডেলের গাড়ির আসা-যাওয়া এবং সেক্টর ফাইভে কর্মরত স্মার্ট ছেলেমেয়েদের যুগলে ঘরে ফেরা দেখে ফেরার সময় মনে পড়ল, থলেটা সঙ্গে নিয়ে নামতে ভুলে গিয়েছি। থলে না হয় কিঞ্চিৎকর বস্তু, সেটা আগামীকাল দিলেও চলবে। কিন্তু গত সপ্তাহে ইরান সোসাইটির ফাউণ্ডেশন ডে-উদযাপনে প্রাক্তন বিচারপতি চিত্ততোষ মুখার্জি ও আরও এক প্রাক্তন বিচারপতি শ্যামল সেন মহাশয়ের বক্তব্য শোনার জন্যে প্রত্যয় করেছিলাম যে, সেখানে যাব। আমি তৈরি হয়ে অধ্যাপক ফিরোজকে ফোন করলাম। বললেন, ‘ওটা তো গতকাল হয়ে গেছে; আপনাকে দেখব আশা করেছিলাম’। শুনে আমি শরমে মরি। আজকাল এমন ভুলও করছি।

সত্যি বলছি, আজকাল প্রায়শঃ আমার ভুল হচ্ছে। পড়ার টেবিলে বসে কোনোএকটা বইয়ের খোঁজে পাশের ঘরে গিয়ে ভুলে যাচ্ছি, ওখানে কেন গেলাম। সে-ঘর থেকে ফেরৎ আসার পর, টেবিলে বসার কিছুক্ষণ পরে মনে পড়ছে সেই বইটার নাম যেটার সন্ধানে ও-ঘরে গিয়েছিলাম। পরীক্ষার খাতা দেখার জন্য লাল কালির কলমটা কোথায় রাখলাম, আর খুঁজে পাই না। দোকান থেকে আবার লাল কালির কলম কেনার পর যে-খাতাগুলো দেখা হয়ে গিয়েছিল তার ভেতর থেকে হঠাৎ পুরাতন কলমটা বেরিয়ে মেঝেতে পড়ে আমার দিকে চেয়ে হাসতে থাকে। দেখুন না, গতকাল থেকে এক বিরল প্রতিভাধর ব্যক্তিত্বের কথা ভাবছিলাম। মনে পড়ছিল, বিভিন্ন ভাষায় তাঁর বুৎপত্তির কথা বিশেষতঃ আরবি-ফার্সি ভাষায় অপূর্ব দখলের কথা; এমনকি মুয়াল্লাকা-র টীকাসহ ব্যখ্যা ইত্যাদিতে সমৃদ্ধ আরবি লেখনীর কথা। আরও মনে পড়ছিল, স্যার আশুতোষের সঙ্গে কোনো কারণে মতানৈক্য হওয়ায় তাঁদের একে অপরের মুখ দেখাদেখিও বন্ধ ছিল। ভাবছিলাম, ওঁদের মত বিরল প্রতিভাধর মানুষদেরও মতানৈক্য হয়, যার পরিণামে দূরত্বও সৃষ্টি হয়। এটাকে কি 'স্টার ওয়ার' বলা যায়? অনেক কিছুই ভাবছিলাম। আর চিন্তা করছিলাম, সেই প্রতিভার উপর ক’টা লেখা পড়েছি এবং কোন পত্রপত্রিকায়। সেই বিরল ব্যক্তিত্বের ছবিটাও স্মৃতিপটে ভেসে উঠছিল। কিন্তু কেন জানি না, ওঁর নামটা কিছুতেই স্মরণ করতে পারছিলাম না। সেই বিখ্যাত স্যার ‘হরিনাথ দে’ ধরা দিলেন পাক্কা চব্বিশ ঘণ্টা পরে। যদিও তার আগে ওঁর সুঠাম চেহারাটার প্রতিচ্ছবি বারবার এবং লাগাতার মাথার মধ্যে ফ্ল্যাশ করে যাচ্ছিল।

মাঝে মাঝে অনুশোচনা হয়, শিক্ষকতা করতে স্মরণ শক্তি প্রখর থেকে প্রখরতর হওয়া উচিৎ। কিন্তু আমার এরকম ভুল ভ্রান্তি কেন হচ্ছে! এবার কি সময় হল, পড়ানো থেকে অবসর নেওয়ার। ভাবি, শল্য চিকিৎসকরাও একটা সময়ের পর আর নিজের হাতে অপারেশন করেন না; নিজের হাতে তৈরি করা ছাত্রদেরকে অপারেশন করতে দিয়ে নিজে পাশে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। ভাবি, আমারও কি সেই সময় আগত! পরক্ষণে নিজেকে আশ্বস্ত করি এই বলে যে, শল্য চিকিৎসায় ভুল হলে রোগীর প্রাণ সংশয় হয়। আর আমার শিক্ষকতায় ভুল ভ্রান্তি হলে, ছাত্রদের সেই রকম প্রাণহানির মত ভয়ের কিছু নেই। খুব জোর তত্ত্বগত ভাবে কিছু ভুল শিখবে; মারা তো যাবে না। ছাত্রদের সামনে আমার ভুলে যাওয়ার কথা বললে, ওরা বলে, 'স্যার বয়স হয়েছে তো, তা বয়সকালে ওরকম ভুল হয়'। প্রায় প্রতিদিন দু' একজনে স্মরণ করিয়ে দেয়, আমি বৃদ্ধ। শিয়রে যমদূত দাঁড়িয়ে। তা আমার ছাত্ররা ভালো থাকুক; দীর্ঘজীবী হোক। কিন্তু ওদেরকে যখন বলতে শুনি ‘অনেক পাঠ্য বিষয় ভুলে যাচ্ছি’; আর পরীক্ষার আগে তো প্রায় প্রত্যেকটা ছাত্রের ঐ অভিযোগ, ‘স্যার সব ভুলে যাচ্ছি’; ভিতরে ভিতরে পুলকিত হই, যুবকরাও তো ভুলছে! তাহলে আমাকে বাড়িতে কেন শুনতে হয় 'মতিভ্রম' হচ্ছে বলে। কখনো আবার সাধু ভাষায়, 'বয়স্কালে ভাম হচ্ছে' কথাটা শুনতে হয়। ভ্রম শব্দটার অপভ্রংশ হয়ে হয়েছে ভাম- যেটা আমার মত বয়স্কদের শুনতে হয়। কিন্তু যুবকদের ভুলে যাওয়ার জন্য কোনো শব্দ ব্যবহার হয় কি না, আমার জানা নেই।

পড়ানোর সময় নির্দিষ্ট পাঠ্য বিষয় পড়াতে গিয়ে অনেক সময় অন্যান্য কবি-সাহিত্যিকদের প্রসঙ্গ ও তাঁদের উক্তি রেফারেন্স হিসাবে উদ্ধৃত করার সময় ছাত্রদের স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা প্রায়শঃ প্রকাশ পায়। এমনকি আরবি শব্দের ব্যাখ্যায় কোর’আন শরীফের আয়াতের উদ্ধৃতি দিতে গিয়েও অধিকাংশ ছাত্রদের মধ্যে কোর’আনিক জ্ঞানের অভাব দেখতে পাই। কখনো কখনো আক্ষেপ করে বলি মুতানাব্বি, মা’আররি, উমার বিন আবি রাবিয়া এমনকি লম্পট ইমরাউল কায়েসকে কেন আমার স্মৃতিতে এই বয়সেও ধরে রাখতে হবে। আমারতো এখন আল্লাহর নামে তসবিহ জপ করার কথা অথচ আমাকে উদ্ধৃতি দিতে হচ্ছে ‘ওমা যারাফাত আইনাকে ইল্লা...’ অথবা ‘তাসদু ও তুবদি আন আসিলিওঁ’ অথবা মুতানাব্বির ‘ওয়া শাকিইয়াতি ফাকদুস সাকামে...’ ইত্যাদির। ঐ জাতীয় কবিতাবলীর বিশেষ অংশগুলোতো যুবক ছাত্রকুলের জিভের ডগায় থাকার কথা; কবিদের রসজারিত কথাগুলোতো প্রাণের কথা বলে মনে রাখা উচিত তাদের। জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেনে’র “চুলতার কবে কার...”-এর বর্ণনার সঙ্গে একযোগে ‘ওয়া ফার’ইন ইয়াযিনুল মাতনা আসওয়াদা ফাহিমিন...’ উল্লেখ করতে গিয়ে ছাত্রদের সবকিছু ভুলে যাওয়া দেখে অবাক হই। অনেক দুঃখে তাদের বলি “যতদিন না একটা চাকরি পাচ্ছ ততদিন অন্ততঃ সবকিছু স্মৃতিতে ধরে রাখার চেষ্টা করো। চাকরি পাওয়ার পর না হয় সব ভুলে যেও। আর যদি শিক্ষতার চাকরি কর তাহলে তোমার ক্লাসের ছাত্রদের বলো ‘তোমরা সবাই নিজে নিজে পড়ো। কেউ চিৎকার-হট্টগোল করবে না’। তারপর তুমি মোবাইলে ডুবে যেও। যেমন মাঝে মধ্যেই ক্লাসে করে থাক। তবুও ওরা ভোলে; পাঠ্য বিষয় ভুলতে যেন ওদের ভাল লাগে। ওরা ভুলে গেলে কোন অপরাধ নয়; আমি শিক্ষক বলে সব কিছু মনে রাখাটা যেন আমারই দায়িত্ব। ওরা বুঝতে চায়না আমিও রক্তমাংসের মানুষ। ওদেরই মতো কাতুকুতু দিলে হাসি, ব্যাথা দিলে কষ্ট পাই। যদিও সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অমোঘ ব্যাথাকে ভুলে কষ্টটা লাঘব করতে চাই। হয়তো কিছু ব্যাথা ভুলতে পারার মধ্যে আছে জীবনের স্পন্দন। তবুও স্বীকার করি অষ্টাদশী কন্যার জীবনের প্রতিটা মুহুর্ত স্মৃতিপটে প্রায়শঃ ভেসে উঠে প্রমাণ করে এখনও আমার স্মৃতিশক্তি প্রখর। হয়তো ঐ স্মৃতির ভারে অন্যান্য অনেক কিছুতে ভুল করি। অনেকে বলেন ওটা বয়সের জন্য স্বভাবজনিত ভুল। আমি বলি আমার ক্ষেত্রে তাদের ঐ ধারণাটাই ভুল।

ব্যাথাতুর জীবনের অনেক ক্ষেত্রে ভুল করি। বিশেষতঃ নামাযে। কোন্‌ সুরাটা পড়লাম, ক’রেকাত পড়লাম, দোওয়া-কুনুত পড়লাম কি না, মনে থাকে না। নিবিষ্ট চিত্তে নামায পড়া হয়না আর। ঐ সময় কেন জানিনা মনটা ‘তার’ স্মরণে আরও ভারাক্রান্ত হয়ে পদে পদে ভুল করে বসি। ভাগ্যিস অন্যেরা বুঝতে পারেনা। শুধু বুঝি আমি ও আমার আল্লাহ। অবশ্য কয়েকটা ব্যাপারে আমার স্মৃতি খুব প্রখর। আবার অন্য কয়েকটা ব্যাপারে সমধিক দুর্বল ও ভঙ্গুর। যখন কারও কাছ থেকে কোন কারণে টাকা ধার নিই, সে ব্যাপারটা অবলিলাক্রমে ভুলে যাওয়াটা আমার চারিত্রিক দোষ। অন্যদিকে আমার কাছ থেকে কেউ টাকা ধার নিলে সেটা ভুলি না। এই রকম ঋণ গ্রহিতার লিস্টে চার পাঁচ জনের কথা ভুলেও ভুলিনা। এখানে শুধু একজনের কথা উল্লেখ করব।

তখন ইলিয়ট হস্টেলে থাকি। দিনটা ছিল রবিবার। তারই মধ্যে রবিবার হস্টেলের ভালমন্দ খেয়ে দুপুরের ঘুমের তোড়জোড় করছি। এমন সময় তেরো নম্বর রুমের দরজায় কয়েকটা টোকার আওয়াজ। দরজা খুলে দেখি বছর আঠারোর এক ছেলে। জিজ্ঞেস করল “বদিউর নামে কে এখানে থাকেন?” বললাম ‘আমি। আমি বদিউর রহমান। তা কী হয়েছে?’ বলল “আপনার এক আত্মীয় নুরুল হক নাম। এখন হাওড়া ষ্টেশনের লোকআপে; বিনা টিকিটের যাত্রী বলে। উনি ফাইনের টাকা দিতে পারেননি। আপনাকে খবর দেওয়ার জন্য আমাকে ঠিকানা দিয়ে পাঠিয়েছেন। আপনাকে দেড়শো টাকা বা সমতুল্য মূল্যের কিছু নিয়ে গিয়ে উনাকে ছাড়াতে বলেছেন। তা না হলে আগামীকাল কেস উঠলে আরো বেশি সাজা হতে পারে”। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তা তোমাকে কী করে পেলেন?’ বলল “আমি এভাবে খবর দেওয়ার কাজ করে কিছু ইনকাম করি।” আমি আমার আত্মীয়দের মধ্যে ওই নামের কোন ব্যাক্তি খুঁজে পাচ্ছিলামনা। তাই একটু সন্দেহ হচ্ছিল যে, আমাকে কোনোভাবে কেউ ফাঁসাতে চাইছে না তো? হাওড়ার ঐ ফাটকটার অবস্থান আমার জানা ছিল। ভাবলাম ঐ জায়গায় আমাকে কেউ কাবু করতে পারবে না; আর তখন আমার চেহারাটা ছিল আরো সুঠাম। রুমমেট মুফিজকে বললাম “আমি যাচ্ছি, সন্ধ্যার পরেও না ফিরলে আমার খোঁজ করো।”

হাওড়ার অকুস্থলে পৌছে অনতিদূরে ফাটকের পেছনে দেখি নুরুল  দা। উনি আমার থেকে দু’বছর সিনিয়র। ‘মুম্‌তায’ (স্নাতকোত্তর সমতুল্য) পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবাসী কলেজে বি.এ. তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। বললাম, ‘এ কি নুরুল দা! আপনার এ দশা কেন?’ বললেন, “আগে টাকা পয়সা মিটিয়ে আমাকে এখান থেকে বের কর তারপর সব বলব”। টাকা মিটিয়ে দিয়ে উনাকে ফাটক থেকে মুক্ত করলাম। সেখান থেকে বের হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে পড়লেন। তারপর চা খেতে খেতে বললেন, “অন্যান্য দিন শিয়ালদহ দিয়ে যাওয়া আসা করি। এক দঙ্গল ছাত্র-ছাত্রীর সঙ্গে হৈ হৈ করতে করতে শিয়ালদহের গেট দিয়ে বের হই। টিকিট চেকাররা সমীহ করে সরে দাঁড়ায়। আজ রবিবার, ইংরেজির অধ্যাপক পরীক্ষা সন্নিকটে বলে এক্সট্রা ক্লাস নেবেন। তাই কলেজ যাচ্ছিলাম। সকালে ভাবলাম আজ তো অন্যান্য ছাত্রদের ট্রেনে পাব না। তাই পাড়ার এক চাকরিজীবীর মান্থলিটা নিয়ে হাওড়া দিয়ে আসছিলাম। জুলিয়াস সিজারের বই ও ডাইরিটা বুকের কাছে ধরে হাওড়া ষ্টেশনের গেট দিয়ে বের হওয়ার সময় চেকার টিকিট চেয়ে বসল। তাঁর কথায় কান না দিয়ে মেজাজে বেরিয়েও গিয়েছিলাম। ছকরা চেকারটা দৌড়ে এসে পথ আটকে বলল ‘টিকিট’। ঝাড়লাম দু’চারটে ইংরেজি। চেকার একটুও না দমে বলল ‘টিকিটা দিন’। মান্থলিটা একটু বের করে পকেটে ঢুকাতে চাইলে উনি বলেলন ‘ওটা আমার হাতে দিন’। দিলাম। জিজ্ঞেস করলেন ‘কী নাম’? আসল ব্যক্তির নামটা জানা ছিল তাই ঠিকই বললাম। এবার জিজ্ঞেস করলেন ‘বয়স’? বয়সটা তো লক্ষ্য করিনি। অতএব বয়স বলতে ভুল করলাম। আবার চেষ্টা করলাম ইংরেজি ঝেড়ে যদি রেহাই পাই। দেখলাম, কাজ হল উল্টো। রেগে গিয়ে বললাম ‘ক্লাসে দেরী হয়ে যাচ্ছে আমাকে টিকিটটা ফেরৎ দিন’। উনি বললেন ‘ও রবিবারেও ক্লাস! তা ছাত্র যদি স্টুডেন্টস মান্থলী নেই কেন? যেটা দিয়েছেন ওটা তো সাধারণ যাত্রীর মান্থলী। দু’টোর রংই তো আলাদা হয় তা জানো হে ছোকরা’।” নুরুল দা বললেন, ‘যখন ছোকরা বলল তখন মেজাজটা উঠল চরমে। দিলাম ইংরেজিতে বেশ কয়েকটা ব্রজবুলি। ও বাবা দেখি কি কালো কোটের পকেট থেকে বিল বই বের করে বলছে পঞ্চাশ টাকা ফাইন। সঙ্গে মাত্র গোটা পঁচিশ টাকা। এবার অনুরোধ করতে শুরু করলাম। বললেন ‘যত পারো ইংরেজি ঝাড়ো ফাইনটা দাও, না হলে ফাটকে দেব’। শেষ পর্যন্ত যা হল তা তো তুই চাক্ষুস করলি। যাক তোর টাকাটা আগামীকালই দিয়ে দেব।” সেই টাকাটা বিগত চল্লিশ-পয়তাল্লিশ বছরেও নুরুল দা’র ফেরৎ দেওয়ার সময় হয়নি। শিক্ষকতা করে আমার আগে রিটায়ার করেছেন। আমার টাকাটার কথা উনি ভুলেই গেছেন। আমি কিন্তু ভুলিনি। ঐরক দু’চারটা কেস আরও আছে। কিন্তু প্রত্যেকটা ডিলই আমার স্মৃতিতে এখনও জলজল করছে। কোনোটাই ভুলিনি। বললাম না আমি কারো কাছে টাকা পেলে সেটা ভুলি না। সেরকম আরেকটা জিনিষও আমি ভুলি না। এবার সে কথাটা চুপিসারে আপনাকে বিশ্বাস করে বলছি, জানি আপনি এই কথাটা পাঁচ-কান করবেন না। তা হল সুন্দরীদের মুখ। কত সুন্দর মুখ যে স্মৃতিপটের অ্যালবামে সযত্নে লুকিয়ে রেখেছি তা বলার নয়। হয়তো ওদের জন্যে কবির কথা ধার করে বলা যায় “ভুলি নাই, ভুলি নাই, ভুলি না...” মনের গভীর কুঠুরিতে এমনভাবে লুকোনো যে, আমার স্ত্রীর মত চালাক রমণীও তার হদিস আজ পর্যন্ত পায়নি। অন্যদের কথা তো কোন ছার। এ ব্যাপারে উর্দু কবির উক্তি “চান্দ তাসবীরে বুতাঁ, চান্দ হাসীনো কে খুতুত/ বাদ মারনে কে মেরে ঘার সে ইয়ে সামাঁ নিকলা” অনুযায়ী আমার ঘর থেকে সেরকম কিছু পাওয়া যাবে না হলফ করে বলতে পারি। তবে, সুন্দরীদের ভুলতে না-পারার কারণ হল, বড় বড় কবিদের কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমিও নিজের অজান্তেই সুন্দরের পূজারী হয়ে বসে আছি। চল্লিশ বছর আগে ইংরেজির এক অধ্যাপক দু-দু’টো ক্লাসে বুঝিয়েছিলেন ‘বিউটি ইজ ট্রুথ, ট্রুথ বিউটি’। ছোট্ট ঐ দু’টো কথার মধ্যে যে ব্যাপক দর্শন নিহিত হয়তো তা সম্যক গ্রহণ করতে পারিনি। তা হলেও ‘বিউটি ট্রুথ’-এর অংশ বিশেষ আমাকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছে। তাই আমি আজও সৌন্দর্যের পূজারী। কিছুটা প্রকৃতির সৌন্দর্যের; কিন্তু অনেকটা সুন্দরীদের রূপের। নিষ্পাপ, নিষ্কলঙ্ক, স্বর্গীয় রূপের পূজারী হলে দোষ কোথায়! উর্দু কবি সারসার সালানি তো বলেছেন- “মেরে তাসবীহ কে দানে হ্যাঁয় ইয়ে সারে হাসীঁ চেহরে/ নিগাহেঁ ফিরতি জাতি হ্যাঁয়, ইবাদাত হোতি জাতি হ্যায়”। আমি অবশ্য তাদেরকে স্মরণ করা-কে কখনই ইবাদতের মর্যাদা দান করিনি। তবে সুন্দর মুখগুলোকে এখনও ভুলিনি। ভোলা যায়ও না। ও ব্যাপারে স্মৃতিভ্রম–মতিভ্রম কিছু হয় না আমার! উর্দু-ওয়ালারা বলেন “আপনি আদাত সে মাজবুর হ্যাঁয় হাম”। প্রবচনটা হয়তো আমার ক্ষেত্রে সম্যক প্রযোজ্য। এবার সেই সিক্রেটটা বলি- আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দরী হলেন আমার মা। আর দ্বিতীয়জন সালমা; যে আমার একমাত্র কন্যা ছিল। এদেরকে ভুলি না। ভুলতে পারি না। ভোলা যায়ও না...।

১২-০৯-২০১৮
[শব্দের মিছিল, অক্টোবর-২০১৮-তে প্রকাশিত]

Thursday, 25 October 2018

সৌহার্দ্য ও শিষ্টাচারঃ ইসলামি দৃষ্টিকোণ


সৌহার্দ্য ও শিষ্টাচারঃ ইসলামি দৃষ্টিকোণ
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

আজকাল পথে-ঘাটে পথচারীদের ভিড়ে, চায়ের দোকান ও রাস্তার মোড়ে, টিভি-পেপারের সংবাদ শিরোনামে, নাটক-উপন্যাস, ফিল্ম-টেলিফিল্ম ইত্যাদির ভিলেন চরিত্রে মুখে পান বা গুটখা, পরনে বিশেষ ধরণের পাঞ্জাবী-পায়জামা, দেশ বিরোধী ইস্যু হলে যত্ন করে পরানো টুপি, মুখে উর্দু-বাংলা মিশ্রিত বুলি ইত্যাদি দিয়ে একটা ছবি তৈরি করা হচ্ছে সমাজের মননে- মুসলিমরা এমনই। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বৃহত্তর সমাজের মনে মুসলিমদের প্রতি ঘৃণার একটা আবহ প্রতিনিয়ত ঘনীভূত হয়ে চলেছেহ্যাঁ সত্যিই, কিছু মুসলিম নানান অসামাজিক ও অকল্যাণকর কাজে জড়িয়ে। তাই বলে কি তার খেসারৎ পুরো মুসলিম জাতিকে দিতে হবে!
আমি মনে করি, সবার জানা দরকার যে- প্রকৃত মুসলিম কে বা কারা? খোদ নবি (সা)-র ভাষায়- ‘যার কথা ও কাজে অন্য কোনো মানুষ আঘাত পায় না সে-ই প্রকৃত মুসলিম’ (আহ্‌মাদ ৭০৮৬, নাসায়ি ৪৯৯৫)হয়তো তারই জন্যে এই ‘পিছিয়ে পড়া’ মুসলিম সমাজে এখনো বহু ইতিবাচক দিক রয়েছে। বিশেষত আদব-কায়দা, সৌহার্দ্য ও শিষ্টাচারের দৃষ্টিকোণ থেকে মানব সমাজের জন্য বহু শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে এই অবহেলিত মুসলিম মানসের কাছে। তাঁদের পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা, পিতামাতার প্রতি শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ, নিজের সর্বস্ব দিয়ে অপরের সাহায্য করা ইত্যাদি গুণগুলির কথা উনিশ শতকে যেমনটা শরৎ বাবু ‘পল্লীসমাজ’-এ লিখে গেছেন, হয়তো তারই এক ঝলক কেরলের বন্যায় হানান হামিদের উদারতায় লক্ষ্য করা গেল। এমন বহু নজির আমাদের চারিপাশেই রয়েছে; শুধু একটু ঘৃণা ও অবজ্ঞার চশমা খুলে তাকালেই দেখা মিলবে  
যদিও আজকাল বহু মুসলিম যুবককে বৃদ্ধ মা-বাবাকে অবহেলা করতে দেখা যায়; কিন্তু মুসলিম সমাজে মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাবার মত নিন্দনীয় ঘটনা তেমন নজরে আসেনি। কারণ মুসলিম মানসপটে কোথাও গেঁথে রয়েছে “লোকেদের মধ্যে উত্তম সাহচর্যের সর্বাপেক্ষা অধিকারী তোমার মা (তিনবার) তারপরে তোমার বাবা। তারপরে তোমার অন্যান্য নিকটবর্তীরা” (মুস্‌লিম ২৫৪৮) এবং এ কথাও “মা-বাবা সন্তুষ্ট থাকলে স্রষ্টাও সন্তুষ্ট হন। আর তাঁরা মনঃক্ষুণ্ণ হলে স্রষ্টাও মনঃক্ষুণ্ণ হন” (তির্‌মিযি ১৮৯৯)। এমনকি হিজ্‌রত (সত্যের জন্য দেশান্তরী হওয়া) ও জিহাদ (সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করা)-এর সমতুল্য ধার্য করা হয়েছে পিতামাতার সেবা করাকে (মুস্‌লিম ৪৬৩০)। ইসলামি সাহিত্যে, শুধু মা-বাবা নয়, মা-বাবার বন্ধুবান্ধব ও সমস্তরীয় লোকেদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা ও উত্তম সাহচর্য প্রদান করাকে সর্বাধিক পুণ্যময় কাজ ঘোষণা করা হয়েছে (মুস্‌লিম ৪৬৩৮)। আর ভালো ব্যবহার, উত্তম চরিত্র ইত্যাদিকে পুণ্য ও মনে সংশয় উদ্রেককারী ঘৃণ্য কাজগুলোকে পাপ বলে পরিভাষিত করা হয়েছে (মুস্‌লিম ২৫৫৩)। শুধু পিতামাতা নয়, সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার আদেশও দেওয়া হয়েছে; আত্মীয়তার বন্ধন ও সম্পর্ক ছিন্ন করা-কে হারাম (নিষিদ্ধ) করা হয়েছে (মুস্‌লিম ২৫৫৪) প্রতিবেশীর প্রতি যত্নশীল হতে বলা হয়েছে (মুস্‌লিম ৪৮৮৬)তবে যদি বাস্তবোচিত ও শরিয়তসম্মত কোনো কারণ থাকে, সেক্ষেত্রে সম্পর্কের ইতি টানা বৈধ (বুখারি ৫৭২৭) হিংসা, বিদ্বেষ ও পশ্চাদ্ধাবন-এর মত যে কাজগুলি সম্পর্ক নষ্ট করে সে-সবকে বর্জন করে ভ্রাতৃত্বকে প্রতিষ্ঠা করার বিধানও দেওয়া হয়েছে (বুখারি ৫৭১৮)সালাম ও সম্ভাষণের মাধ্যমে সম্পর্ককে দৃঢ় করা (মুস্‌লিম ৫৪) ও ছিন্ন-সম্পর্ককে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে (মুস্‌লিম ২৫৬০)। বিভিন্ন রীতিনীতি, আচারঅনুষ্ঠান ইত্যাদির মাধ্যমে সম্পর্ক বলিষ্ঠ করা সামাজিক ইসলামের একটা বড় অধ্যায়। তাই অসুস্থদের সেবা-শুশ্রূষা (মুসলিম ২৫৬৮), পীড়িতদের সাহায্য-সহযোগিতা (মুস্‌লিম ৪৮৭৩), অনাথদের প্রতিপালন (বুখারি ১৪৬৭), দরিদ্র-অভাবীদের অর্থায়ন (সূরাতুল্‌ ইন্‌সান ৮) ইত্যাদি-কে সর্বাধিক পুণ্যময় কাজগুলির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যাতে একটি সুষ্ঠু সমাজ গড়ে ওঠে। এবং সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করতে কিছু পারস্পরিক অধিকার ও দায়দায়িত্বের বিধিবিধানও প্রদত্ত হয়েছে। অতএব ঔদার্য, দানশীলতা ও বিনয় প্রদর্শন (মুস্‌লিম ২৫৮৮)-এর পাশাপাশি পরস্পরের খোঁজ-খবর রাখাও ঈমানি দায়িত্বগুলির একটি।   
জীবন-পথ চলতে, কোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে মতানৈক্য ও বিতর্ক জন্মাতেই পারে। তবে বিতর্ক যাতে দীর্ঘস্থায়ী না হয় তার জন্য বাতলে দেওয়া হয়েছে বিনম্রভাবে আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে সমাধান-অন্বেষণের পথ ও পদ্ধতি। অতএব তর্ক-বিতর্কের সময় একজন প্রকৃত মুসলিমের ভাষা কখনই মর্যাদার সীমাকে লঙ্ঘন করবে না (মুস্‌লিম ২৫৮৭)কণ্ঠস্বর  হবে নমনীয় (সূরা ত্বহা ৪৪)আলোচনা হবে বুদ্ধিদীপ্ত ও যুক্তিপূর্ণ। যুক্তিখণ্ডন হবে উত্তম ও প্রাসঙ্গিক পন্থায় (সূরা আন্‌-নাহাল ১২৫) একজন প্রকৃত মুসলিম দ্বিচারিতাকে বর্জন করে প্রমাণিত ও বাস্তবোচিত সিদ্ধান্তের উপর মনকে স্থির করবেসর্বদা সত্যকে আঁকড়ে থাকবে (মুস্‌লিম ২৬০৭) যাতে সমাজে ঐক্যের সুর অটুট থাকে। কারণ, লোকেদেরকে ঐক্যের মন্ত্রে গেঁথে ন্যায় ও সততার উপর প্রতিষ্ঠিত একটি সুশীল সমাজ গঠন করা ইসলামের মৌল সিদ্ধান্তগুলির একটি (সূরাতু আলে-ইম্‌রান ১০৩-১০৫, মুস্‌লিম ২৫৬৪)যাতে সকলে মিলে আর্থসামাজিক অধঃপতন, মানবিক অবক্ষয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ-এর মত বিপর্যয়গুলির মুকাবেলা করতে পারে। আর তাই সুশীল সমাজকে মানব দেহের সাথে তুলনা করা হয়েছে (মুস্‌লিম ২৫৮৬); যাতে তারা একে অপরের ব্যথা-বেদনা অনুভব করে সাহায্যার্থে এগিয়ে আসে (সূরাতুল্‌ মায়েদাহ্‌ ২)কেউ কারুর প্রতি বিন্দু মাত্র অবিচার না করেবরং সমস্বরে রুখে দাঁড়ায় যে-কোনো নিপীড়ক-শোষক-অত্যাচারীর বিরুদ্ধে (সূরাতুল্‌ হুজ্‌রাত ৯, মুস্‌লিম ২৫৭৭, বুখারি ২৩১২)
বৃহত্তর সমাজের কথা মাথায় রেখে, প্রত্যেককে ব্যক্তিজীবনে সৎ, সত্যবাদী, আমানতদার, প্রতিশ্রুতি পূরণকারী, অতিথি পরায়ণ, ধৈর্যশীল, সহিষ্ণু, লজ্জাশীল, ন্যায়পরায়ণ, বিনয়ী, দয়ালু ও দানশীল হওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিজীবন, গৃহ ও সমাজ-আচারের পাশাপাশি মানুষকে শেখানো হয়েছে পথচারিতার মত বহিরঙ্গানের আদব-কায়দাও যেমন- পথে দৃষ্টি সংযত রাখা, পথিককে সাহায্য করা, ঠিক পথের দিশা দেওয়া, বিনয় ও ভদ্রভাবে লোকেদের জিজ্ঞাস্যর উত্তর দেওয়া (মুস্‌লিম ২১২১) রাস্তা পরিষ্কার (মুস্‌লিম ১৬৬৮) ও প্রশস্ত রাখা (মুস্‌লিম ১৯১৪)-র নিয়ম মেনে স্বচ্ছ পথ ও সমাজ গঠন করা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব
মানব সমাজের আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে বহু গৃহপালিত ও অহিংস প্রাণী। তাই ইসলামি সাহিত্যে মানুষের পাশাপাশি অহিংস্র প্রাণীর প্রতিও যত্নশীল হতে বলা হয়েছে। এধরণের প্রাণীকে হত্যা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ইসলামে যাবাহ্‌ ও ক্বাত্‌ল দুটি পৃথক জিনিস)। আর তাই, একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখে মেরে ফেলার জন্য এক গৃহিণী নরকের সাজা পায় (মুস্‌লিম ২২৪২)অন্যদিকে, এক পাপাচারী মহিলা এক তৃষ্ণার্ত কুকুরকে জল পান করিয়ে স্বর্গলাভ করে (বুখারি ৩২৮০) হয়তো এজন্যই, নবি (সা) প্রতিদিন ফজরের পর প্রথমে মুরগী-খামারের দরজা খুলে দিতেন। নিজ ঘোড়াটির ঘাড়ে হাত বোলাতেন। এমনকি, বিড়ালের সাথে এক অনুগামীর সখ্যতা দেখে তাঁকে ‘আবু হুরায়রাহ্‌’ (বিড়ালের পিতা) বলে ডাকতে আরম্ভ করেন। অতএব একজন প্রকৃত মুসলিমের সৌহার্দ্য-ক্যানভাসে ব্যক্তিজীবন, পরিবার, সমাজ ও পরিবেশ- সবার জন্য অতিযত্নে বরাদ্দ থাকবে নির্দিষ্ট স্থান এবং সৌজন্য ও শিষ্টাচারের সেই ছবি প্রকট থেকে প্রকটতর হতে থাকবে প্রতিনিয়ত। এটাই আমার প্রত্যাশা।  
(দৈনিক পূবের কলম, ১২-১০-২০১৮-তে প্রকাশিত)



       



মোনাফেক এখনো আছে...

Image result for jamal khashoggi
মোনাফেক এখনো আছে... 

বিংশ শতাব্দীর চারের দশকের শেষের দিকে আমেরিকা গেলেন সামিরা মুসা। পরমাণু নিয়ে তাঁর গবেষণার কাজকে কেন্দ্র করেই পাড়ি জমিয়েছিলেন মার্কিন মুলুকে। তখন তাঁর বয়স পঁয়ত্রিশ বছর। এই অল্প বয়সেই মিসরীয় মুসলিম মহিলা পরমাণু বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর বেশ নাম্-ডাক হয়েছিল। কিন্তু, ১৯৫২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই এক রহস্যময় সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান তিনি।

রকেট-বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার কাজ করছিলেন মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে। নাম ফাদি মোহাম্মদ আল-বাতস। তিনি ছিলেন ফিলিস্তিনের নাগরিক। সম্প্রতি নিজ কর্মস্থান কুয়ালালাম্পুরেই নিহত হন তিনি।

আরেক মিসরীয় বিজ্ঞানী ড. সামির নাজিব গবেষণা করছিলেন পরমাণু প্রযুক্তির সামরিক প্রয়োগ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৬৭ সালে তাঁকেও হত্যা করা হয় মার্কিন শহর ডেট্রয়টে।

১৯৮০ সালের জুনে, ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে রহস্যজনকভাবে নিহত হন ইরাকের পরমাণু প্রকল্পের প্রধান ড. ইয়াহ্‌ইয়া আমিন আল-মুর্শেদ। ইরাকি পরমাণু চুল্লিতে ফরাসি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার জন্য প্যারিসে গিয়েছিলেন তিনি। তিনিও ছিলেন মিসরীয়।

আরও এক মিসরীয় বিজ্ঞানী সাইদ আল-বোদায়ের'কে তার নিজ বাসভবনে গুলি করে হত্যা করে কিছু অজ্ঞাতপরিচিত দুর্বৃত্ত, ১৯৮৯ সালে। মাইক্রোওয়েভ বিষয়ে কাজ করছিলেন তিনি।
       
লেবাননের এক উদীয়মান পদার্থবিজ্ঞানী ছিলেন রামাল হাসান রামাল। ১৯৯১ সালে, প্যারিসে তাঁকেও খুন করা হয় রহস্যজনকভাবে। 

ক'বছর আগে, ২০০৪ সালে ইরানি পদার্থবিজ্ঞানী মাসুদ আলি মোহাম্মদিকে তেহরানে তাঁর বাসভবনের বাইরে হত্যা করা হয়। কণা পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করছিলেন তিনি।

গত বছর তিউনেশীয় অ্যাভিয়েশন প্রকৌশলী মোহাম্মদ আল-জাওয়ারিকে হত্যা করা হয় তাঁর দেশের মাটিতেই। ফিলিস্তিনের খুব বড় সমর্থক ছিলেন তিনি। ড্রোন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছিলেন। নিজ বাসভবনের বাইরে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ফিলিস্তিনি প্রকৌশলী হাসান আলি খাইরুদ্দিন রহস্যজনকভাবে নিহত হন। কানাডায় বিশ্ব অর্থনীতিতে ইহুদি আধিপত্য নিয়ে গবেষণা করছিলেন তিনি। না থামলে মেরে ফেলা হবে- এমন হুমকি আগে থেকেই দেওয়া হচ্ছিল ২৩ বছর বয়সী এই গবেষককে। শেষ পর্যন্ত সেন্ট ম্যারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আবাসিক এলাকায় তাঁকে হত্যা করা হয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, ফ্রান্সে হত্যা করা হয় লেবাননের আরেক বিজ্ঞান-শিক্ষার্থী হিশাম সালিম মুরাদকে। তিনি জোসেফ ফুরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরমাণু পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। 

চলতি বছরের ২৫ মার্চ, গাজার পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনি রসায়নবিদ ইমান হোসাম আর্‌-রোযাকে হত্যা করে ইসরাইল।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সম্পর্ক নিয়ে কাজ করছেন যে সকল রাজনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও সাংবাদিক তাঁদের মতে, এসব বিজ্ঞানীদের হত্যার পেছনে হাত রয়েছে বিশ্বের অত্যন্ত ক্ষমতাশালী দুই গোয়েন্দা সংস্থার। আবার অনেককে অন্য পন্থায় দমন করা হয়েছে। যেমনভাবে অত্যন্ত কৌশল করে দমন করা হয়েছে পাকিস্তানের স্নায়ুবিজ্ঞানী ড. আফিয়া সিদ্দিকিকে। তিনি ছিলেন এমআইটির গ্রাজুয়েট। নামমাত্র এক অভিযোগে তাঁকে ৮৬ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে মার্কিন সরকার। তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে পাগল বানিয়ে এক নির্মম পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে তাঁকে। আর এভাবেই সারা বিশ্বে মুসলিম বিজ্ঞানীদের হত্যা করে যেমন নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছে তারা, ঠিক তেমনই 'তিন শ তেরো'র গৌরবধারী এ জাতিকে রণ ও জ্ঞান-ক্ষেত্রে পিছিয়ে রাখার অপকৌশল করে চলেছে লাগাতার। আরব ও মুসলমানরা যাতে বিজ্ঞান, বিশেষ করে পরমাণু প্রযুক্তি ও সামরিক প্রযুক্তিতে এগিয়ে যেতে না পারে সেজন্য এই গুপ্তহত্যার পথ বেছে নিয়েছে তারা। আর কিছু মোনাফেক টাকার বিনিময়ে এমন বিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও গবেষকদের তথ্য তাদের হাতে তুলে দিয়েছে, দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেবে হয়তো।

অভিযোগ রয়েছে, সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগিও ইসলামপন্থী মানুষদের তথ্য তাদের হাতে তুলে দিতেন। অনেক সময় ইসলামপন্থীদের জঙ্গি তকমা দিয়ে লেখা কলাম বিভিন্ন মার্কিন জার্নালে প্রকাশ করতেন। আর এসবের বিনিময়ে তিনি পেতেন মোটা অংকের টাকা। তবে, এ অভিযোগ কতটা সত্য, কতটা মিথ্যা তা আমার জানা নেই। আর এ ক্ষেত্রে লক্ষ্য করছি, কিছু মানুষ অর্থাৎ সৌদি-পন্থীরা খাশোগির কুৎসা করে চলেছে। অন্যদিকে, কিছু মানুষ অর্থাৎ সৌদি-পরিপন্থীরা খাশোগির স্তুতি গাইছে। আবার যারা আসাদ-পন্থী, সিরিয়া সম্পর্কে তাঁর অভিমত ও কলামগুলোর কারণে তাঁর কুৎসা গাইছে এবং তাঁরও মৃত্যুকে 'গো আসাদ কার্স' হিসেবে বিবেচনা করছে। তাই, তার খুন যেমন মর্মান্তিক তেমনই রহস্যজনক আমার দৃষ্টিতে। হয়তো সময়ের স্রোতে সব কিছু জলের মত পরিষ্কার হয়ে যাবে, হয়তো বা অন্যান্য বহু হত্যার মত তার হত্যাও চলমান হত্যাযজ্ঞের সমুদ্রের গভীরে পলি রূপে চাপা পড়ে যাবে...!

বিঃ দ্রঃ ইসলাম কোনোভাবেই এধরণের হত্যাকে সমর্থন করে না। কারণ, ইসলাম একটি প্রাণের হত্যাকে সমগ্র মানবতার হত্যা বলে আখ্যায়িত করেছে (সুরাতু আল-মায়েদাহ ৩২)। অতএব যে কোনো হত্যার ঘটনা অবশ্যই নিন্দনীয়। এবং মুস্‌লা (অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির শরীর বিকৃত করা)-ও ইসলামে হারাম।       



Wednesday, 10 October 2018

বিবাহ ও মসজিদঃ প্রসঙ্গকথা

Related image

বিবাহ ও মসজিদঃ প্রসঙ্গকথা 
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

অনেক দিন আগে খবরে পড়েছিলামদু’জনেই ডাক্তার। কলেজ থেকেই তাঁদের আলাপ। ডাক্তারি পাশ করার পর সিদ্ধান্ত নেন বিয়ে করার। দিনক্ষণ পাকা করে বসেন বিয়ের পিঁড়িতে। সবার মত করে তাঁরাও বিয়ের গাঁটছড়া বাঁধতে উদ্যততবে আয়োজনটা ছিল অদ্ভুত রকমের। হ্যাঁ, সত্যিই বিস্ময়কর। মেয়েটি বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিল তাঁর দাদীমা’র বিয়ের শাড়ি ও গয়না পরে। আর ছেলেটি এসেছিল তাঁর বাবার বিয়ের লুঙ্গী আর পাঞ্জাবীটা গায়ে দিয়ে। দু’জনেই ততদিনে ডাক্তারি পাশ করে চাকরি পেয়ে বেশ নামডাক করে ফেলেছিল। কিন্তু বিয়ের শুভ অনুষ্ঠানটি করেছিল মহল্লার মসজিদে। ওয়ালিমায় নেমন্তন্ন করেছিল পাড়ার এতিমখানার সকল শিশুদের। পরিবার ও আত্মীয়স্বজনরাও উপস্থিত ছিল সেখানে।
আরও এক ডাক্তারের কথা বলি। তিনি বহু আলোচিত-সমালোচিত এক ব্যক্তিত্ব। তাঁর বিয়ের গল্পটাও বেশ মজার। বাড়ি থেকে মেয়ে পছন্দ করা হল। মেয়ের বাড়ি পুনেতে। বিয়ের অনুষ্ঠানের ভেন্যু নিয়ে উভয় পক্ষের মত ছিল ভিন্ন। পাত্রপক্ষ ছিল বেশ পয়সাওয়ালা। বলতে গেলে বনেদী ঘরানার। চাইলে হরহামেশায় কোনো ফাইভ সটার হোটেল হায়ার করে বিয়ের অনুষ্ঠান করতে পারে। কিন্তু ডাক্তার বাবু ছিলেন বেশ মিতব্যায়ী। সেই সাথে ধর্মপ্রাণও। তাই উভয়পক্ষকে রাজি করে বিয়ে করলেন এক মসজিদে গিয়ে। আর সেই মসজিদের পাশের হোটেলে দুটো কামরা ভাড়া করলেন আপনজনদের সুবিধার্থে। সেই মসজিদ প্রাঙ্গণেই আয়োজন করা হল তাঁর ওয়ালিমার। বিশেষ অতিথিরূপে আমন্ত্রিত হলেন ঐ মহল্লার এতিমখানার সকলে।
এবারের গল্পটা একটু ভিন্ন স্বাদের। তিনি একজন ব্যবসায়ী। বেশ বড় মাপের। ভারতজুড়ে তাঁর ব্যবসার বহর। ছেলের বিয়ে দেবেন। পাত্রীপক্ষও বেশ পয়সাওয়ালানির্ধারিত দিনে তিনটে বাস ভর্তি বরযাত্রী নিয়ে পৌঁছলেন পাত্রীর বাড়ি। আগে থেকেই কথা হয়ে ছিল, বিয়ে হবে মসজিদে। তাই সবাই উপস্থিত হলেন মসজিদে। কিন্তু বরযাত্রীর মিছিল দেখে পাত্রীর বাবার মাথায় হাত। তিনি তো এত লোকের আয়োজন করেননি। কী হবে এখন! বিস্ময়ের প্রাথমিক রেশ কাটিয়ে একটু থিতু হলেন। ফোনে হোটেল কর্তৃপক্ষকে শিগগিরি অতিরিক্ত ব্যবস্থা করতে বললেন। বিয়ে হয়ে যাবার পর পূর্ব আলোচনা অনুযায়ী প্রত্যেককে একটি করে খেজুর দেওয়া হল। তারপর পাত্রের বাবা দাঁড়িয়ে বাড়ি ফেরার ঘোষণা করলেন। সবাই যে যার জায়গায় গিয়ে বসল। পাত্রীর বাবা-কাকারা ছুটে আসলেন এসব কাণ্ডকারখানা দেখে। জিজ্ঞেস করলেন, না খেয়েদেয়েই চলে যাচ্ছেন কেন? ছেলের বাবা হাসিমুখে বললেন, ভাইজান আপনাকে তো বলেই ছিলাম, আমরা কিছু খাবো না। শুধু একটা করে খেজুর খাওয়ালেই হবে। আপনি তো তা করেছেন। আর সব থেকে বড় কথা হচ্ছে, আপনি আপনার মেয়েকে আমাদের দিয়েছেন। আর কী চাই বলুন আমাদের! আমি তো সবাইকে বলে  দিয়েছি, সবার জন্য অমুক জায়গায় ওয়ালিমার আয়োজন করা হয়েছে। মেয়ের বাবা থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করেই বসলেন, তাহলে দাদা এত লোকজন নিয়ে এলেন কেন? তিনি হাসতে হাসতে উত্তর করলেন, বিয়ে লুকিয়ে নয়, দেখিয়ে করাই সুন্নততবে এও খেয়াল রাখতে হবে, যাতে এসব যেন কোনোভাবেই মেয়ের বাবার জন্য বোঝা না হয়ে দাঁড়ায়...!
আমাদের ইতিহাসেও তো অমন কথাই পাওয়া যায়। সে-সময়ে দিনরাত সর্বক্ষণ মসজিদের ফাটক খোলা থাকত। গরিব-দুঃখী-অনাথ-আশ্রয়হীনদের মাথা গুঁজবার ঠাই ছিল মসজিদ। অনায়াসেই চলত শিশুকিশোরদের ক্রীড়াকৌতুক, মসজিদ চত্বরেই। রাজনীতির মত গুরুগম্ভীর কাজকম্মের আসরও বসত মসজিদের ভেতরে। বিদেশী দূতদের সাথে আলাপআলোচনাও হত সেখানে। সমাজের বিচার, শালিসী সভা সব। পঠনপাঠন থেকে বিবাহ আরও কতকিছু যে সংঘটিত হত মসজিদের অন্দরে, ইতিহাসের পাতায় তা ধরা আছে। সময়ের সাথে সাথে সব কোথাও হারিয়ে গেল। উবে গেল সেসব রীতি-রেওয়াজ, উধাও হয়ে গেল মসজিদ কেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থা। আস্তে আস্তে এমন হয়ে গেল যে, আজকাল দু’চারজনই দিনে-রাতে দু’চারবার মসজিদে যায়; অনেকে যায় সপ্তাহান্তে। কেউ কেউ তো তাও করে না। আর এভাবেই মসজিদ হারিয়ে ফেলেছে তার ব্যবহারিক গুরুত্ব! হয়তো তাই আজকাল মসজিদ নিয়ে ভিন্ন রকমের বয়ান দিচ্ছে ওরা!    
এসব পড়ে, জেনে, শুনে আমারও খুব ইচ্ছে ছিল, বিয়েটা করবো মসজিদে, খুব সাধারণ ভাবে। অনুষ্ঠানটা হবে খুব সিম্পল। বিয়েটা পড়াবেন কোনো প্রকৃত ‘মাওলানা’ নিজ মসজিদের মেহরাবের কাছে বসে ওয়ালিমায় অবশ্যই শামিল করবো এলাকার গরীব-দুঃখী-এতিমদের। মোহরের অর্থ নগদ আদায় করবো...। এমন অনেক ভাবনা ছিল মনে। মাইনুদ্দিন স্যারও প্রায়শই আমায় বলতেন, “আব্দুল মাতিন, বিয়েটা মসজিদে করবে এবং খুব সিম্পলভাবে করবে। যাতে সমাজের কাছে সেটা একটা নজির হয়ে থাকে।” কিন্তু, দিনের শেষে আমি ব্যর্থ হয়েছি। বৌভাতে এসে মাইনুদ্দিন স্যার স্মরণ করিয়েছিলেন সে-কথা। আক্ষেপের স্বরে বলেছিলেন,  “আব্দুল মাতিন, তুমিও পারলে না!”