সূরাতু আল-হুজুরাত পবিত্র কুরআনের ৪৯তম সূরা। এটি
মদিনায় অবতীর্ণ হয়েছে। এই সূরার মাধ্যমে মহান আল্লাহ তা‘আলা মানবজাতিকে
আত্মশুদ্ধি, শালীনতা, ভদ্রতা ও
শিষ্টাচারের এক পূর্ণাঙ্গ দিশা প্রদান করেছেন। বিশেষ করে সামাজিক জীবন, পারস্পরিক
সম্পর্ক ও আচরণবিধি সম্পর্কে এই সূরায় অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ নির্দেশনা
রয়েছে।
সূরার প্রথম পাঁচটি আয়াতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল
(সা.)-এর প্রতি প্রদর্শনীয় আদব-কায়দা ও শিষ্টাচারের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এখানে
সরাসরি নবীজি (সা.)-কে কেন্দ্র করে আচরণবিধি শেখানো হয়েছে—যেমন তাঁর
উপস্থিতিতে অগ্রসর হয়ে কথা না বলা, তাঁর সামনে উচ্চস্বরে কথা না বলা, কিংবা অভদ্র
ভঙ্গিতে তাঁকে সম্বোধন না করা। তবে এই নির্দেশনাগুলো কেবল নবীজি (সা.)-এর
ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; পরোক্ষভাবে
এগুলো আমাদের শিক্ষক, গুরুজন, পিতামাতা ও
প্রকৃত ধর্মীয় আলেমদের প্রতিও প্রযোজ্য। একই সঙ্গে যেখানে আল্লাহ, তাঁর রাসূল, কুরআন ও হাদিসের
আলোচনা হয়—সেসব স্থানেও এই
আদব ও শিষ্টাচার রক্ষা করা অপরিহার্য।
পরবর্তী কয়েকটি আয়াতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সামাজিক বিধান
বর্ণিত হয়েছে। যদিও প্রত্যক্ষ সম্বোধন নবী (সা.)-এর প্রতি, তবুও এর
লক্ষ্যবস্তু সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত
সবাই। এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—কোনো ফাসেক ব্যক্তি কোনো সংবাদ
প্রদান করলে তা যাচাই না করে বিশ্বাস করা যাবে না। প্রতিটি সংবাদ অন্ধভাবে গ্রহণ
করে তার ওপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত বা কার্যক্রম গ্রহণ করা সমীচীন নয়। বিশেষত
কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা
জাতির বিরুদ্ধে কোনো সংবাদ এলে প্রথমেই ভাবতে হবে—সংবাদটির উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য।
উৎস যদি সন্দেহজনক হয়, তবে যথাযথ
যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কারণ
একটি মিথ্যা সংবাদের ভিত্তিতে কোনো জাতির সম্মান, এমনকি ইতিহাস পর্যন্ত কলুষিত বা
ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা মুসলমানদের পারস্পরিক সংঘাতের
প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। যদি কখনো মুসলমানদের দুটি দল পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, সে ক্ষেত্রে
অন্য মুসলমানদের কী করণীয়—তা স্পষ্টভাবে
বলে দেওয়া হয়েছে। এখানে ন্যায়বিচার, সংযম ও সহনশীলতার ওপর জোর দেওয়া
হয়েছে এবং মুসলিম উম্মাহর ভ্রাতৃত্ববোধকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
এরপর মুসলমানদের এমন সব নৈতিক ব্যাধি থেকে আত্মরক্ষার
নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেগুলো
সমাজজীবনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তোলে। একে
অপরকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা, উপহাস করা, অপমানজনক নামে
ডাকা, কু-ধারণা পোষণ
করা, গোপন দোষ
অনুসন্ধান করা এবং অনুপস্থিতিতে বদনাম করা—এসবই গুরুতর গোনাহ এবং সামাজিক
অশান্তির মূল কারণ। আল্লাহ তা‘আলা একে একে এসব কাজকে হারাম ঘোষণা করেছেন। মুসলিম নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একে
অপরকে অসৎ নামে সম্বোধন না করা, অমূলক সন্দেহ পোষণ না করা এবং সর্বোপরি গীবত অর্থাৎ পরচর্চা ও পরনিন্দা থেকে
বিরত থাকার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গীবতকে আল্লাহ তা‘আলা এতটাই জঘন্য
কাজ হিসেবে তুলে ধরেছেন যে, একে মৃত ভাইয়ের
মাংস ভক্ষণের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা গোষ্ঠীগত ও বংশগত বৈষম্যের
মূলে আঘাত হেনেছেন—যা যুগে যুগে
পৃথিবীতে ভয়াবহ বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে। জাতি, বংশ কিংবা গোত্রের অহংকারে মত্ত
হয়ে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ও অন্যকে নীচু মনে করা, নিজের বড়ত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য
অন্যকে হেয় করা—এসব নিকৃষ্ট
প্রবৃত্তির কারণেই পৃথিবী জুলুমে ভরে উঠেছে। আল্লাহ তা‘আলা অত্যন্ত
সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর একটি আয়াতে এসব ভ্রান্তির মূলোৎপাটন করে ঘোষণা করেছেন—সমস্ত মানুষ একই
উৎস থেকে সৃষ্টি; জাতি ও গোত্রে
বিভক্ত করা হয়েছে কেবল পারস্পরিক পরিচয়ের জন্য, শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারের জন্য নয়।
আল্লাহর কাছে মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড হলো তাকওয়া অর্থাৎ আল্লাহ্ভীতি ও
সংযমশীলতা।
সবশেষে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ঈমান কেবল মুখে
দাবি করার বিষয় নয়। প্রকৃত ঈমান হলো অন্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সত্য বলে গ্রহণ
করা, বাস্তবে তাঁদের
নির্দেশের অনুসরণ করা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর পথে জান ও মাল উৎসর্গ করা।
যারা শুধু মৌখিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে, অথচ অন্তরে তা গ্রহণ করে না—তারা পার্থিব
বিচারে মুসলমান হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং সামাজিকভাবে তাদের সঙ্গে মুসলমানদের মতো
আচরণ করা যেতে পারে; কিন্তু আল্লাহর
দরবারে তারা প্রকৃত মুমিন হিসেবে গণ্য হয় না।
শেষ কয়েকটি আয়াতে ঈমান, ইসলাম ও নিফাকের অর্থাৎ
দ্বিচারিতার পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে—ইসলাম গ্রহণ
কোনো স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যম নয়; বরং প্রকৃত ইসলাম গ্রহণের সুফল সম্পূর্ণভাবে মানুষের নিজের জন্যই। ইসলাম গ্রহণ
করে তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে উপকার করছে—এমন ধারণা নিছক মূর্খতা ছাড়া কিছু
নয়।
এই সূরার সামগ্রিক শিক্ষা থেকে আমরা যা উপলব্ধি করতে
পারি তা হলো—
(১) নবীজি (সা.)
তো বটেই, সকল সম্মানীয়
ব্যক্তির প্রতি শিষ্টাচার ও ভদ্রতা রক্ষা করা।
(২) কোনো ফাসেক
অর্থাৎ অসৎ ও পাপিষ্ঠ ব্যক্তির সংবাদ যাচাই না করে গ্রহণ না করা।
(৩) কোনো মানুষকে
অপমানজনক নামে সম্বোধন না করা।
(৪) কু-ধারণা ও
গীবতের মতো ভয়াবহ গোনাহ থেকে নিজেকে সংযত রাখা।
সূরা হুজরাতের এই মহান শিক্ষাগুলো যদি আমরা আমাদের
ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে নিঃসন্দেহে আমরা একটি সুন্দর
সমাজ গঠনে সফল হবো এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সক্ষম হবো—যা আমাদের ইহকাল
ও পরকাল উভয় জীবনকেই সৌন্দর্যমণ্ডিত করবে, ইন্ শা আল্লাহ।
ড. আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

No comments:
Post a Comment