Pages

Friday, 28 August 2026

মেঘু - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 


এই পা-পড় নেবেন নাকি পা-পড়, এই কা-কড়ি আছে, ঝু-রি ভাজা আছে”— বিকেল নামলেই দরোজার বাইরে গলির মোড়ে ভেসে উঠত এই ডাক। আর ই ডাকের জন্যই যেন আমাদের বিকেলগুলো অপেক্ষা করে থাকত। স্কুল থেকে ফিরে জামাকাপড় বদলেছি কি না, খেয়েছি কি না, পড়তে বসেছি কি না এসবের চেয়েও বড় হয়ে উঠত একটা বিষয়কখন মেঘু আসবে, কখন মেঘুর হাঁক শোনা যাবে? কানটা তখন অজান্তেই দরোজার দিকে লেগে থাকত। দূর থেকে কোনো ফেরিওয়ালার আওয়াজ ভেসে এলেই বুকের ভেতর কেমন একটা ধক করে উঠতএই বুঝি মেঘু আসলো! এই বুঝি সে ডেকে উঠলো!  

 

মেঘুর হাঁক শোনা মাত্রই আমাদের আর তর সইত না। এক কৌটা চাল হাতে নিয়ে ছুটতাম দরোজার দিকে। ওই এক কৌটা চালই ছিল আমাদের শৈশবের মুদ্রা। বিনিময়ে পেতাম দুটো পাঁপড়, কিংবা কয়েকটা কাঁকড়ি, অথবা একমুঠো ঝুরি ভাজা। কখনো আবার দুটো দিলখোশযাকে অনেক জায়গায় চোঙা বলা হয়তারপর সেগুলো নিয়ে আমরা বসতাম মহা আনন্দে, কখনো পুকুর পাড়ে, কখনো কোনো বেঁটে পাঁচিলের উপর, আবার কখনো মাঠের ধারেখুব ধীরে ধীরে, তারিয়ে তারিয়ে খেতাম। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামী খাবার আমাদের হাতের মুঠোয়।

 

তুলাইয়ের তল্লাটে আমরা যারা শৈশব কাটিয়েছি, আমাদের কাছে মেঘু শুধু একজন ফেরিওয়ালা নয়; মেঘু যেন আমাদের শৈশবেরই একটি চরিত্র। আজও অলস দুপুরে, কিংবা অবসরের কোনো নির্জন বিকেলে, হঠাৎ নামটি মনে পড়ে গেলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই কাঁচা রাস্তা, ধুলোমাখা উঠোন, দরোজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি শিশু আর দূর থেকে ভেসে আসা সেই টানটান ডাক—“পা-পড়কা-কড়িঝু-রি ভাজা…”

 

মেঘু থাকত আমাদের পার্শ্ববর্তী গ্রাম আঁচরলে। লোকমুখে শুনেছিলাম, তার আসল বাড়ি নাকি উড়িষ্যায়। কীভাবে, কোন অজ্ঞাত টানে সে আমাদের এলাকায় এসে হাজির হয়েছিল, তার কোনো ইতিহাস আমরা জানতাম না। জানার বয়সও ছিল না। শুধু জানতাম, মেঘু আছে, বিকেল হলে আসে, আর তার সঙ্গে আসে আমাদের আনন্দ। এখানেই সে ঘর বেঁধেছিল, এখানেই সংসার গড়েছিল। দুমুঠো ভাতের জন্য, জীবনের নিতান্ত প্রয়োজনের তাগিদে সে বিকেলবেলা পাঁপড়, কাঁকড়ি, ঝুরি ভাজা, দিলখোশএসব নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরত। আর আমরা ছিলাম তার অপেক্ষারত খরিদ্দার  

 

তবে সেই এক কৌটা চাল জোগাড় করাও আমাদের কাছে কম বড় অভিযান ছিল না। কখনো মায়ের কাছে আবদার করে, কখনো একটু কান্নাকাটি করে বা মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে, কখনো মাকে নানা যুক্তি বুঝিয়ে, আবার কখনো একেবারে মায়ের চোখ এড়িয়ে চালের কৌটা নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম। তখন এক কৌটা চালের মূল্য আমাদের কাছে এক আকাশ আনন্দের সমান।

 

শুধু ঘরের চালেই আমাদের শৈশবের বাজার চলত না। ধানের মরসুম এলে আমরা নিজেরাই হয়ে উঠতাম ছোটখাটো সংগ্রাহক। মাঠে পড়ে থাকা ধানের শীষ কুড়িয়ে জমাতাম। ইঁদুরের গর্ত খুঁড়ে ধানের শীষ বের করতাম। ধান বোঝাই গরুর গাড়ির পেছন পেছন ছুটে, গাড়ি থেকে পড়ে যাওয়া শীষ কুড়িয়ে নিতাম। ধানের ক্ষেত কিংবা ধানের পোনের চারপাশে ঝাঁটা দিয়ে, পড়ে থাকা ধান সংগ্রহ করতাম। সেই সামান্য ধানই তখন আমাদের কাছে ছিল সম্পদ। আর সেই সম্পদ দিয়ে কত কী কেনা হতো!

 

মেঘু কিংবা অন্য ফেরিওয়ালারা যখন বাদাম-মটকা নিয়ে আসত, তখন আমাদের জমানো ধান হয়ে উঠত বিনিময়ের মাধ্যম। একশো-দুশো গ্রাম বাদাম-মটকা হাতে পেয়ে আমরা যেন রাজ্য জয় করে ফেলতাম। তারপর পাড়ার অলিগলি চষে বেড়াতাম বাদাম খেতে খেতে। শুধু খাওয়াই নয়অন্যরা দেখছে কি না, সেটাও ছিল আনন্দের একটা অংশ। নিজের হাতে অর্জিত বাদাম, তাই তার স্বাদও যেন একটু বেশি।

 

আর গ্রীষ্মের সেই দগ্ধ বিকেল! মনে হতো, সূর্য যেন আকাশ থেকে আগুন ঢেলে দিচ্ছে। সেই সময় গ্রামে বরফওয়ালা এলে আমাদের মধ্যে হুলস্থুল পড়ে যেতএক কৌটা চালের বিনিময়ে পাওয়া যেত সাদা কিংবা হলুদ রঙের বরফ। বরফ হাতে নিয়ে আমরা ছুটতাম মাঠের দিকে। এক হাতে বরফ, আর অন্য হাতে ঢিলেঢালা প্যান্টের কোমর ধরেকী অদ্ভুত আনন্দে যে ছুটতাম!

 

তবে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ছিল নারকেলকুচি দেওয়া সেই বিশেষ বরফ। তার দাম ছিল একটু বেশিদু কৌটা চালতাই ইচ্ছে থাকলেও সব সময় সেই বরফ খাওয়ার সৌভাগ্য হতো না। কিন্তু যেদিন মাকে ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে দু কৌটা চাল জোগাড় হয়ে যেত, আর সেই বরফটা সত্যিই হাতে এসে পৌঁছত, সেদিনের আনন্দের কোনো হিসাব ছিল না। মনে হতো, আমরা যেন আকাশে উড়ছি। হাতে যেন বরফ নয়সোনার বাটি বা নিজামের কোহিনূর! পৃথিবীতে এর চেয়ে মূল্যবান বুঝি আর কিছু নেই। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বরফ গলে যেত, নারকেলকুচি শেষ হয়ে যেত, হাত বেয়ে ঠান্ডা জল গড়িয়ে পড়ত, জামাকাপড় ভিজে যেত; কিন্তু সেই আনন্দটা গলে যেত না।

 

আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে বুঝি, তখন আমাদের কাছে সম্পদ ছিল খুব সামান্য, কিন্তু আনন্দ ছিল অঢেল। এক কৌটা চাল, দুটো পাঁপড়, একমুঠো ঝুরি ভাজা, একশো গ্রাম বাদাম-মটকা কিংবা একখানা বরফএই সামান্য জিনিসগুলোই আমাদের পৃথিবীকে পরিপূর্ণ করে রাখত।

 

আজ বাজারে কত রকমের খাবার, কত রকমের আয়োজন, কত দামি জিনিসপত্র আমাদের নাগালের মধ্যে। অথচ সেই স্বাদ আর নেই। কারণ খাবারটা তখন শুধু খাবার ছিল না; তার সঙ্গে মিশে থাকত অপেক্ষা, পরিশ্রম, লুকিয়ে চাল জোগাড় করার দুষ্টুমি, মাঠে ধানের শীষ কুড়ানোর উত্তেজনা, বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে খাওয়ার আনন্দ; আর সবচেয়ে বড় কথাএকসঙ্গে ছোট হয়ে থাকার সুখ।

 

তুলাই দিয়ে বহু জল গড়িয়েছে। সময়ের স্রোতে মেঘু কোথায় যেন হারিয়ে গেছেসেই বরফওয়ালা আর আসে না। ধান বোঝাই গরুর গাড়ির পেছন পেছন হেঁটে শীষ কুড়োনো সেই শিশুরাও আজ ছড়িয়ে গেছে জীবনের নানা প্রান্তে। তুলাইয়ের সেই পথ, আঁচরলের সেই মানুষ, বিকেলের সেই হাঁকসবই যেন সময়ের ওপারে চলে গেছে। আজও কখনো কখনো কোনো নিস্তব্ধ বিকেলে মনে হয়, খুব দূর থেকে আবার সেই ডাকটা ভেসে আসছেএই পা-পড় নেবেন পা-পড়! কা-কড়ি আছেঝু-রি ভাজা আছে…” আর তখন বয়স, ব্যস্ততা, দায়িত্ব সবকিছু পেছনে পড়ে যায়। মনে হয়, আমি আবার সেই ছোট্ট ছেলেটি হয়ে গেছি; হাতে এক কৌটা চাল, চোখে অগাধ বিস্ময়, আর বুকভরা অপেক্ষা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি বাড়ির বারান্দায়এই বুঝি মেঘু এলো!

 

২৬ আগস্ট ২০২৬

হেস্টিংস, কোলকাতা

No comments:

Post a Comment