অগ্রহায়ণের দিন সবে পড়েছে। শীত তখনও পুরোপুরি নামেনি। কাকভোরে উঠে মেজো আব্বা, আব্বা, আমি, সুলতান দা ও আমরুল—আমরা বেরিয়ে
পড়লাম মানপারের উদ্দেশ্যে। খানিকটা পথ যেতেই টের পেলাম, ভোরের বাতাসে লেপটে আছে শীতের আগমনী বার্তা। মাঠে ঘাসের ডগায় দু-এক ফোঁটা শিশির বিন্দু। কুয়াশার পাতলা পর্দা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে আর সকালের মিঠে রোদ আস্তে আস্তে মাটির গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম মানপারে, আমাদের ভিটে জমিগুলোতে। বেগুন ও লঙ্কার চারা রোপণের সময় ঘনিয়ে এসেছে। তার আগে জমিগুলোকে ভালো করে চষে তৈরি করতে হবে। আগাছা পরিষ্কার করতে হবে, জমির বুক নরম করতে হবে, তাকে চারা রোপণের উপয্যক্ত করে
তুলতে হবে।
মেজো আব্বা হাল বাইতে
আরম্ভ করলেন। আমি তাঁর কাছাকাছি
একটা আলের উপর বসে পড়লাম। তখন আমি খুব ছোট; হালচাষের কৌশল, মাটির অর্থনীতির,
ফসলের সঙ্গে পরিবারের ভবিষ্যতের কী সম্পর্ক কিছুই জানতাম না। মাঠ মানেই আমার কাছে বিশাল এক খেলার জায়গা। হাল একটা মজার জিনিস। আর গরু দু’টো যেন আমার খেলায় অংশ নেওয়া দু’টো বড় প্রাণী।
মেজো আব্বা হাল বাইতে বাইতে আমাকে জ্বিন-পরীদের গল্প শোনাচ্ছিলেন। আমি
অবাক হয়ে শুনছিলাম। শুনতে শুনতে কখনও মাটির ঢেলা
এধারওধার ছুঁড়ছিলাম, কখনও গরুগুলোর এক
ছন্দে হেঁটে যাওয়া দেখছিলাম, আবার কখনো কথার ফাঁকে ফাঁকে মেজোআব্বাকে এটা-ওটা জিজ্ঞেস করছিলাম। বেলা একটু গড়াতেই কাজের লোকটা লাহারি নিয়ে হাজির হলো। মেজো আব্বা হাল থামিয়ে বললেন,
— “চলো, খিদে পেয়েছে, আগে খাওয়াদাওয়া করে নিই, তারপর না হয় অন্য কাজগুলো হবে।”
আমরা বসে পড়লাম। খেতে খেতে হঠাৎ
মেজো আব্বা আমাকে বললেন,
— “মাতিন, তুমি গিয়ে একবার
হালটা ধরো তো বাবা।”
আমি যেন খুব বড় কোনো দায়িত্ব পেয়ে গেলাম। কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছিলো না,
— “আমি ধরবো, আব্বা?!”
— “হ্যাঁ, ধরো। শিখবে না? কী করে খাবে ভবিষ্যতে”
আমি দু’ হাতে হালের মুঠিয়াটা ধরে দাঁড়ালাম। তারপর যা হওয়ার তা-ই হলো। দু’ কদম এগোতেই, মুঠিয়াটা বেঁকে গেলো, লাঙল একদিকে কাত হয়ে পড়ল, গরু দু’টোও নিজের মতো করে এগোতে লাগলো। মেজো আব্বা হেসে বললেন,
— “আরে,
এভাবে নয়!”
আমি আরও শক্ত করে ধরলাম।
— “আরে, থামো থামো!”
তিনি খেতে-খেতে উঠে আসলেন। আমার হাত ধরে ধীরে ধীরে
বুঝিয়ে দিলেন।
— “মুঠিয়াটা এভাবে ধরবে। আস্তে আস্তে হাঁটবে। লাঙলের মাথাটা সোজা রাখবে। হড়বড় করবে না, গরু দুটোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটবে।”
তখন বুঝিনি,
তাঁর সেই কথার মধ্যেও যে জীবনের একটা শিক্ষা লুকিয়ে ছিল—সবকিছুকে নিজের ইচ্ছেমতো টেনে নেওয়া যায় না; কিছু জিনিসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন,
— “চলে এসো, এবার নাস্তা করো।”
সবাই একসাথে বসে নাস্তা করতে লাগলাম।
আমি খাচ্ছি। মেজো আব্বাও খাচ্ছেন। দূরে গরুগুলো দাঁড়িয়ে
আছে। সকালের রোদ একটু একটু করে তেজী হচ্ছে। হঠাৎ মেজো আব্বা দূরের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “ওই গ্রামটা দেখতে পাচ্ছো, বাবু?”
আমি মুখ তুলে তাকালাম। দূরে একটা গ্রাম। খুব দূরে নয়।
আমাদের চোখের নাগালের মধ্যেই। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, কয়েকটা বাড়ির টিনের ছাউনি রোদের আলোয়
চকচক করছে। লিকলিকে নারকেল গাছগুলো সকালের হালকা বাতাসে মাথা
দুলাচ্ছে। তালগাছ ও আমগাছের মাথাও আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে। মেজো আব্বা আঙুল তুলে বললেন,
— “ওই যে, ওই টিনের দোতলা
বাড়িটা দেখতে পাচ্ছো?”
আমি চোখ ছোট করে তাকালাম।
— “ওইটা?”
— “হ্যাঁ, ওইটা।”
তারপর তিনি কাঁচা লংকায় একটা কামড় দিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই বললেন,
— “ওটা তোমার নানুদের বাড়ি।”
আমি খাওয়া থামিয়ে দিলাম।
— “আমার নানুদের বাড়ি?”
— “হ্যাঁ।”
আমি আবার তাকালাম। কিন্তু আমার
ছোট্ট মাথায় তখন একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে। নানুদের বাড়ি যদি এত কাছে হয়, তাহলে নানুদের এই বাড়ি আমার
যাওয়া হয় না কেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— “মেজো আব্বা, আপনি নানুদের বাড়ি যান?”
— “যাই।”
— “তাহলে আমি যাই না কেন?”
মেজো আব্বা একটু হেসে বললেন,
— “ওটা তো আর আমাদের দেশ নয়।”
আমি অবাক হয়ে গেলাম।
— “দেশ নয়?!”
— “ওটা বাংলাদেশ।”
বাংলাদেশ।
শব্দটা আমার পূর্বপরিচিত। কিন্তু সেদিন
শব্দটা যেন নতুন অর্থ নিয়ে আমার সামনে হাজির হল। আমি দূরের বাড়িটার দিকে তাকিয়ে ভাবলাম—এটা তাহলে বাংলাদেশ?
কিন্তু দেখতে তো আমাদের গ্রামের মতোই! ওখানেও বাড়ি আছে। গাছ আছে।
পুকুর আছে। পাখি আছে। তাহলে আলাদা কী? আমি আবার প্রশ্ন করলাম,
— “মেজো আব্বা, ওখানে কি মানুষ থাকে?”
তিনি হেসে বললেন,
— “থাকে তো! কেন তোমার নানুভাই, নানীমা, তোমার মামারা থাকেন!”
— “আমাদের মতো করে?”
— “হ্যাঁ, আমাদের মতোই।”
আমি আরও অবাক হলাম। আমার শিশুমনে তখন দেশ বলতে নিজের পরিচিত গণ্ডির বাইরে আর
কিছু ছিল না। আমার কাছে পৃথিবীটা ছিল খুব ছোট—বাড়ি,
উঠোন, পাশের বাড়ি, খেলার মাঠ, পুকুর, পাড়ার
স্কুল, এলাকার মক্তব, বাজার,
আর পরিচিত কিছু মানুষের মুখ। তার বাইরে পৃথিবী কেমন, কোথায় শেষ হয়, আমি জানতাম না। তাই দূরের ওই
গ্রামটাকে দেখে আমার মনে হচ্ছিল—এত কাছে
থেকেও কী করে অন্য দেশ হয়? আমি মেজো আব্বাকে জিজ্ঞেস করলাম,
— “আব্বা, সেখানে যাবো কীভাবে?”
— “ওখানে যেতে কাগজ লাগে।”
— “কী কাগজ, আব্বা?”
— “পাসপোর্ট।”
পাসপোর্ট শব্দটা
শুনে একটু থমকালাম। আমার অভিধানে এক নতুন শব্দ এলো। এ
নিশ্চয়ই কোনো অদ্ভুত জিনিস।
— “আপনার পাসপোর্ট আছে, আব্বা?”
— “আছে।”
— “তাহলে আপনি গেলে আমাকে নিয়ে যাবেন?”
মেজো আব্বা একটু হাসলেন। বললেন,
—“একদিন নিয়ে যাবো।”
তাঁর জবাবের প্রতি আমার তেমন ভ্রুক্ষেপ ছিল না। আমি তখন ভাবছিলাম—নানুদের বাড়ি যেতে হলে কাগজ লাগে! নানুদের বাড়ি মানে নানুদের বাড়িই। সেখানে দেশ কোথা থেকে
এলো?
আমি দূরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বাড়িটাকে যেন আরও কাছে দেখতে
পেলাম।
টিনের ছাউনি। নারকেল গাছ। তালগাছ। আমগাছ।
সবই তো আমাদের মতো!
মনে মনে ভাবতে লাগলাম,
নানুভাই এখন কোথায়, বাড়ির উঠোনে নাকি অন্য কোথাও? নানিমা কি এখন হেঁসেলে, রান্নাবান্না করছেন?
আচ্ছা আমি যদি খুব জোরে ডাক দিই—“নানু, নানু!” বলে, শব্দটা কি
পৌঁছাবে ওপারে…
মেজো আব্বার ডাকে সম্বিত ফিরে পেলাম, আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
— “কী হল বাবু, খাও।”
আমি আবার খেতে শুরু করলাম। ঠিক তখনই কোথা থেকে দু’টো শালিক উড়ে এলো। এসে লাঙলের মুঠিয়াটার উপর বসল। তাদের কিচিরমিচির ডাকে গরুগুলো নড়েচড়ে উঠতেই লাঙলটা দুলে উঠল। মেজো আব্বা বললেন,
— “বাবু, এই পাখি দু’টোকে তাড়াও। নাহলে গরুগুলো বেশি নড়াচড়া করলে জোয়াল ফসকে লাঙলটা পড়ে যাবে।”
আমি মাটির একটা ছোট্ট ঢেলা তুলে বাঁ হাতে শালিক দু’টোর দিকে ছুঁড়ে মারলাম। শালিক দু’টো ভয় পেয়ে উড়ে গেল। আমি রুটি চিবোতে চিবোতে তাকিয়ে রইলাম। পাখি দু’টো প্রথমে আমাদের জমির উপর দিয়ে উড়াল দিল। তারপর পাশের ছোট্ট নালাটার উপর দিয়ে সোজা চলে গেল সেই গ্রামটার দিকে—যে গ্রামে আমার
আরেক নানুর বাড়ি; তাদের কাছে কিন্তু ওই জরুরী কাগজটা ছিল না, তবুও। আসলে মানুষের আঁকা সীমারেখা পাখিরা যে পড়তে
পারে না। মানচিত্রের ভাগবণ্টন তারা তো বোঝে
না। তাদের মানচিত্র হল প্রকৃতি। আর পুরো আকাশটাই তাদের দেশ।
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা

No comments:
Post a Comment