Pages

Wednesday, 1 June 2022

আব্দুল মাতিন ওয়াসিমঃ এবং মা, মা, মা...!

 


এবং মা, মা, মা...!  
 
গল্পটা মা একদিন আমাকে শুনিয়েছে আমি তখন খুব ছোট বয়স দেড় কি দুবছর সারা শরীরে ঘা বেরিয়েছে ঘায়ের কী ভয়ানক চেহারা প্রথমে ফুসড়ির মতো ছোট তারপর ফুলেফেঁপে ঢোল ধীরে ধীরে পুরোটা জলে ভরে উঠছে  আশেপাশের ডাক্তার দেখিয়ে তেমন কোনো ফল মেলেনি তখন আমাদের গ্রাম থেকে ১৩/১৪ কিলোমিটার দূরে ইকড়াকুড়ি নামের এক গ্রামে একজন খুব ভালো ডাক্তার ছিলেন নাম কাসেম ডাক্তার মাবাবা দুজনে মিলে ঠিক করলেন, সেখানেই নিয়ে যাবে অতটা পথ পেরোতে বেশ কষ্ট পেতে হতো তখন মাধ্যম বলতে গরুর গাড়ি বা সাইকেল আর তা নাহলে পায়ে হেঁটে স্নেহ মমত্ব একজন মাকে এমন শক্তিশালী করে তোলে যে, মায়েরা যে-কোনো কঠিন পর্বতও ডিঙিয়ে এগিয়ে যেতে পাড়ে স্বভাবতই মাবাবা আমাকে নিয়ে ছুটলেন ডাক্তারের কাছে মাঝে টাঙ্গন নদী নদীর তীরে উপস্থিত হয়ে দেখলেন, স্রোত বইছে বেশ জোরে মাঝির দেখা নেই কূলকিনারা না পেয়ে মাশাড়িটা খুলে গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে নদীতে নেমে পড়লেন স্রোতের তীব্রতাকে খানখান করে মাবাবা উভয়ে নদীর ওপারে পৌঁছে গেলেন পাড়ে উঠে মা ওই চাদর ছেড়ে আবার শাড়ি পরলেন তারপর উভয়ে আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন ডাক্তার সব বৃত্তান্ত দেখেশুনে ওষুধ লিখলেন সাথে বলে দিলেন, বাচ্চাটার অবস্থা খুব ভালো নয় আজকেই যে করে হোক ওষুধ এনে খাওয়াতে হবে

ডাক্তার বাবুর কথা শোনে মাবাবা উভয়ে খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন ওষুধ আশেপাশে কোথাও পাওয়া যাবে না, ডাক্তার বাবু তা বলেই দিয়েছেন কাছাকাছির মধ্যে একমাত্র কুশমুণ্ডিতেই পাওয়া যাবে বাধ্য হয়ে বাবা ডিসিশন নিলেন, তিনি ওষুধ আনতে কুশমুণ্ডি যাবেন কিন্তু বাড়ি গেলে তো দেরী হয়ে যাবে ঠিক করলেন, বাবা ওখান থেকেই বেরিয়ে যাবেন আর মা আমাকে নিয়ে ফিরবেন কুশমুণ্ডি ওখান থেকে আরও ১২/১৩ কিলোমিটার হবে অতঃপর বাবা যখন মাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি একা বাড়ি ফিরতে পারবে? মা সহসা উত্তর দিলেন, তুমি আমাকে নদীটা পার করে দিয়ে আসো বাকিটা আমি একা চলে যেতে পারবো

বাবা মাকে নদী পার করিয়ে দিয়ে হেঁটে হেঁটে কুশমুণ্ডির পথে রওয়ানা দিলেন অন্যদিকে মাআমাকে কোলে নিয়ে একা এলোপাথাড়ি হাঁটতে আরম্ভ করলেন মাগুরাকুড়ির খাঁ খাঁ মাঠ চারিদিকে কেউ কোথাও নেই মাঝখানে একটা আম গাছ, তার আগে আকাশ ফাটানো রোদে কোথাও যে একটু জিরিয়ে নেবে তারও কোনো উপায় নেই উপরন্তু রমজান মাস, মা আবার রোজা রেখেছেন একা হাতের সংসার, বাড়ি ফিরে রান্নাবান্না সব করতে হবে নানা চিন্তা মাথায় কিলবিল করছে তখন আর তারই জেরে হাঁটার ছন্দ কেমন খাপছাড়া হয়ে যাচ্ছে সৌভাগ্যক্রমে কিছুটা পথ পেরোতেই আমাদেরই গ্রামের এক মহিলার সাথে মা দেখা তারপর দুজনে মিলে হাঁটতে হাঁটতে গ্রামে পৌঁছে গেলেন আর ওদিকে বাবা হেঁটে হেঁটে কুশমুণ্ডি গেলেন নানা ফার্মেসী ঘুরে ওষুধ নিয়ে আসলেন মাডাক্তারের বাতলে দেওয়া নুসখা মোতাবেক নানা উপায়-উপকরণ সহ ওষুধ খাওয়ালেন এবং আল্লাহ্ অশেষ রহমত কৃপায় আমি সুস্থ হয়ে উঠলাম। 

আর তাই, মাশব্দের প্রতিশব্দ খুঁজতে গেলে আমার মাথায় কেবল একটাই শব্দ ঘুরে ফিরে আসে, তা হল আত্মত্যাগ আমি মনে করি মাতৃত্ব একটা জার্নি আর এই জার্নির শুরু থেকে শেষ অবধি মায়েরা নানা আঙ্গিকে, নানা ভাবে নানান রকমের সেক্রিফাইস করতে থাকেন হয়তো এসব কারণেই আমার স্রষ্টা নির্দেশ দিয়েছেন, “তোমার মাবাবা অসন্তুষ্ট হলে আমিও অসন্তুষ্ট হবো আর তাঁরা সন্তুষ্ট থাকলে আমিও সন্তুষ্ট থাকবো
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
বাঁশকুড়ি, দঃ দিনাজপুর
০৯-০৫-২০২১

আব্দুল মাতিন ওয়াসিমঃ এই দেশ এই মাটি আমার

 



এই দেশ এই মাটি আমার
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
 
আমি ভারতীয়—
জন্মেছি এখানে, এখানেই হয়েছি বড়  
এখনেই মৃত্যু হবে হয়তো  
আমি মানি না এই বিভেদের রেখা
চাই না স্বার্থের হানাহানি, রাজনীতির কচকচানি
ধর্মের মেরুকরণে কলুষিত হোক
ভারতের আকাশ বাতাস, চাই না আমি
আমার মতো আধপেটা-খাওয়া কেউই চায় না
আজ আমি দিশেহারা  
বেতনভুক পাগলদের প্রলাপে  
আদর্শের পসরা সাজিয়ে
অবিরাম কথা বিক্রি করে যারা
তারা সকলেই একচোখা।  
 
আমি চাই না তাঁদের আদর্শ, তাঁদের প্রলাপ
আমি চাই দু’ মুঠো খাবার, ডাল ভাত দিলেই হবে
চাই না মাংস, গরুর হোক বা শূকরের  
আমি চাই, পালন করুক যে যার ধর্ম
মৃত্যুর পরে জবাব দেবে প্রভুর নিকট
দাহ করো না আমায়, ছাই নদী পেরিয়ে সাগরে
কোথায় কোন দেশে যায় হারিয়ে  
মৃত্যুর প এই মাটিতেই দাফন করো আমায় 
এই দেশ এই মাটি আমার।।
 
৩১/১২/২০১৫
তপ্সিয়া, কলকাতা

আব্দুল মাতিন ওয়াসিমঃ মরীচিকা

 



মরীচিকা
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম  
 
বিভোর মনে আজও স্বপ্নে দেখি
ঠোঁটে এক চিলতে হাঁসি নিয়ে
বিস্ফারিতে চোখে আমার পানে চেয়ে
সে আমাকে কাছে ডাকছে;
আর আমি, তাঁর ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়া
 হাতের কোমল স্পর্শ পাবার আশায় 
দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে
পাগলের মতো ছুটে যাচ্ছি তাঁর দিকে;
কিন্তু সে তো মরীচিকা!

আব্দুল মাতিন ওয়াসিমঃ আবু নুওয়াসের শেষের কবিতা

 


 
আবু নুওয়াসের শেষের কবিতা
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
 
আবু নুওয়াস। আব্বাসী যুগের একজন বিখ্যাত আরবি কবি। প্রকৃত নাম আল্‌-হাসান বিন্‌ হানী। জন্ম আল্‌-আহ্‌ওয়াজে ৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে আর মৃত্যু বিখ্যাত বাগদাদ নগরীতে ৮১৪ খ্রিস্টাব্দে। গোলাপের শহর বাসরাতে লালিতপালিত হলেও জীবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেছে বাগদাদে। খলীফা হারুন আল্‌-রাশীদ ও পুত্র মামুন আল্‌-রাশীদ এবং অত্যন্ত প্রতিভাধর আল্‌-বারামিকাহ্‌ পরিবারের কাছের মানুষ ছিলেন তিনি।
 
তাঁর কবিতায় অশ্লীল ও অশালীন উপজীব্য প্রচুর। মদের বিবরণে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাই তাঁকে শায়েরুল খামর বা মদের কবি বলা হয়। তাঁর কাব্যিক উপাদান ও স্বেচ্ছাচারিতা সহ নানা কারণে অনেকে তাঁর প্রচুর সমালোচনা করেছেন। বহু সমকালীন বিদ্বান ও ওলামা তাঁর সম্পর্কে কুফ্‌র ও নাস্তিক্যবাদের অভিযোগও তুলেছেন। তিনি তাঁর একটি কবিতায় লিখেছেন

دع المساجد للعبّاد تسكنها       وطُف بنا حول خَمَّار لِيُسقينا
ما قال ربُكَ ويلٌ للذين سَكروا    ولكنه قال ويلٌ للمُصلينَا

মসজিদ আবিদ ও উপাসকদের জন্য রেখে দাও। তুমি আমাদের নিয়ে চলো কোন পানশালায়
যাতে সাকী আমাদের পান করায় উতকৃষ্ট সুরা।
প্রভু তো কোথাও বলেননিউন্মাদদের জন্য দুর্ভোগবরং তিনি বলেছেন, দুর্ভোগ নামাজিদের জন্য!
 
তাঁর কবিতায় এধরণের অনেক কথাই পাওয়া যায়। কোথাও ব্যঙ্গাত্মক স্বরে তো কোথাও স্বচ্ছাচারিতার দরুন। আর তাঁর এধরণের কাব্যকবিতার জন্যই একসময় খলিফা হারুন আল্‌-রাশীদ তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের ফরমান জারি করেন। অতঃপর যখন কবিকে আত্মপক্ষ আলোচনা ও ডিফেন্সের অবকাশ দেওয়া হয়কবি বলেন ইয়া আমিরাল্‌ মুমেনী (অর্থাৎ হে বিশ্বাসীদের নেতা ও শাসক)কবিরা তাঁদের কবিতায় এমন অনেক কথা বলে থাকে যা তাঁরা বিশ্বাস করে না বা যে কাজগুলো তাঁরা নিজেরা করেন না। তাঁর এমন যুক্তি ও কথা শুনে খলিফা তাঁকে ক্ষমা করে দেন।
 
পরবর্তীতে যখন তাঁর মৃত্যু হল। তাঁর কাব্যিক উপজীব্য, স্বেচ্ছাচারী জীবনযাপন ও মাদকাসক্তির দরুন সমকালীন বিখ্যাত ধর্মতত্ত্ববিদ ইমাম শাফেয়ী (রাহঃ) তাঁর জানাযার নামাজ পড়াতে অমত প্রকাশ করেন। কিন্তু কবিকে গোসল করাতে গিয়ে লোকেরা তাঁর পোশাকের ভেতর ছোট্ট একটি চিরকুটে লেখা একটা কবিতা পেলোযা তিনি মৃত্যুর পূর্বে লিখেছেন বলে অনেকের অনুমান। তিনি ওই কবিতায় বলেছেন— 

يا رب إن عظُمت ذُنُوبي كَثرةً   فقد علمتُ بأن عفوك أعظم
إن كان لا يرجوك إلا مُحسِنٌ    فبمن يلوذُ ويستَجِيرُ المُجرِمُ
أدعوك ربي كما أمرت تَضرُعاً   فإذا رَدَدتّ يدي فمن ذَا يَرحمُ
مالي إليك وسيلةٌ إلا الرَجَا       وجَميلُ عَطفِكَ ثم إني مُسلِمُ

প্রভু
আমার পাপ অনেক, আমার গুনাহ একেবারে পর্বতসম। তবে আমি জানিতোমার ক্ষমা তারচেয়ে অনেকঅনেক বেশি।
যদি শুধু সৎ ও ভালো লোকেরাই তোমার কাছে করুনা আশা করবেতাহলে আমরা পাপীরা কার নিকট আশ্রয় চাইবোকার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবো?!
প্রভুতুমি যেমন আদেশ করেছোআমি বিনয়ী হয়ে তোমাকে ডাকছিযদি তুমি আমাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দাওতাহলে কে আমার প্রতি রহম করবে!
তোমার কাছে চাওয়ার জন্য আমার নিকট কোনো উল্লেখযোগ্য ওসিলা বা মাধ্যম নেইতোমার প্রতি আস্থাআশা ও তোমার অশেষ অনুগ্রহ ছাড়া। তাছাড়া প্রভুআমি তো মুসলিমতোমার অসীম ক্ষমতাপ্রভুত্ব ও অনুগ্রহে বিশ্বাসী।
 
তাঁর এই লাইনগুলো পড়ার পর ইমাম শাফেয়ী (রাহঃ) অঝোরে কাঁদতে আরম্ভ করেনসেই সাথে উপস্থিত লোকজনও কাঁদতে আরম্ভ করে। অতঃপর সকলে মিলে তাঁর জানাযার নামাজ আদায় করে তাঁকে সমাধিস্থ করেন— রাহেমাহুল্লাহ্‌ (মহান আল্লাহ্‌ তাঁর প্রতি করুণা করুক), আমীন!

মাহমুদ দারবিশঃ আহ্বান ও চ্যালেঞ্জ

 



আহ্বান ও চ্যালেঞ্জ 
মূলমাহমুদ দারবিশফিলিস্তিন
অনুবাদআব্দুল মাতিন ওয়াসিম 

শোনোপারলে কোমর বেঁধে নেমে পড়ো
আমাকে শক্ত করে বেঁধে ফেলো
আর ছিনিয়ে নাও আমার থেকে আমার খাতা
কেড়ে নাও আমার সিগারেট
মাটি দিয়ে বন্ধ করে দাও আমার মুখ;  
তবেমনে রেখো   
কবিতা হল হৃদয়ের রক্ত
কবিতা রুটির লবণ
কবিতা চোখের জল
কবিতা লেখা হয় নখ দিয়ে
লেখা হয় চোখের কোটর দিয়ে
কবিতা লেখা হয় খঞ্জর দিয়ে।
আর আমি তা উচ্চারণ করি
প্রতীক্ষালয়ে   
গোসলখানায়
আস্তাবলে
চাবুকের নীচে
হাতে হাতকড়া পরে
শিকলের সহিংসতা
লক্ষ লক্ষ পাখি
আমার হৃদয়ের ডালপালায়
সৃষ্টি করছে এক যুদ্ধংদেহী সুর।



تحد

محمود درويش

 

شُدّوا وثاقي
وامنعوا عني الدفاتر
والسجائرْ
وضعوا التراب على فمي
فالشعر دمُّ القلب..
ملح الخبز..
ماءُ العينِ
يكتب بالأظافر والمحاجر
والحناجر
سأقولها
في غرفة التوقيف.
في الحمام..
في الإسطبل..
تحت السوط..
تحت القيد.. في عنف السلاسل:
مليون عصفور
على أغصان قلبي
يخلق اللحن المقاتل