Pages

Saturday, 17 October 2020

নবী (সাঃ)—আমলের সামরিক অভিযানঃ কিছু কথা

 

  নবী (সাঃ)—আমলের সামরিক অভিযানঃ কিছু কথা
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
 
ইসলাম যে কোনো প্রকারের কলহ-বিবাদ, দমনপীড়ন ও ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এবং শান্তির পথে বিঘ্ন সৃষ্টি করে এমন সকল কাজকে নিরুৎসাহিত করেছে। তবে ক্ষেত্র বিশেষে ইসলাম যুদ্ধের অনুমতি দিয়েছে; আর তা সত্য-প্রচার, ন্যায়বিচার ও সুশাসন-প্রতিষ্ঠা করা এবং মানবাধিকার সংরক্ষনের ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্যে
 
রাসূল (সাঃ) যখন মক্কায় ইসলামের নীতিনৈতিকতার প্রচার আরম্ভ করেন দাম্ভিক কোরায়েশ নেতারা তাঁর বিরোধী হয়ে যায়তাঁর ও তাঁর অনুগামীদের প্রতি অকথ্য অত্যাচার আরম্ভ করেবাধ্য হয়ে তিনি মাতৃভূমি মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় আশ্রয় নেন; একে একে তাঁর অনুগামীরাও। অন্যদিকে, মদিনায় তাঁদের আপ্যায়ন ও সমর্থন দেখে কোরায়েশ নেতারা তাঁদের বিরুদ্ধে নানাবিধ চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র করতে শুরু করে আর তখনই তাদের ওই আক্রমণকে প্রতিহত করার জন্য অস্ত্র ধারণের অনুমতি দেওয়া হয় [সূরা আল্‌-হাজ্জ ৩৯]
 
তবে, রাসূল (সাঃ) যুদ্ধের সময় কিছু সুনির্দিষ্ট নীতি অনুসরণ করে চলতেন এবং নিজ অনুগামী ও অনুসারীদেরকে সেই নীতিমালা কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেন। তিনি (সাঃ) তাঁদেরকে আদেশ করেন যুদ্ধের সময় কোনো নারী, শিশু, ধর্মীয় পুরোহিত (পাদ্রী), শ্রমিক, যুদ্ধ হতে বিরত সাধারণ মানুষ এবং আত্মসমর্পণকারী সৈনিকদের হত্যা না করার। তিনি তাঁদেরকে এও আদেশ করেন যে, তাঁরা যেন অন্য ধর্মের লোকেদের ধর্মস্থল গির্জা-মন্দির, সাধারণ সম্পত্তি, শস্যখেত, ফলদায়ক গাছ, বাগান ইত্যাদি ধ্বংস না করে। এমনকি সামান্য ক্ষতিও না করে। যুদ্ধ চলাকালীন কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয়ে যাতে কোনো প্রাণীসম্পদ ধ্বংস না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখর নির্দেশ দেন তিনি (সাঃ) [বুখারি ৩০১৪, মুসলিম ১৩৬৪, আবু দাউদ ২৬৬৯, আস্‌-সিয়াসাতুশ্‌ শার্‌‘ইয়্যাহ্‌ ইব্‌নু তাইমিয়াহ্‌ ১৬৬] 
 
তাঁর জীবদ্দশায় বহু রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছে। তিনি নিজেও একাধিক লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন। ঐতিহাসিক ও সীরাত-পণ্ডিত আল্লামা সাইয়েদ সুলায়মান মান্‌সুরপুরী নিজ গ্রন্থ রাহ্‌মাতুল্‌ লিল্‌-‘আলামীন-এ মোট ৮২টি অভিযানের তালিকা দিয়েছেন যেগুলি নবী-আমলে সংঘটিত হয়েছিলতাঁর ওই তালিকার সাথে আর এক বিদগ্ধ সীরাত-রচয়িতা আল্লামা সাফিউর রাহ্‌মান মুবারকপুরী’র নিজ কালজয়ী রচনা আর্‌-রাহ়ীক়ুল্‌ মাখ্‌তূম-এ প্রদত্ত তালিকা মেলালে মোট ৮৬টি অভিযানের তথ্য পাওয়া যায়। 
 
মদিনা-জীবনের আট বছরে সংঘটিত ওই ৮৬টি অভিযানের মধ্যে ২৯টি ছিল গায্‌ওয়াহ, যে অভিযানগুলিতে নবী (সাঃ) নিজে শরীক হয়েছিলেন [বুখারি ৩৯৪৯] এবং বাকি ৫৭টি সারিইয়াহ্‌, যে অভিযানগুলিতে নবী (সাঃ) নিজে শরীক হননি; তাঁর অনুমতিতে তাঁর অনুগামীরা পরিচালনা করেছিলেন। এই ৮৬টি অভিযানে উভয় পক্ষে নিহত ও শহীদদের যে তালিকা আল্লামা মান্‌সুরপুরী দিয়েছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে, মুসলিম পক্ষে শহীদ হয়েছেন ২৫৯ জন এবং অমুসলিম পক্ষে নিহত হয়েছে ৭৫৯ জন। উভয়পক্ষে সর্বমোট নিহতের সংখ্যা ১০১৮ জন। কিন্তু তাঁর সাথে মুবারকপুরীর বর্ণনা মেলালে দেখা যাচ্ছে, মুসলিম পক্ষে ৩৩৯ জন এবং অমুসলিম পক্ষে ১০৯১ জন নিহত হয়েছে। এই মতপার্থক্য এই জন্য যে,মান্‌সুরপুরী সারিইয়া ইবনু আবিল আওজা-তে মুসলিম পক্ষে ৪৯ জন শহীদ বলেছেন, যা ৩৩৯ জন নিহতের হিসাবে ধরা হয়েছে। কিন্তু মুবারকপুরী বিষয়ে কিছু বলেননি। অন্যদিকে, গায্‌ওয়া বানু কুরায়যাতে ইহুদীপক্ষে নিহতের সংখ্যা মানসুরপুরী ৪০০ বলেছেন। কিন্তু মুবারকপুরী ৬০০ থেকে ৭০০-এর মধ্যে বলেছেন। এছাড়া ৭টি সারিইয়ায় প্রতিপক্ষের নিহতের সংখ্যা উল্লেখ না করে বলা হয়েছে কিছু লোকঅতএব অমুসলিম পক্ষে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। উল্লেখ্য যে, সবচেয়ে বড় ৯টি যুদ্ধে অর্থাৎ বদর, উহুদ, ন্দক়, খায়বা, মুতা, মক্কা বিজয়, হোনায়েন, ত়ায়েফ ও তাবূক যুদ্ধে মুসলিম পক্ষে যথাক্রমে ১৪, ৭০, , ১৮, ১২, , , ১২, ০০ মোট ১৪০ জন এবং কাফের পক্ষে ৭০, ৩৭, ১০, ৯৩, ০০, ১২, ৭১, ০০, ০০ মোট ২৯৩ জন সহ সর্বমোট ৪০৩ জন নিহত হয়েছে। তবে তাবূক যুদ্ধে কোনো পক্ষে হতাহত হয়নি।
 
এই অভিযানগুলির মধ্যে মোট ২১টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে কোরায়েশদের বিরুদ্ধে, ৮টি ইহুদীদের বিরুদ্ধে, ৬টি খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে এবং ৫১টি পরিচালিত হয়েছে নাজ্‌দ ও অন্যান্য এলাকার বেদুঈন গোত্র ও সন্ত্রাসী-ডাকাত দলের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে তিনটি (২৪- বা’সুর্‌ রাজী’, ২৫- বীর মা’উনাহ্‌ ও ৩৭- হুদায়বিয়া) ছিল স্রেফ তাবলীগী কাফেলা বা প্রচারণামূলক অভিযান। ২৪ ০ ২৫ উভয় অভিযানে ওই অঞ্চলের লোকেরা নবী (সাঃ)-এর কাছে ইসলামের নীতিমালা শেখাতে পারবেন এমন কিছুজনকে পাঠাতে অনুরোধ করেছিল। কিন্তু প্রতারণা করে যাদেরকে নবীজি ইসলাম ও শিষ্টাচার শেখানোর জন্য প্রেরণ করেছিলেন তাদের প্রায় সবাইকে হত্যা করা হয়।
 
প্রথম দিকে কোরায়েশদের মূল লক্ষ্য ছিল নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) ও মুষ্টিমেয় মুসলমানদের নির্মূল করা এবং তাদের এই আক্রোশের মূলে ছিল ধর্মবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব। হিজ্‌রত-পরবর্তী সময়ে, মুসলমানদের সাথে তাদের সংঘর্ষের প্রধান লক্ষ্য ছিল মদিনা হয়ে সিরিয়া যাওয়ার তাদের বাণিজ্যিক পথকে নিরাপদ ও কণ্টকমুক্ত করা। সেই সাথে ভূখণ্ড জুড়ে নিজেদের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তাদের বহিষ্কৃত সন্তান তাদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করবে, এটা তারা মেনে নিতে পারেনি। তাদের এই ক্ষোভ ও বিদ্বেষকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধের স্ফুলিঙ্গ জ্বালাতে সদা তৎপর ছিল সে-সময়ের অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। তাই কারণ, স্থান ও পটভূমির নিরিখে মক্কা বিজয়-পূর্বের এই অভিযানগুলির অধিকাংশই ছিল প্রতিরোধমূলক। বদর সহ প্রথম দিকের ৯টি অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল কোরায়েশদের বাণিজ্য কাফেলায় আঘাত করে তাদের আর্থিক মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেওয়া এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ প্রস্ত্ততি ভন্ডুল করা।
 
অন্যদিকে, ইহুদিদের বিরুদ্ধে করা অভিযানগুলি ছিল তাদের চুক্তিভঙ্গের কারণে এবং অবিরত চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের কারণে। মদিনায় খ্রিস্টানদের তেমন কোনো তৎপরতা ছিল না। তবে সিরিয়ার নিকটবর্তী দূমাতুল জান্দালে প্রথম যে অভিযানটি তাদের দিকে প্রেরিত হয়েছিল, সেটি ছিল প্রচারণা মিশন। এবং তাতে গোত্র নেতাসহ সকলে ইসলাম গ্রহণ করেছিলপরবর্তীতে যে মুতার যুদ্ধ হয়েছিল, সেটি ছিল রোমান গভর্নর শোরাহ্‌বীলে মুসলিম দূত হত্যার প্রতিশোধ স্বরূপ। এবং তাবূক অভিযান ছিল আগ্রাসী রোম-সম্রাটের বিরুদ্ধে, তার প্রেরিত বিশাল সেনাবাহিনীর হাত থেকেদিনাকে রক্ষা করার জন্য। কিন্তু রোমানরা ভয়ে পিছু হটে যাওয়ায় কোনো যুদ্ধ হয়নি।
 
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তৃতীয় হিজরিতে উহুদ যুদ্ধের প্রাক্‌-মুহূর্তে মুনাফিকরা দলত্যাগ করে মুসলিম সেনাবাহিনীর মনোবল দুর্বল করার চক্রান্ত করেছিলফলে রাসুল (সাঃ) তাদেরকে আর কোনো যুদ্ধে শরিক হবার অনুমতি দেননি। কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনু উবাই ও তার দলের প্রকাশ্যে তওবা ও বারবার অনুরোধ করার কারণে তাদেরকে পঞ্চম হিজরিতে বানুল্‌ মুস়্‌তালিক যুদ্ধে যাবার অনুমতি দেন। কিন্তু তারা আবারও বিশ্বাসঘাতকতা করে। তাই পরবর্তী আর কোনো অভিযানে তাদেরকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। তবে তাবূক অভিযানে তাদের ১২ জন গোপনে ঢুকে পড়ে ও রাসূল (সা)-কে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা করে 
 
মক্কায় ইসলাম ছিল প্রচার পর্বে। আর মদিনায় প্রচারের পাশাপাশি প্রতিরোধ পর্বে। তাই এই পর্বে হারাম (নিষিদ্ধ) মাসে যুদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে। যার সূত্রপাত ঘটেছিল নাখলা যুদ্ধে। এবং এ প্রসঙ্গেই অবতীর্ণ হয়েছে সূরা আল্‌-বাকারাহ্‌র ২১৭ নং আয়াতটি (তারা তোমাকে নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছে; তুমি তাদের বলে দাও, এই নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করা মহা অন্যায়। আর আল্লাহ্‌র পথে বাধা সৃষ্টি করা, আল্লাহ্‌কে অস্বীকার করা, পবিত্র মসজিদের পথে বাধা দেওয়া এবং সেখান থেকে তার অধিবাসীদের বহিষ্কার করা আল্লাহ্‌র নিকট গুরুতর অপরাধ। এবং হত্যা অপেক্ষা ফেতনা-ফাসাদ অধিক গুরুতর পাপ। তারা সক্ষম হলে তোমাদেরকে তোমাদের ধর্ম থেকে বিমুখ না করা পর্যন্ত সর্বদা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকবে)
 
সপ্তম শতাব্দীর ওই ইসলামী বিপ্লবের পর, পৃথিবী অনেক দূর এগিয়েছে। জন্ম নিয়েছে বহু মতবাদ পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার নামে সংঘটিত হয়েছে একাধিক বিধ্বংসী যুদ্ধযার তাণ্ডবলীলায় বলি চড়েছে অসংখ্য প্রাণ ও প্রাণীর। কেবল ১ম বিশ্বযুদ্ধেই (১৯১৪-১৯১৮) প্রাণ হারিয়েছে ৭৩ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ— রাশিয়ায় ১৭ লাখ, জার্মানীতে ১৬ লাখ, ফ্রান্সে ১৩ লাখ ৭০ হাজার, ইতালিতে ৪ লাখ ৬০ হাজার, অষ্ট্রিয়ায় ৮ লাখ, গ্রেট বৃটেনে ৭ লাখ, তুরষ্কে ২ লাখ ৫০ হাজার, বেলজিয়ামে ১ লাখ ২ হাজার, বুলগেরিয়ায় ১ লাখ, রুমানিয়ায় ১ লাখ, সার্বিয়া-মন্টিনিগ্রোতে ১ লাখ, আমেরিকায় ৫০ হাজার; মোট ৭৩ লাখ ৩৮ হাজার। অন্য এক হিসাবে নিহত ৯০ লাখ, আহত ২ কোটি ২০ লাখ এবং নিখোঁজ প্রায় ১ কোটি।
 
আর ২য় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৪১-১৯৪৫) প্রায় ৩ কোটি। একা সোভিয়ে ইউনিয়ন প্রায় ৮৯ লাখ সৈন্য হারিয়েছেহিটলার কর্তৃক জার্মানীতে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে ৬০ লক্ষ ইহুদীর নৃশংস হত্যার ক্ষত আজও দগদগে এ সময় ৬ আগষ্ট, ১৯৪৫-এর সকাল ৮-১৫তে জাপানের হিরোশিমাতে আমেরিকার লিটল বয়’ পরমাণু বোমার তাণ্ডবে নিহত হয় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৬১ জন এবং ১৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ধ্বংসস্তূপের ছাইয়ে পরিণত হয় (হিরোশিমা মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান ১৯৪৯-এর  ২০শে আগষ্ট এক ঘোষণায় বলেন, ৬ আগষ্টের ওই বোমা হামলায় মৃত্যু বরণকারীর সংখ্যা ২ লক্ষ ১০ হাজার থেকে ৪০ হাজারের মধ্যে)তিনদিন পর, ৯ই আগষ্ট বুধবার দ্বিতীয় বোমাটি নিক্ষিপ্ত হয় জাপানের নাগাসাকি শহরে। যার তাণ্ডবলীলায় প্রাণ হারায় প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষ এবং তেজষ্ক্রিয়তার ফলে ক্যান্সারের মত দুরারোগ্য ব্যধিতে আজও মানুষ মরছে সেখানেবহু শিশু পঙ্গু ও প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মাচ্ছে।
 
ভিয়েতনাম যুদ্ধে (১৯৫৫-১৯৭৩) মার্কিন আগ্রাসনের কারণে নিহত হয়েছে ৩৬ লাখ ৭২ হাজার মানুষ,  ১৬ লাখ মানুষ পঙ্গু হয়েছে এবং ৯ লাখ শিশু অনাথ। এই ভিয়েতনাম যুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র এজেক্ট অরেঞ্জস্প্রে করেছিল। যার কারণে বিকলাঙ্গ শিশু জন্মানোর পাশাপাশি ক্যান্সারের মতো বিভিন্ন মারণরোগে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ রোগাক্রান্ত হয়েছে।
 
এছাড়া জন ডেভেনপোর্ট-এ মতে, কেবলমাত্র খ্রিস্টান ধর্মীয় আদালতের নির্দেশে খ্রিস্টান নাগরিকদের নিহতের সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখ। একা স্পেন সরকার ৩ লাখ ৪০ হাজার খ্রিস্টানকে হত্যা করেছে; যার মধ্যে ৩২ হাজারকে জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছে
 
এবং সম্প্রতি ইরাক-ইরান যুদ্ধ (১৯৮০-১৯৮৮) উভয় পক্ষের প্রায় দশ লাখ লোকের প্রাণহানি ঘটেছেএমনকি বর্তমানেও বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, সোমালিয়া, সার্বিয়া, কসোভো, সূদান, শ্রীলংকা, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, মায়ানমার সহ আমাদের কাশ্মীরে নিত্যদিন নানা অজুহাতে অসংখ্য মানুষের রক্ত ঝরছে। তবুও, এই নির্মম বাস্তবতা চোখে দেখেও কিছু মানুষ প্রশ্ন তোলে, কাঠ গোঁড়ায় দাঁড় করায় ইসলাম ও তার অনুসারীদেরকে। আঙুল তোলে নবী-আমলের সামরিক অভিযানগুলির দিকে। তাদের শুভ বোধের উদয় হোক, এই প্রার্থনা করি।

Tuesday, 6 October 2020

رابندرانات طاغور: اليوم الذي تنوّر فيه النيلوفر


اليوم الذي تنوّر فيه النيلوفر
رابندرانات طاغور
ترجمة: عبد المتين وسيم
 
اليوم الذي تنوّر فيه النيلوفـر
           كان قلبي ذاهلا
     فلم ألحظ شيئا ولم آتِ بسلة الأزهار
           فبقيت مهملة دون القطاف
     وأحيانا يستبدّ الحزن بي
     فحالاً أستيقظ من حلمي
     وأجد بأريج عذب غريب
           جاءت به ريح الجنوب.
 
     وذلك الأريج جعل قلبي
           يتوجع في البلاد والدخال
     فكأنّ العالم في استشرافه
           صار مجهودا في جديد الرباع
     ولم أكن أعلم أنه كان لي
     ولا أعلم أنه كان قريبا منّي
           وتلك الأناقة والنعومة يا لحظّي
           قد تفتّحت في أعوار قلبي.  



যেদিন ফুটল কমল কিছুই জানি নাই

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

যেদিন            ফুটল কমল কিছুই জানি নাই
      আমি                ছিলেম অন্যমনে |
আমার            সাজিয়ে সাজি তারে আনি নাই
      সে যে                রইল সংগোপনে |
                   মাঝে মাঝে হিয়া আকুলপ্রায়
                   স্বপন দেখে চমকে উঠে চায়,
                   মন্দ মধুর গন্ধ আসে হায়
      কোথায়               দখিন-সমীরণে |

ওগো              সেই সুগন্ধে ফিরায় উদাসিয়া
                             আমায় দেশে দেশান্তে |
যেন                    সন্ধানে তার উঠে নিঃশ্বাসিয়া
                             ভুবন       নবীন বসন্তে |
                   কে জানিত দূরে তো নেই সে,
                   আমারি গো আমারি সেই যে,
                   এ মাধুরী ফুটেছে হায় রে
          আমার               হৃদয়-উপবনে |

 

শিলাইদহ

২৬ চৈত্র ১৩১৮

গীতিমাল্য ১৭ 


Sunday, 4 October 2020

رابندرانات طاغور: أواه، لا أبقى مخبولا ولا متسوّلا



أواه، لا أبقى مخبولا ولا متسوّلا
رابندرانات طاغور
ترجمة: عبد المتين وسيم
 
أواه، لا أبقى مخبولا
     يحمل نفسه على كتفه
     ولا أبقى متسوّلا
     يستجدي من باب داره
سأضع عند قدمك أعبائي ذا
فأخرج ذاهلا عنها
حتى لا ألقي بنظرة إليها
     ولا أتفوه بكلام عنها؛
أواه، لا أبقى مخبولا
             ولا متسوّلا.
 
ومن لامستْه رغبتي
     وجُنّ باشتهائي
يخمد نوره
     حالا في القنديل
وإنه مدنّس، فلا أتقبّل
            ما أتى به من العطاء
وما يترنم بدون حبّك، مولاي
            لا أتحمّل ذلك الغناء
أواه، لا أبقى مخبولا
             ولا متسوّلا. 



আর আমায় আমি নিজের শিরে বইব না
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

আর         আমায় আমি নিজের শিরে
                             বইব না ।
আর         নিজের দ্বারে কাঙাল হয়ে
                             রইব না ।
এই          বোঝা তোমার পায়ে ফেলে
           বেড়িয়ে পড়ব অবহেলে –
           কোনো খবর রাখব না ওর,
                    কোনো কথাই কইব না ।
               আমায় আমি নিজের শিরে
                             বইব না ।

           বাসনা মোর যারেই পরশ
                             করে সে,
           আলোটি তার নিবিয়ে ফেলে
                             নিমেষে ।
ওর          সেই অশুচি, দুই হাতে তার
           যা এনেছে চাই নে সে আর,
           তোমার প্রেমে বাজবে না যা
                    সে আর আমি সইব না ।
           আমায় আমি নিজের শিরে
                             বইব না ।

 

১৫ আষাঢ় ১৩১৭

গীতাঞ্জলী ১০৫ 

Tuesday, 29 September 2020

আমার প্রভু— লাম্‌ ইয়ালিদ ওয়ালাম্‌ ইউলাদ


আমার প্রভু— লাম্‌ ইয়ালিদ ওয়ালাম্‌ ইউলাদ
 
রাতের অন্ধকারে আকাশের কোলে হাসছে অসংখ্য তারকারাজি। তিনি ভাবলেন এদের আলো আছে, দীপ্তি ছড়িয়ে দেয় চারিদিকে। এই বড় নক্ষত্রটি আমার প্রভু। কিছুক্ষণ পর যখন অস্তমিত হল, বলে উঠলেন, না না, এ আমার রব হতে পারে না। আমার প্রভু অস্তমিত হতে পারে না। একটু পরে দেখা দিল চাঁদ। জ্যোৎস্নায় প্লাবিত হল সব কিছু। মনকে বললেন, এই আমার রব, আমার প্রতিপালক। কিন্তু চাঁদ তাঁর নির্ধারিত সময়ে পৌঁছে ডুব দিল। হারিয়ে গেল দৃষ্টির সীমানা থেকে। সূর্য উঠলো এবার। প্রখর তেজ নিয়ে। আকারেও বড়। না না, এই হল আসল প্রভু। আমার ঈশ্বর। কিন্তু দিনের শেষে যখন অন্ধকারের কাছে হেরে গেল সূর্যের কিরণগুলো। চিৎকার করে উঠলেন, এও আমার প্রভু হতে পারে না। আমার প্রভু চিরঞ্জীবী। কখনো অস্তমিত হতে পারে না। আমার প্রভু যে সব কিছুই সৃষ্টি করেছে। আকাশ, পৃথিবী, নিখিল বিশ্বের সব কিছুই। জীবন ও মরণ যার হাতে। তাঁর এই কথা শুনে বাদশাহ বলল, আমিও তো মানুষকে মৃত্যু দিই এবং জীবন দিই। তারপর বাদশাহ দু’জনকে ডেকে পাঠালএকজনকে ছেড়ে দিল আর অপর জনকে হত্যা করল। ইব্‌রাহিম (আ) বললেন— আচ্ছা, আমার প্রভু তো পূর্ব দিক থেকে সূর্যকে উদিত করেন, আপনি না হয় সূর্যকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করুন। নিরুত্তর হয়ে গেল সেই বাদশাহ।
 
ক’ শতাব্দী বাদে, তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্র ইস্‌মাইলের বংশে, যমযম কূপের শহরে একজন তাঁর মতো করেই ঈশ্বরের ধারণা লালন করলেন মনে ও মননে। সমাজের কাছে তুলে ধরলেন তাঁর চেতনা, তাঁর বিশ্বাসের কথা। একত্ববাদ ও নবিত্বের কথা। সততা ও নিষ্ঠার কথা। সাম্য ও সৌহার্দের কথা। দাস ও মনিব, নারী ও পুরুষ, কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ সবার অধিকারের কথা। গাছপালা, পশুপাখি সবার কথা। তাঁর কাছে একদিন ইহুদী জনগোষ্ঠীর একটি দল এসে প্রশ্ন করলো, আপনি বলেন, আল্লাহ্‌ আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আচ্ছা, আল্লাহ্‌কে কে সৃষ্টি করেছে? তাঁর পিতৃপরিচয় কী? কোথায় তাঁর জন্ম? কিছুক্ষণ নীরব হয়ে বসে থাকলেন নবীজি (সা)তারপর একটি সূরা (আল্‌-কুরানের অধ্যায় ১১২) আল্‌-ইখ্‌লাসের মাধ্যমে তাদের উত্তর দিলেন—
“(হে মুহাম্মদ সা) তুমি (তাদের) বলে দাও, আল্লাহ্‌ এক, অদ্বিতীয়। তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি (লাম্‌ ইয়ালিদ) এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি (ওয়ালাম্‌ ইউলাদ) (অর্থাৎ, না তাঁর পিতামাতা আছে, আর না কোনো সন্তান)আর না কেউ তাঁর সমকক্ষ ও সমতুল্য।
 
আর তাই, আমার ঈশ্বরের না কোনো জন্মতিথি আছে না কোনো জন্মস্থান। আমার মাবূদের না কোনো প্রতিমা আছে, না কোনো ছবি। আর কা’বা ঘর পবিত্রতম স্থান, আমার কিব্‌লা বা ডিরেকশন, আমার ইলাহ্‌ বা উপাস্য নয়। এবং এই কথা সেদিনই স্পষ্ট হয়ে গেছিল, যেদিন এক আফ্রিকান-আবিসিনিয়ান কৃষ্ণকায় দাস কা’বা ঘরের ছাদে চেপে আমার ঈশ্বরের মহিমা গেয়েছিলেন

আব্দুল মাতিন ওয়াসিম  

Sunday, 27 September 2020

উই উইল মিট এগেইন, তবে এখন বাড়িতে জামাআত



উই উইল মিট এগেইন, তবে এখন বাড়িতে জামা'আত  
 
এই অতিমারি শেষ হলে আবার দেখা হবে আমাদের, নিশ্চিত দেখা হবে ইন্‌ শা আল্লাহ্‌! তবে বর্তমানে আমরা যে সংকটময় সময় অতিবাহিত করছি, তা মানব সভ্যতার ইতিহাসে হয়তো সবচেয়ে ভয়ানক ও কঠিন। আর এই কঠিন সময়ের মাঝেই আমাদের দ্বারে এসে উপস্থিত হয়েছে রমযান মাস। অত্যন্ত পবিত্র এবং আত্মশুদ্ধির মাস। এ মাসেই পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হয়। এ মাসেই রয়েছে লায়লাতুল্‌ কাদ্‌র নামক পবিত্র রাত, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।
 
বিশ্বের প্রতিটি মুসলিম অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে এই মাসের। ইবাদতের (উপাসনার) এই মাসে মানুষ আত্মসমালোচনা, আত্মসমীক্ষা এবং বছর জুড়ে নিজ কর্মকাণ্ডের হিসেবনিকেশ করে। নিজের ভুলভ্রান্তি শুধরে নিয়ে আগামীতে আরও ভালো মানুষ হওয়ার ব্রত গ্রহণ করে। ফাজ্‌র (ঊষাকাল) হতে মাগ্‌রিব (সূর্যাস্ত) পর্যন্ত পানাহার হতে বিরত থেকে সহজেই অনুমান করতে পারে অভাবী ও গরীবদুঃখীদের জ্বালা। তাই এ মাসে বেশী বেশী দান-খয়রাত করে, সাদ্‌কা দেয়, যাকাত আদায় করে, প্রতিবেশীর প্রতি সদয় হয়। সহজ করে বললে, উদাসীনতার খোলস ছেড়ে একটু একটু করে সচেতন হয় এবং এক পা-দু’ পা করে শান্তির পথে, সমৃদ্ধির পথে এগোতে থাকে।
 
তবে এবারের রমযান আর পাঁচটা রমযান থেকে অনেকটাই ভিন্ন রকমের। এই অতিমারির কারণে গত চারটে জুম’আ আমরা মসজিদে সালাত আদায় করতে পারিনি। এই রমযানে জুম’আ এবং তারাবিহ্‌র জামা’আতও হয়তো সম্ভব হবে না। তাই যেভাবে এতদিন ধরে পাঁচ-ওয়াক্ত নামায এবং জুম’আর বদলে যোহর বাড়িতে আদায় করে আসছি; একই ভাবে এই রমযানে আমাদেরকে তারাবিহ্‌র নামাযও হয়তো বাড়িতেই পড়তে হবে। সেক্ষেত্রে আমরা যে যার বাড়িতে নিজ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জামা’আত করে তারাবিহ্‌ ও অন্যান্য সালাত আদায় করতে পারি।
 
এই ছবিতে বাড়িতে জামা’আত করার পদ্ধতি অতিসংক্ষেপে দেখানো হয়েছে। তাই এবার হয়তো বাড়িতে জামা’আত করে নিজেরদের দুর্বলতা ও খামতিগুলো শোধরানর চেষ্টা করতে হবে; যতটা পারা যায়। সেই সাথে আমাদের এটাও ভেবে দেখতে হবে যে, এতদিন মসজিদ আমাদের ডাকতো, হাইইয়া ‘আলাস্‌ সালাহ্‌ (এসো সালাতের জন্য), হাইইয়া ‘আলাল্‌ ফালাহ্‌ (এসো সফল হওয়ার জন্য); কিন্তু আমরা অবহেলা করেছি। সাড়া দেয়নি সেই ডাকে। পাত্তা দিইনি দু’হাজার টাকা মাইনে পাওয়া মুয়াজ্জিনের। আর এখন মন কাঁদছে আমাদের মসজিদে যাওয়ার জন্য আমরা উদগ্রীব; বিশেষ করে রমযানে। কিন্তু মুয়াজ্জিন সাহেব এখন আর আমাদেরকে ডাকেন না এখন পাঁচ-ওয়াক্ত আযানে তিনি বলছেন, আস্‌-সালাতু ফি বুইউয়ুতেকুম (নামায বাড়িতেই পড়ুন)তাই যতদিন না এই অতিমারি শেষ হয় বাড়িতেই নামায পড়ুন এবং ধৈর্য ধরুন। সাথে সোশাল ডিস্টেন্সিং ও মেডিকেল নির্দেশিকা মেনে চলুন। বেঁচে থাকলে ‘উই উইল মিট এগেইন’!

 আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
১৭ এপ্রিল ২০২০
বাঁশকুড়ি, দঃ দিনাজপুর 

Thursday, 17 September 2020

মাতৃত্বের জার্নিঃ কোনো সমাপ্তি ও সীমারেখা নেই

 

মাতৃত্বের জার্নিঃ কোনো সমাপ্তি ও সীমারেখা নেই 

মা ব্যাট করছে আর ছেলে বল, ছেলে মা'কে বোল্ড করে দিয়ে উল্লসিত। মা'ও ছেলের সাফল্যে বাঁধন হারা। কোচ আসেনি দেখে ব্যাট হাতে ছেলেকে বোলিং প্র‍্যাক্টিস করানো, আউট হয়ে আনন্দ করা সবটাতেই উপচে পড়ছে মাতৃত্ব। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, এই দৃশ্যও কারো কারো চোখে ইসলামোফবিক। কারো চোখে, এত কিছুর মাঝে শুধু মায়ের পোষাকই ধরা পড়ল। ছবিটা ওপার বাংলার। তাই, ওপারের এক ক্রিকেটারের মায়ের কথা শুনুন! 

ক্রিকেটার শাহরিয়ার নাফীসের মা বলছি--  
"গত পরশু ফেসবুকে মা ও ছেলের ক্রিকেট অনুশীলনের একটা ছবি দেখলাম। কেউ একজন ছবিগুলো পোস্ট করেছেন।গত দু'দিন যাবৎ সেই ছবি নিয়ে ফেসবুকে তুমুল আলোচনা, সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। পল্টন ময়দানে মা ঝর্ণা আকতার তার এগার বছরের ছেলে ইয়ামিন সিনান কে নিয়ে এসেছিলেন। তখন সময় সকাল আটটা কী নয়টা।মাঠে জন সমাগম ছিলনা বললেই চলে ।কোচ আসতে দেরি হচ্ছিল।তাই মা ব্যাট হাতে নিয়ে ছেলেকে বোলিং প্রাকটিস করাচ্ছিলেন। আমি বলবো ছেলের আবদার রক্ষা করছিলেন।কিংবা ছেলেকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। সেই মায়ের পোষাক নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হচ্ছে। আমি মায়ের পোষাক নিয়ে কিছু বলতে  আসিনি।

এই ছবি দেখে আমার চোখে পানি এসে গেছে। এই ছবি আমাকে বারবার একটি কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে , সেটা হলো 'মাতৃত্ব '।মাতৃত্ব এমন একটা জার্নি যার শুরু আছে শেষ নেই।

এই মা সকাল বেলা সংসারের কাজ ফেলে, নানা ব্যস্ততার মধ্যেও ছেলেকে নিয়ে মাঠে হাযির হয়েছেন। হয়তো তার আরো একটি ছোট সন্তান আছে। সেই সন্তানটিকে কারো কাছে রেখে এসেছেন। এই মাকে দেখে আমার নিজের অতীতের কথা মনে পড়ে গেছে। আমিও আমার বড় সন্তান শাহরিয়ার নাফীসের বয়স যখন দশ বছর তখন তাকে নিয়ে মাঠে যাওয়া শুরু করেছিলাম। রোদ, বৃষ্টি,  ঝড় কোন কিছুকেই তোয়াক্কা করিনি। আমি মনে করেছি নাফীস ওর পছন্দের পথে চলতে চায়। আর সেই পথের কাঁটা গুলো সরিয়ে দেয়ার দায়িত্ব আমার।   

ফেসবুকে ঝর্ণা আকতার-এর পোষাক নিয়ে নানা রকমের কথা উঠেছে। আমি মনে করি তার পোষাক নিয়ে আলোচনা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। আমাদের নবীদের স্ত্রীরা পর্দার ভিতরে থেকে ময়দানে যুদ্ধও করেছেন। ইয়ামিন এর মায়ের পোষাক নিয়ে তাহলে কেন এত কথা ? উনি কী এমন অন্যায় করেছেন ? বরং সন্তানের প্রতি কাতর একজন মা, বিভোর একজন মা তাঁর দায়িত্ব পালন করছিলেন। পৃথিবী তে এমন কোন বান্ধব কেউ নেই যে মা'কে হার মানায়। এমন কোন আলো নেই যে মা'কে নিভিয়ে দেয়। এমন কোন ভালবাসা নেই যে তাকে পরাজিত করে।"

আসুন আমরা এই ছবিতে তার পোষাক নিয়ে সমালোচনা না করে একজন মা'কেই দেখি। প্রিয় সন্তানের জন্য মায়ের আত্মত্যাগটাকেই দেখি। আর মায়েদের এই ত্যাগ, এই কুরবানির কারণেই নবী (সাঃ) এক ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, তোমার উত্তম সাহচর্য, ভালোবাসা ও নম্র ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি অধিকার রাখেন তোমার মা। লোকটি আবারও একই প্রশ্ন করে। উত্তরে নবীজি বলেন, তোমার মা। তৃতীয় বার লোকটি ওই একই প্রশ্ন করে, আমার উত্তম আচরণের সবেচেয় বেশি অধিকারী কে? এবারও নবীজি বলেন, তোমার মা। চতুর্থ বার একই প্রশ্ন করলে, নবীজি বলেন, এবার তোমার বাবা। তারপরে অন্যান্য নিকটবর্তী লোকেরা।   

আর যুগ যুগ ধরে সন্তানের জন্য মায়েদের এমন আত্মত্যাগ ও কুরবানির ধারা চলে আসছে বলেই ইসলাম স্পষ্ট কণ্ঠে জানিয়েছে--
   "মায়ের পায়ের নীচে বেহেশত।"    

আব্দুল মাতিন ওয়াসিম 

Friday, 4 September 2020

নিযার কাব্বানিঃ জেরুজালেম


জেরুজ়ালেম
নিযার ক়াব্বানি, সিরিয়া
অনুবাদ- আব্দুল মাতিন ওয়াসিম  
 
জেরুজ়ালেম, তুমি নবীদের সৌরভে ভরা নগরী
স্বর্গ ও পৃথিবীর মাঝে সংক্ষিপ্ত সেতুবন্ধন  
তোমার জন্য আমি কেঁদে চলেছি অবিরাম  
যতক্ষণ না শুকিয়ে যায় আমার চোখের জল  
যতক্ষণ না প্রদীপ নেভে প্রার্থনা করেছি 
রুকু’ করেছি যতক্ষণ না ক্লান্ত হয়ে পড়ি;   
আর জানতে চেয়েছি, তোমার বুকে
মুহাম্মদ (সা) ও যীশুর (আ) অবস্থান।
 
জেরুজ়ালেম, তুমি নানা ধর্মের মধ্যমণি
তুমি অগণন মিনারের নগরী
তুমি আঙুল-পোড়া এক অপরূপ কিশোরী
তুমি কুমারীর শহর, তোমার চোখ দু’টো আজ বিমর্ষ
তুমি শীতল-সুনিবিড় ছায়ায় ভরা এক মরুদ্যান
তোমার যে পথ ধ’রে হেঁটে ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী
আজ সে-পথের পাথরগুলোও কেমন বিষাদময়
তোমার মসজিদের মিনারগুলোও আজ অবসাদে ডুবে
জেরুজ়ালেম, তুমি আজ আঁধারে ঘেরা
তোমার পবিত্র কানীসাতুল্‌ ক়িয়ামাহ্‌ গির্জায়
এবার কে বাজাবে ঘন্টা, রোববারের সকালে?  
বড়দিনের রাতে শিশুদের হাতে
কে তুলে দেবে খেলনা?
 
জেরুজ়ালেম, তুমি বিষাদের নগরী
তোমার চোখের কোণে ইদানীং
ডগমগ করছে এক বিশাল অশ্রুবিন্দু   
কে প্রতিহত করবে শত্রুদের?
তোমাকেই করতে হবে, হে ধর্মসমূহের মধ্যমণি
পাথরের গায়ে লেগে থাকা এই ছাপ ছাপ রক্ত
তুমি ছাড়া আর কে ধোবে বলো? 
কে রক্ষা করবে বাইবেল?
কে রক্ষা করবে কোরআন?
কে বাঁচাবে যীশুকে, যীশুর হত্যাকারীদের থেকে?  
কে রক্ষা করবে মানুষকে, মানবসভ্যতাকে?
 
জেরুজ়ালেম, আমার প্রাণের শহর
আমার ভালোবাসার নগর, আগামীকাল
হ্যাঁ আগামীকাল তোমার লেবু গাছগুলোতে ফুল ফুটবে
আনন্দে নেচে উঠবে তোমার ক্ষেতে সবুজ শিষগুলো
এবং নেচে উঠবে বাগানে জ়ায়তুনের ডালপালা
হেসে উঠবে তোমার বিমর্ষ চোখ দু’টো
আর ফিরে আসবে অভিবাসী পায়রাগুলো
তোমার পবিত্র গৃহ-চূড়ায়
শিশুরা ফিরে যাবে খেলার মাঠে
মা-বাবা ও সন্তানেরা মিলিত হবে একসাথে
তোমার মুক্ত রাজপথে
জেরুজ়ালেম, আমার প্রাণের শহর
জ়ায়তুন ও শান্তির শহর, ভালোবাসার শহর!

 

[নিযার ক়াব্বানি সিরিয়ার জাতীয় কবি ও কূটনীতিক। জন্ম দামেস্কের এক বণিক পরিবারে ১৯২৩-এর ২১শে মার্চ। তবে বিখ্যাত নাট্যকার পিতামহ আবু খ়ালীল আল্‌-ক়াব্বানির প্রভাবে ছোট বেলাতেই কাব্যচর্চার শুরুবিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অবস্থায় ১৯৪৪ সালে প্রকাশ করেন প্রথম কাব্যগ্রন্থ “ক়ালাত্‌ লি সাম্‌রাউ” (শ্যামা আমায় বলেছিল)নারী দেহের বর্ণনায় পরিপূর্ণ এই গ্রন্থটি সে সময় রক্ষণশীল সিরিয়ায় প্রচন্ড আলোড়ন সৃষ্টি করে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি নারী-স্বাধীনতা, প্রেম, যৌনতা এবং রাজনীতি ছিল তাঁর লেখার মূল উপজীব্য। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বাঁধা ডিঙিয়ে নারী মুক্তির পক্ষে সোচ্চার হন তিনি ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত “ত়ুফ়ূলাতু নাহ্‌দ” (স্তনের শৈশব) কাব্যগ্রন্থটি তাঁর খ্যাতি আরো বাড়িয়ে দেয়। তাঁর বহু কবিতা সঙ্গীত হিসেবে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে সিরিয়া, লেবানন সহ অন্যান্য আরব দেশগুলোতে। আরবদের অসচেতন ও হেয়ালীপূর্ণ জীবনধারার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল সুস্পষ্টআর তাই নিজের কিছু রচনায় নিজ জাতি ও সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। প্রতিক্রিয়া স্বরূপ সরকারের রোষানলে পড়তে হয়ে তাঁকে। ১৯৬৬ সালে চাকরি থেকে অবসর নিয়ে নিজেকে নিয়োজিত করেন কাব্যচর্চার পাশাপাশি প্রকাশনা ব্যবসায়। ১৯৮১ সালে এক বোমা হামলায় দ্বিতীয় স্ত্রী বিলকিস নিহত হবার পরে চলে যান প্যারিস, জেনেভা ও পরে লন্ডনে। জীবনের শেষ ১৫টি বছর লন্ডনেই অতিবাহিত করেন এবং সেখানেই ১৯৯৮-র ৩০শে এপ্রিল মৃত্যু হয়। তবে তাঁর অসিয়ত অনুযায়ী চার দিন পর দামেস্কের বাবুস্‌ সাগীর কবরস্থানে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। ৭৫ বছরের এই দীর্ঘ জীবনে তিনি রচনা করেছেন ৩৫টি কাব্যগ্রন্থ সহ পঞ্চাশটিরও বেশি গ্রন্থ। ত়ুফ়ূলাতু নাহ্‌দ (স্তনের শৈশব, ১৯৪৮), সাম্বা (১৯৪৯), ক়াস়ায়িদুন্‌ মুতাওয়াহ়্‌হ়িশাহ্‌ (বন্য কবিতা, ১৯৭০), মিয়াতু রিসালাতি হ়ুব্বিন্‌ (১০০টি প্রেমপত্র, ১৯৭০), ক়ামূসুল্‌ আশেক়ীন (প্রেমিকের অভিধান, ১৯৮১) তাঁর উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিকর্ম]

 

 

القدس

نزار قباني

 

بكيت.. حتى انتهت الدموع
صليت.. حتى ذابت الشموع
ركعت.. حتى ملّني الركوع
سألت عن محمد،

فيكِ وعن يسوع
يا قُدسُ، يا مدينة تفوح أنبياء
يا أقصر الدروبِ بين الأرضِ والسماء

* * *

يا قدسُ، يا منارةَ الشرائع
يا طفلةً جميلةً محروقةَ الأصابع
حزينةٌ عيناكِ، يا مدينةَ البتول
يا واحةً ظليلةً مرَّ بها الرسول
حزينةٌ حجارةُ الشوارع
حزينةٌ مآذنُ الجوامع
يا قُدس، يا جميلةً تلتفُّ بالسواد
من يقرعُ الأجراسَ في كنيسةِ القيامة؟
صبيحةَ الآحاد..
من يحملُ الألعابَ للأولاد؟
في ليلةِ الميلاد..

* * *

يا قدسُ، يا مدينةَ الأحزان
يا دمعةً كبيرةً تجولُ في الأجفان
من يوقفُ العدوان؟
عليكِ، يا لؤلؤةَ الأديان
من يغسل الدماءَ عن حجارةِ الجدران؟
من ينقذُ الإنجيل؟
من ينقذُ القرآن؟
من ينقذُ المسيحَ ممن قتلوا المسيح؟
من ينقذُ الإنسان؟

* * *

يا قدسُ.. يا مدينتي

يا قدسُ.. يا حبيبتي
غداً.. غداً.. سيزهر الليمون
وتفرحُ السنابلُ الخضراءُ والزيتون
وتضحكُ العيون..
وترجعُ الحمائمُ المهاجرة..
إلى السقوفِ الطاهرة
ويرجعُ الأطفالُ يلعبون
ويلتقي الآباءُ والبنون
على رباك الزاهرة..
يا بلدي..
يا بلد السلام والزيتون