Pages

Monday, 13 May 2019

আব্দুল মাতিন ওয়াসিমঃ রক্তের ধর্ম


রক্তের ধর্ম
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

পূজোয় বসেছেন বদ্রিনারায়ণ বিহারের সীতামাড়ীতে পুনাওরা ধামের কাছে এক বিখ্যাত মন্দিরের প্রধান পুরোহিত তিনি। সেই মন্দিরের দরজায় বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে— “-হিন্দু প্রবেশ নিষেধমন্দির লাগোয়া ছোট্ট বাড়িটি তাঁর। তিনি ধর্মের ব্যাপারে খুব কঠোরনিজ স্ত্রী-সন্তানদেরকেও সেভাবেই তৈরি করেছেন। তবে ছেলেদেরকে ধর্মাচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাদের পড়াশুনোর প্রতিও নজর দিয়েছেনএকটা শিক্ষানবিশি মনোভাব ছিল তাঁর মধ্যে। 

ছোট ছেলে বৈদ্য নারায়ণ বাবার মতোই ধর্মপরায়ণ দু’ বছর হল, সে এখন পাটনার কাছে এক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বি-টেক করছে। থাকে কলেজের হস্টেলে। পুরো হস্টেলে শান্ত, বিনয়ী, মিশুকে, ধর্মপরায়ণ ও মেধাবী ছাত্র হিসেবে তার বেশ সুখ্যাতি। গত পরশু বাড়ি ফিরেছে দশ দিনের ছুটিতে। আজ সকালে জলখাবার খেয়ে ডুমরা যাচ্ছিল বাইকে চেপে। সহপাঠী পারভেজের সাথে দেখা করতে। চৌমাথার মোড়ে একটি মোটরভ্যান এসে জোরে ধাক্কা মারে তার বাইককে। সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়ে পীচ রাস্তার উপর। আশেপাশের লোকজন ছুটে আসে। তাদের ক’জন মিলে তাকে নিকটবর্তী এক হাসপাতালে নিয়ে যায়। অন্যদিকে স্থানীয় দোকানদারেরা চিনতে পেরে তার বাড়িতে খবর দেয়। 

ছেলের অবস্থা খুব খারাপ। বেশ ভালোরকম রক্তক্ষরণ হয়েছে। তাই প্রচুর পরিমাণে রক্ত লাগবে। আশেপাশের দু’চারটে ব্লাডব্যাংকে খোঁজ নেওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু ছেলের ওই বিরল গ্রুপের রক্ত কোথাও মিলছে না। সবাই হন্য হয়ে খুঁজছে। অসহায় বদ্রিনারায়ণ পূজোয় বসে মনেপ্রাণে ডাকছেন কুলদেবতাকে। নতজানু হয়ে ভগবানের কাছে ছেলের জীবন ভিক্ষা চাইছেন। এমন সময় পড়িমরি করে ছুটে এলো বড় ছেলে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল 
বাবা একটা ব্লাড-ডোনার পাওয়া গেছে তার ও ভাইয়ের রক্তের গ্রুপও এক। কিন্তু ছেলেটা মুসলিম। নাম সাজিদ ডুমরা হাই স্কুলে ভাইয়ের সহপাঠী ছিল। ওর রক্ত কি দেবো ভাইয়ের শরীরে?”

উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠলেন বদ্রিনারায়তাঁর হতাশ চোখেমুখে দপ করে জ্বলে উঠল আশার আলো। নিমেষেই শান্ত হয়ে গেল বুকের ভেতর ওঠা তুফান। এবং মুখ থেকে বেরিয়ে এল এক অমোঘ বাস্তব— 
রক্তের কি কোনো ধর্ম আছে! 

২৮-০৩-২০১৮
পার্কসার্কাস, কোলকাতা 

Sunday, 5 May 2019

আল-কুরআনের ভাবানুবাদঃ (৮৯) সূরাতু আল্‌-ফ়াজ্‌র


আল্‌-কুর্‌আনের ভাবানুবাদঃ জুয্‌উ 'আম্মা (আমপারাঃ ৩০তম অধ্যায়) 

৮৯) সূরাতু আল্‌-ফ়াজ্‌র (ঊষাকাল)

 মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত ৩০, রুকু’ ১ 

بِسْمِ اللّهِ الرَّحْمـَنِ الرَّحِيمِ

আল্লাহ্‌র নামে (আরম্ভ করছি); তিনি পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু।

وَالْفَجْرِ

ঊষার শপথ,

وَلَيَالٍ عَشْرٍ

(জুল্‌হিজ্জা মাসের প্রথম) দশটি রাতের শপথ,

وَالشَّفْعِ وَالْوَتْرِ

(মহান আল্লাহ্‌র সৃষ্টিকূলেরর মাঝে সকল) জোড় ও বিজোড় বস্তুর শপথ,

وَاللَّيْلِ إِذَا يَسْرِ

এবং রাতের শপথ যখন তা গত হতে থাকে,

هَلْ فِي ذَلِكَ قَسَمٌ لِّذِي حِجْرٍ

নিঃসন্দেহে এসবের মধ্যে জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। 

أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِعَادٍ

(হে মুহাম্মদ সাঃ) তুমি কি লক্ষ্য করোনি, তোমার প্রতিপালক ‘আদ জাতির সাথে কীরূপ আচরণ করেছিলেন?  

إِرَمَ ذَاتِ الْعِمَادِ

ইরাম গোত্রের সাথে, যারা (দৈহিক গঠনে) স্তম্ভ ও খুঁটির ন্যায় দীর্ঘ ছিল?

الَّتِي لَمْ يُخْلَقْ مِثْلُهَا فِي الْبِلَادِ

তাদের মতো (শক্তিশালী ও বলবান) দ্বিতীয় কোনো জাতি সারা বিশ্বে সৃজিত হয়নি।  

وَثَمُودَ الَّذِينَ جَابُوا الصَّخْرَ بِالْوَادِ

এবং (কীরূপ আচরণ করেছিলেন) সামুদ জাতির সাথে যারা উপত্যকার মাঝে পাথর কেটে গৃহ নির্মাণ করেছিল?

وَفِرْعَوْنَ ذِي الْأَوْتَادِ

এবং (কীরূপ আচরণ করেছিলেন) বহু কীলকের (অর্থাৎ বিশাল সৈন্যবাহিনী ও দৃষ্টিনন্দন নির্মাণসমূহের) অধিপতি ফির্‌‘আউনের (অর্থাৎ ফারাওয়ের) সাথে?

الَّذِينَ طَغَوْا فِي الْبِلَادِ

যারা পৃথিবীর বুকে (নানা বিষয়ে মহান স্রষ্টার নির্ধারিত) সীমা লঙ্ঘন করেছিল;

فَأَكْثَرُوا فِيهَا الْفَسَادَ

এবং নানা ধরণের বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল।

فَصَبَّ عَلَيْهِمْ رَبُّكَ سَوْطَ عَذَابٍ

আর তাই তোমার প্রভু তাদের উপর নানা ধরণের শাস্তির কশাঘাত হেনেছিলেন।  

إِنَّ رَبَّكَ لَبِالْمِرْصَادِ

নিশ্চয় তোমার প্রভু (তাদের জন্য) ঘাটিতে ওঁৎ পেতে রয়েছেন (অর্থাৎ তাদের উপর সতর্ক দৃষ্টি রেখেছেন)।  

فَأَمَّا الْإِنسَانُ إِذَا مَا ابْتَلَاهُ رَبُّهُ فَأَكْرَمَهُ وَنَعَّمَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَكْرَمَنِ

আর মানুষ এমনই যে, যখন তার পালনকর্তা তাকে পরীক্ষা করার জন্য (সমাজের চোখে) তাকে সম্মানিত করে তোলেন এবং তাকে প্রচুর সুখ ও সম্পদ দান করেন তখন সে (উল্লসিত হয়ে) বলেঃ আমার প্রভু আমাকে সম্মানিত ও মর্যাদাবান করেছেন।

وَأَمَّا إِذَا مَا ابْتَلَاهُ فَقَدَرَ عَلَيْهِ رِزْقَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَهَانَنِ

কিন্তু যখন তাকে পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে (তার প্রভু) তার জীবিকা ও আয়-উপার্জন সংকুচিত করে দেন তখন সে বলেঃ আমার প্রভু আমাকে (সমাজের কাছে) হেয় প্রতিপন্ন করেছেন। 

كَلَّا بَل لَّا تُكْرِمُونَ الْيَتِيمَ

এ কথা একেবারেই অমূলক। বরং তোমরাই অনাথদের স্নেহ করো না (তোমরা কখনো তাদেরকে প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করো তো কখনো তাদের অর্থ-সম্পদ জবরদখল করো)।  

وَلَا تَحَاضُّونَ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِينِ

এবং অভাবগ্রস্তদের অন্ন দানে তোমরা পরস্পরকে উৎসাহিত করো না।

وَتَأْكُلُونَ التُّرَاثَ أَكْلًا لَّمًّا

তাছাড়া, মৃত ব্যক্তির ত্যাজ্য সম্পত্তি সম্পূর্ণ রূপে কুক্ষিগত করে রাখো।

وَتُحِبُّونَ الْمَالَ حُبًّا جَمًّا

এবং ধন-সম্পদকে অত্যাধিক মায়া করো।

كَلَّا إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكًّا دَكًّا

এটা একেবারেই অনুচিত। (শোনো) যখন পৃথিবীকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেওয়া হবে;

وَجَاء رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا

এবং তোমার প্রতিপালক আসবেন আর তাঁর সাথে সারি সারি ফেরেশ্‌তারা;

وَجِيءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ يَتَذَكَّرُ الْإِنسَانُ وَأَنَّى لَهُ الذِّكْرَى

সেদিন জাহান্নামকে হাজির করা হবে, সেদিন মানুষ (মহা সত্যকে) উপলব্ধি করবে, কিন্তু তার এই উপলব্ধি কোনো কাজেই আসবে না!

يَقُولُ يَا لَيْتَنِي قَدَّمْتُ لِحَيَاتِي

সে বলবেঃ হায়, আমি যদি আমার এই জীবনের জন্য কিছু (পুণ্য অর্জন করে) পাঠিয়ে রাখতাম (তাহলে আজ তার সুফল পেতাম)! 

فَيَوْمَئِذٍ لَّا يُعَذِّبُ عَذَابَهُ أَحَدٌ

সেদিন কেউই আল্লাহ্‌র শাস্তির মতো (কঠিন) শাস্তি দিতে পারবে না।

وَلَا يُوثِقُ وَثَاقَهُ أَحَدٌ

এবং কেউই তাঁর মতো করে দৃঢ় ভাবে (দুর্বৃত্ত ও অবাধ্যদের) আবদ্ধ করতে পারবে না।

يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ

(অতঃপর সৎ ও বিশ্বাসী লোকেদের উদ্দেশ্যে বলা হবে) হে প্রশান্ত আত্মা!

ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَّرْضِيَّةً

তুমি ফিরে এসো তোমার প্রভুর নিকট সন্তুষ্ট ও সন্তোষ-ভাজন হয়ে।

فَادْخُلِي فِي عِبَادِي

অতঃপর আমার (আশীর্বাদপুষ্ট) অনুগতদের দলে শামিল হয়ে যাও।

وَادْخُلِي جَنَّتِي

এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।

Saturday, 4 May 2019

আল-কুরআনের ভাবানুবাদঃ (৯০) সূরাতু আল্‌-বালাদ


আল্‌-কুর্‌আনের ভাবানুবাদঃ জুয্‌উ 'আম্মা (আমপারাঃ ৩০তম অধ্যায়)


৯০) সূরাতু ল্‌-বালাদ (নগর)

মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত-২০, রুকু- ১

بِسْمِ اللّهِ الرَّحْمـَنِ الرَّحِيمِ

আল্লাহর নামে (শুরু করছি); তিনি পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু।

لَا أُقْسِمُ بِهَذَا الْبَلَدِ

শোনো! আমি এই (মক্কা) নগরীর শপথ করছি,

وَأَنتَ حِلٌّ بِهَذَا الْبَلَدِ

আর (আজ, মক্কা বিজয়ের দিনে) এই (মক্কা) নগরীতে (অস্ত্র ধারণ ও শাস্তি প্রদানের ব্যাপারে) তোমার উপর কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই।

وَوَالِدٍ وَمَا وَلَدَ

এবং আমি শপথ করছি আদি পিতা (অর্থাৎ আদম আঃ)-এর আর যাদেরকে তিনি জন্ম দিয়েছেন (অর্থাৎ তাঁর সন্তানসন্ততিদের)।

لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي كَبَدٍ

নিশ্চয় আমি মানুষকে শ্রমনির্ভর রূপে সৃষ্টি করেছি।

أَيَحْسَبُ أَن لَّن يَقْدِرَ عَلَيْهِ أَحَدٌ

তবুও কি সে মনে করে যে, তার উপর কেউ কখনো ক্ষমতা লাভ করবে না?

يَقُولُ أَهْلَكْتُ مَالًا لُّبَدًا

সে তো (দম্ভ ভরে) বলেঃ আমি প্রচুর ধন-সম্পদ ব্যয় করেছি।

أَيَحْسَبُ أَن لَّمْ يَرَهُ أَحَدٌ

আচ্ছা সে কি এমনটা ভাবে যে, তাকে কেউ দেখছে না?

أَلَمْ نَجْعَل لَّهُ عَيْنَيْنِ

(সে কেনো অন্ধের মতো বিচরণ করছে!) আমি কি তাকে দু’টো চোখ দিইনি?

وَلِسَانًا وَشَفَتَيْنِ

একটা জিহবা ও দু’টো ঠোঁট দিইনি?

وَهَدَيْنَاهُ النَّجْدَيْنِ

বস্তুতঃ আমি তো তাকে (ভালো ও মন্দ) দু’টো পথই দেখিয়ে দিয়েছি।

فَلَا اقْتَحَمَ الْعَقَبَةَ

কিন্তু সে দুর্গম গিরিতে (যে দুরারোহ ও দুর্গম পথ মানুষকে সততা ও সফলতার দিকে নিয়ে যায়) প্রবেশ করেনি।

وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْعَقَبَةُ

আচ্ছা, দুর্গম পথ কোন্‌টি— সে বিষয়ে তুমি কী জানো?

فَكُّ رَقَبَةٍ

(শোনো) দুর্গম পথ হচ্ছে কোনো দাসকে মুক্তি দেওয়া,  

أَوْ إِطْعَامٌ فِي يَوْمٍ ذِي مَسْغَبَةٍ

অথবা দুর্ভিক্ষের দিনে (নিঃস্ব ও অভাবীদেরকে) অন্ন দান করা;  

يَتِيمًا ذَا مَقْرَبَةٍ

(অন্ন দান করা) কোনো অনাথ আত্বীয়কে,

أَوْ مِسْكِينًا ذَا مَتْرَبَةٍ

অথবা ধূলায় ধূসরিত কোনো দরিদ্র্যকে।

ثُمَّ كَانَ مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ وَتَوَاصَوْا بِالْمَرْحَمَةِ

অতঃপর তাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া, যারা (ইসলামের একেশ্বরবাদে) বিশ্বাস করে এবং পরস্পরকে উপদেশ দেয় ধৈর্য ধারণ করার ও একে অন্যের প্রতি সহমর্মিতা ও করুণা প্রদর্শনের।

أُوْلَئِكَ أَصْحَابُ الْمَيْمَنَةِ

প্রকৃতার্থে তারাই ডানপন্থী ও সৌভাগ্যবান।

وَالَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِنَا هُمْ أَصْحَابُ الْمَشْأَمَةِ

আর যারা আমার আয়াতসমূহ অর্থাৎ নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করে তারাই প্রকৃত হতভাগা।

عَلَيْهِمْ نَارٌ مُّؤْصَدَةٌ

তারা (কোনো রকমের জানালা ও বাতায়ন ছাড়াই) অগ্নি পরিবেষ্টিত অবস্থায় বন্দী থাকবে।