Pages

Tuesday, 17 December 2019

জিবরান খালীল জিবরান


জিব্‌রান খ়ালীল জিব্‌রান
(১৮৮৩ ১৯৩১ খ্রি)
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
 
জন্ম ও পরিচয়ঃ
উনিশ শতকের বিখ্যাত সাহিত্য সংগঠন আর্‌-রাবিত়াহ্‌ আল্‌-ক়ালামিয়্যাহ্‌এর প্রাণপুরুষ ছিলেন জিব্‌রানতিনি একাধারে বিখ্যাত কবি, লেখক ও চিত্রকর ছিলেন। বহুমুখী প্রতিভা নিয়ে আরবী সাহিত্যকে জগত সভায় বিশেষ স্থান দিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য, তিনি ছিলেন মাহ্‌জার অর্থাৎ প্রবাসী সাহিত্যিকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তিনি ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দের ৬ই জানুয়ারী লেবাননের বাশারী গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর মেষপালক পিতা সাদ জুবরান একজন মদ্যপায়ী ও দুশ্চরিত্রবান ছিলেন। তাঁর মা কামিলা রাহ়্মা ছিলেন সম্ভ্রান্ত ধার্মিক পরিবারের কন্যা।
 
বাল্যকাল ও শিক্ষাঃ
পাঁচ বছর বয়সে জুবরান গ্রামের একটি বিদ্যালয়ে থেকে বাইবেল এবং আরবী ও সিরীয় ভাষার প্রাথমিক পাঠ অর্জন করেন। পাশাপাশি মায়ের নিকট সংগীত ও চিত্রাঙ্কন শেখেন। মনোরম ও অনুকূল পরিবেশে জুবরান বড় হতে থাকেন। দশ বছর বয়সে একবার পড়ে গিয়ে চোট পান, শেষ জীবন পর্যন্ত যার ভুক্ত ভোগী ছিলেন।
 
বিদেশ যাত্রাঃ
কর ফাকি দেওয়ার অপরাধে তাঁর পিতাকে পুলিশ গ্রেফতার করলে, ১৮৯৫ সালে তাঁর মা জুবরান সহ তিন সন্তানকে নিয়ে আমেরিকায় চলে আসেন এবং বোস্টন শহরে বসবাস শুরু করেনএখানে লেখক ১৮৯৭ পর্যন্ত ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের পাঠ গ্রহণ করেন
 
লেবানন প্রত্যাবর্তনঃ
মাতৃভাষা আরবীতে দক্ষতা অর্জন করতে ১৮৯৮ সালে লেবাননে ফিরে আসেন। বেইরুতের মাদ্‌রাসাতুল্‌ হিক্‌মাহ্‌ থেকে তিন বছর অধ্যয়ন কালে আরবী, ফরাসী ও বাইবেল শিক্ষা অর্জন করেন। এখানে তিনি এক নারীর প্রেমে পড়েন। কিন্তু ওই যুবতী তাঁর প্রেমকে প্রত্যাখ্যান করেএরপর সহোদরার অসুস্থতার খবর পেয়ে তিনি আবার আমেরিকায় ফিরে আসেন।
 
কর্মজীবনঃ
১৯০২ সালে বোস্টন ফিরে আসার পর থেকে কয়েক মাসের ব্যবধানে বোন, দাদা এবং মায়ের মৃত্যুতে জুবরান অত্যন্ত ভেঙে পড়েন। ১৯০৮ সালে মেরী হাস্‌কেল নামক জনৈকা রমনীর সহযোগিতায় প্যারীস গমন করেন ও বিখ্যাত ফরাসী চিত্রশিল্পী রোডিনের কাছে চিত্রকলা শেখেন। ১৯১২ সালে নিউ ইয়র্কে গিয়ে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন। সেখানে চিত্রাঙ্কন ও লিখনীতে সম্পূর্ণ আত্মনিয়োগ করেন। উল্লেখ্য যে, তার প্রথম সভাপতিত্বে ১৯২০ সালে আমেরিকায় আর্‌-রাবিত়াহ্‌ আল্‌-ক়ালামিয়্যাহ্‌ নামক সাহিত্য সংগঠনের সূচনা হয়।
 
মৃত্যুঃ
১৯৩১ সালের ১০ই এপ্রিল এই স্বনামধন্য সাহিত্যসাধক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার শেষ ইচ্ছা মতো ২১শে আগস্ট তার শবদেহ বেইরুতে নিয়ে এসে জন্মস্থান বাশারীতে পুনঃসমাধিস্থ করা হয়।
 
রচনাবলীঃ
তিনি আরবী ও ইংরেজী উভয় ভাষাতেই বহু সৃজনশীল রচনা রেখে গেছেন। তার মধ্যে বিখ্যাত কয়েকটি হলোআন্‌-নাবী (দ্য প্রোফেট), আল্‌-মুসীক়ী, আল্‌-আর্‌ওয়াহ় আল্‌-মুতামার্‌রিদাহ্‌, আল্‌-আজ্‌নেহ়াতুল্‌ মুতাকাস্‌সিরাহ্‌, ইলাহাতুল্‌ আর্‌দ়, দুম্‌আতুন্‌ ওয়াব্‌তিসামাহ্‌, আল্‌-মাজ্‌নূন।
 
কাব্য বৈশিষ্টঃ
জুবরানের প্রতিভা যেমন বহুমুখী ছিল, তেমন তার লেখার বিষয় ও বৈশিষ্ট্যের মাঝেও বহুমুখীতা লক্ষ্য করা যায়তাঁর নিজ জীবনের বিয়োগান্তিক পরিস্থিতি তাঁর বহু গল্পে প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর রচনায় মানব জীবন, ন্যায়, সততা, ধর্ম ইত্যাদি লক্ষ্য করা যায়। তিনি কোনো কোনো রচনায় প্রচলিত সামাজিক কুসংস্কার, অত্যাচার, অজ্ঞতা ইত্যাদির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তার সর্বাধিক বিখ্যাত রচনা আন্‌-নাবীতে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে মানবজীবনের বিভিন্ন বিষয় আলোচিত হয়েছে।

ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ (রাহঃ)



ইমাম ইব্‌নু তাইমিয়াহ্‌ (রাহঃ)
(১২৬৩ – ১৩২৮ খ্রি) 
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
 
জন্ম ও পরিচয়ঃ
ইমাম ইব্‌নু তাইমিয়া (রাহ) পৃথিবীর ইতিহাসে একটি অনন্য প্রতিভা, মুসলিম বিশ্বে একটি সুপরিচিত নাম, শরিয়তি-জ্ঞানের জগতে একটি প্রামাণ্য ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একজন সমাজ-সংস্কারক, চিন্তাবিদ ও ভাষ্যকার ধর্মতত্ত্বে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্যের কারণে তাঁকে ‘শাইখুল-ইসলাম’ (ইসলামের পণ্ডিত) নামে আখ্যায়িত করা হয়। কুরআন-সুন্নাহ কেন্দ্রিক সমাজ-গঠন ও জীবন যাপনের জন্য তিনি সদা প্রয়াসী ছিলেন। অনেকের ধারণা, তাঁর এই সংস্কার আন্দোলনই পরবর্তীতে আরব ভূখণ্ডে ওহাবীউত্তর আফ্রিকাতে ‘সান্নূসী’ আন্দোলন নামে আত্মপ্রকাশ করে।    
 
তাঁর জন্ম হয় রোজ সোমবার, ২২শে জানুয়ারী ১২৬৩ খ্রিস্টাব্দে মোতাবেক ৬৬১ হিজরীর ১০ রবিউল আউয়াল সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের নিকটবর্তী হাররান প্রদেশে। প্রকৃত নাম আহ্‌মাদ, পিতা আব্দুল হালিম, পিতামহ আব্দুস সালাম; উপনাম আবুল আব্বাস, উপাধি তাক্বিউদ্দিন; কিন্তু তিনি ইব্‌নু তাইমিয়াহ্‌ নামে অধিক পরিচিত। তাইমিয়া তাঁর পিতামহীর নাম।
 
বিদ্যার্জনঃ
তাঁর পিতা আব্দুল হালিম ইসলাম শাস্ত্রের বিদ্যান ছিলেন। ইব্‌নু তাইমিয়া ফিক্বাহ শাস্ত্রে হাম্বালি পন্থার অনুসারী ছিলেন। ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত নিজ পিতার কাছেই কুরআন, তাফসির (আল-কুরআনের ব্যখ্যাশাস্ত্র), হাদিস, আরবি ভাষা ও সাহিত্যে ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন। তারপর দামেস্কের বিখ্যাত পণ্ডিত যায়নুদ্দিন আল-মাক্বদেসি, নাজমুদ্দিন আল-আসাকারি ও যায়নাব বিনতে মাক্কি প্রমুখের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। অসাধারণ মেধা, তীক্ষ্ণ স্মৃতি ও সূক্ষ্মবিচার শক্তির কারণে অল্পদিনেই তিনি সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন।  
 
কর্মব্যস্ততাঃ
১২৮২ খ্রিস্টাব্দে (৬৮১ হি) তাঁর পিতার মৃত্যু হয়, তখন তাঁর বয়স কুড়ি বছর। সে-সময় তিনি হাম্বালি ফিক্বহর পাঠদান আরম্ভ করেন। ধর্মতত্ত্বে তাঁর দখল ছিল অসামান্য। তিনি দামেস্কের বিখ্যাত জামে’ মসজিদে প্রতি শুক্রবারে আল-কুরআনের তাফসীর (ব্যাখ্যা) পেশ করতেন। তিনি তাঁর আলোচনায় বর্ণনাসূত্রে দুর্বল ও অসমর্থিত হাদীসগুলির তীব্র সমালোচনা করতেন। তাঁর এই অনন্য প্রতিভার কারণে ৩০ বছর বয়স অতিক্রম করার পূর্বেই তিনি খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে যান। ফলে সরকার কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘কাযীউল্‌-কুযাত’ (প্রধান বিচারপতি) পদে নিয়োগের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে নিজেকে শিক্ষকতায় নিয়োজিত রাখেন।
 
প্রণয়নঃ
তিনি ইসলামীশাস্ত্র জগতের নিরলস জ্ঞানতাপসদের মধ্যে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। অধ্যয়ন ও প্রণয়ন তাঁর জীবনকালের সিংহভাগকে দখল করে রয়েছে। তিনি সকল শ্রেণীর লেখকদের রচনা পড়তেন, বিভিন্ন মতাদর্শের পরিচয় লাভ করতেন, অতঃপর তত্ত্ব ও তথ্যের ভিত্তিতে নিজ অভিমত প্রকাশ করতেন। ইতিহাসের কতিপয় বর্ণনানুসারে তাঁর প্রণীত পুস্তকসমূহের সংখ্যা প্রায় পাঁচশত। যার অধিকাংশই কালের সুদীর্ঘ প্রবাহে কোথাও হারিয়ে গেছে। বর্তমানে শুধু তাঁর প্রণীত ৬৪টি গ্রন্থ মজুত আছে। উল্লেখ্য যে, অধিকাংশ সময় কারাবরণ ও অবিবাহিত জীবনযাপন তাঁর জন্য শাপে বর হয়েছিল। অনেকে মন্তব্য করেছেন, তিনি জীবনের এক তৃতীয়াংশ হাজতাবাসে যাপন করেছেন; যা তাঁর নির্বিঘ্ন অধ্যয়নের সুবর্ণ অবকাশে পরিণত হয়েছিল।
 
সংস্কারকমূলক চিন্তন ও প্রয়াসঃ  
তিনি তাঁর বিভিন্ন রচনায় ফিক্বাহ শাস্ত্র সম্পর্কিত বহু বিষয়ে সংস্কারপন্থী মোট প্রকাশ করেছেন। পূর্ববর্তী চার ইমাম (আল্লাহ্‌ তাঁদের প্রতি করুণা বর্ষণ করুণ।)–এর মধ্য হতে কোনও একজনের মতকে অনুসরণ করাকে তাক্বলীদ বলে। তিনি এই তাক্বলীদের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, যে মতটির ভিত্তি কুরআন বা বিশুদ্ধ হাদিসের উপর রয়েছে কেবল সেটিকেই মানতে হবে। এছাড়া কুরআন ও হাদিসকে যুক্তি দ্বারা বিশ্লেষণ করা এবং বিশ্লেষণে কোন সমস্যা হলে যুক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া- উক্ত অভিমতকে তিনি খণ্ডন করেছিলেন। সেযুগেও মুসলিমরা ধর্মপালনের প্রতি অধিক আবেগপ্রবণ হয়ে বা অধিক পুণ্যলাভের আশায় শারিয়াহ কর্তৃক নির্ধারিত কর্মসমূহের মধ্যে কিছু অভিনব কৌশল বা প্রথা সংযোজন করেছিল পরিভাষায় যাকে বিদ’আত বলে, তিনি তার বিরোধিতা করে শুধুমাত্র কুরহাদিস সমর্থিত কর্ম ও কৌশল পালনে সমাজকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিনি তালাক্ব এবং হালালাহ (বৈধ করার কৌশল) প্রসঙ্গে পূর্ববর্তী ওলামাদের থেকে ভিন্ন মত পোষণ করতেন; তাই তাঁকে তাঁদের রোষানলে পড়তে হয়েছিল। তিনি মনে করতেন, ইজতেহাদ (কুরআন ও হাদিসকে কেন্দ্র করে সমসাময়িক সমস্যার সমাধান অন্বেষণ করা)-এর দ্বার আজও উন্মক্ত রয়েছে। এধরণের বেশকিছু বিষয়ে সমকালীন পণ্ডিতদের সঙ্গে তাঁর মতানৈক্য হয়। আর এর ফলাফল স্বরূপ তাঁর অর্ধেকেরও বেশি জীবন হাজতবাসে অতিবাহিত হয়।
 
বিভিন্ন চোখে ইব্‌নু তাইমিয়াঃ  
একদল ইসলামী বিদ্বান তাঁকে নাস্তিক বা কাফির বলে উল্লেখ করেছেন; তবে, অপর একদল তাঁকে শাইখুল ইসলাম বা ইসলামের ভাষ্যকর বলে আখ্যায়িত করেছেন। একদল তাঁর পাণ্ডিত্য দেখে বলেছেন- ইব্‌নু তাইমিয়া যদি বলেন, এটা হাদীস; তাহলে সেটা হাদীস আর যদি বলেন- এটা হাদীস না, তাহলে সেটা হাদীস না। নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে, তিনি ছিলেন একজন যুগশ্রেষ্ঠ ইসলামী বিদ্বান ও ধর্ম সংস্কারক। 
 
মৃত্যুবরণঃ 
নিজ বন্দীদশাকে তিনি পূর্ণরূপে প্রণয়নের কাজে ব্যয় করেছিলেন। অতঃপর যখন তাঁর কাছ থেকে কাগজ ও কলমও ছিনিয়ে নেওয়া হল তিনি কয়লা দিয়ে দেওয়ালে লিখতে আরম্ভ করেন। তবে, ২০ দিনের মাথায় সোমবার মধ্যরাতে ২০শে যুলক্বাদ, ৭২৮ হিজরি মোতাবেক ২৬-২৭ সেপ্টেম্বর, ১৩২৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়তাঁর জানাযা চারবার পড়ান হয় তাঁর জানাযায় প্রায় দুলক্ষ পুরুষ ও ১৫ হাজার স্ত্রী লোক অংশ গ্রহণ করেছিলেনদামেস্কের সুফিয়া কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। বর্তমানে উক্ত কবরস্থানের সবগুলো কবর ভেঙ্গে দিয়ে সেখানে সিরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনসমূহ নির্মিত হয়েছে; কিন্তু ইব্‌নু তাইমিয়ার কবরটি আজও রয়েছে

মিখাইল নুআইমাহ


মিখ়াইল নুআইমাহ্‌
(১৮৮৯ – ১৯৮৮ খ্রি)
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
 
জন্ম ও পরিচয়ঃ
উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে যে সব শিক্ষাবিদ ও সুসাহিত্যিক আরবী ভাষা ও সাহিত্যের আধুনিকীকরণ ও বিশ্বসাহিত্যে তার পরিচয় তুলে ধরার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন তাঁদের মধ্যে প্রখ্যাত ভাষাবিদ ও সাহিত্যিক মিখ়াইল নুআইমাহ্ও ছিলেন অন্যতমতিনি ১৮৮৯ সালে বাস্‌কান্‌তাতে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর নাম মিখ়াইল নুআইমাহ্‌ বাল্যকালে তিনি পিতামাতার পরম আদরস্নেহে লালিত পালিত হন। ছোটবেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী এবং খুবই বিনয়ী ও নম্র প্রকৃতির ছিলেন। মেধা ও চরিত্রগুণে মা-বাবার মন জয় করতে পেরেছিলেন। ফলে পুরো পরিবারের পরম আদরের পাত্র ছিলেন
 
শিক্ষার্জনঃ
জন্মস্থানেই প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। অতঃপর ১৮৯৯ সালে রুসিয়া মাদ্‌রাসায় ভর্তি হন। এই মাদ্‌রাসাটি অর্থোডক্স বংশধরদের খিদমত করার জন্য সে দেশে তৈরি হয়েছিল। অতঃপর তিনি ১৯০২ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য ফিলিস্তিনের নাসেরাহ্‌-তে যান। সেখানে দীর্ঘ ছয় বছর অতিবাহিত করেন। চতুর্থ বছরের পাঠ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই উচ্চ শিক্ষার জন্য সরকারের পক্ষ হতে বৃত্তি লাভ করেনঅতঃপর ১৯০৬ সালে বোলতাফার আর্‌-রূহীতে চলে যান। সেখানে রাশিয়া সাহিত্য অধ্যয়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং টলস্টয়ের রচনাসমূহ অধ্যয়নে মনোসংযোগ করেন। কিন্তু ১৯১১ সালে তিনি রাশিয়ার প্রতি বিদ্রোহী মনোভাব নিয়ে লেবাননে ফিরে আসেন। অতঃপর এ বছরে তিনি নিজ ভাইয়ের সাথে ওয়াশিংটনে সফর করেন। এবং সেখানে ইংরেজী সাহিত্য পড়া শুরু করেন, যা তাঁকে পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পাঠে সহযোগিতা করেছিল।
 
উচ্চশিক্ষা ও কর্মব্যস্ততাঃ
মিখ়াইল নুআইমাহ্‌ ১৯১১ সালে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পর লেবানন থেকে ফিরে আসেন এবং আমেরিকার সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। কিছুদিন সেনাবাহিনীতে চাকুরী করার পর ফ্রান্স যাত্রা করেন। অতপরঃ সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ফ্রান্সের ইতিহাস ও সাহিত্য অধ্যায়ন করেন। ক’বছর বাদে মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রে তিনি প্রত্যাবর্তন করে  সেখানে এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ আরম্ভ করেন। ১৯১৬ সালে তিনি ওয়াসিংটন বিশ্বাবদ্যালয় থেকে আইন শাস্ত্রে ডক্টরেট লাভ করেন।
 
ব্যাক্তিগত জীবনে তিনি জিব্‌রান খালীল জিব্‌রানের ঘনিষ্ট সহচর ছিলেন। জিব্‌রানের ইয়াসূ’ ইব্‌নু ইন্‌সান গ্রন্থে সংকলিত মিখ়াইল নুআইমাহ্‌র অনেকগুলো চিঠি তার উল্লেখযোগ্য প্রমাণ। ১৯২০ সালে তিনি আর্‌-রাবেতাহ্‌ আল্‌-কালামিয়্যাহ্‌ প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেন। ১৯৩১ সালে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী খালীল জিব্‌রানের মৃত্যুর পর লেবাননে ফিরে আসেন।
 
চিন্তাধারাঃ
এরপর মিখ়াইল নুআইমাহ্‌ নিজ কাজে গভীর ভাবে মনোযোগী হয়ে পড়েন। চিন্তাচেতনার জগতে ডুবে যেতে লাগলেন। খানিকটা নির্জনতা প্রিয় হয়ে পড়লেন। কোলাহলপূর্ণ জনসমাজ থেকে দুরে থাকতে আরম্ভ করলেন। চিন্তাভাবনা দ্বারা উম্মুক্ত ও উদ্ভাসিত অবস্থার মূল এবং অস্তিত্বের রহস্য উদঘাটনে চেষ্টা করতে লাগলেনআর নির্দিষ্ট পরিকল্পনা মাফিক কাজের মাধ্যমে চুপিচুপি নিজ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলেন
 
পাশ্চাত্য কাব্যকবিতা ও সাহিত্যের প্রভাব বিংশ শতাব্দীর প্রথম তিন দশকের যে সব কবিদের উপর প্রকট মিখ়াইল নুআইমাহ্‌ও তার ব্যতিক্রম নন। এই প্রভাব তাঁর চেতনার রাজ্যে যুগান্তকারী ক্রিয়া করে এবং তারই প্রতিফলন বিধৃত হয়েছে তাঁর সমগ্র শিল্পকর্মে। কবি ধ্যানস্থ, আত্মস্থ এবং সর্বোপরি বিদ্রোহী। বিবর্তন-প্রয়াসী কবির কাব্য-গ্রন্থ দীওয়ানগুলি সেই ধারারই জ্বলন্ত স্বাক্ষর। অত্যাচারিতশোষিত সমাজ জীবনের ধ্বংসস্তুপের উপর দাঁড়িয়ে কবির প্রশ্ন আমরা কোথায় আছি, কোথায়? কোথায়? আত্মীয়স্বজন নেই আমাদের; নেই প্রতিবেশী। কবির বিদ্রোহ ক্লেদাক্ত সমাজ জীবনের বিরুদ্ধে। কবির সমস্থ যন্ত্রনা দলিত-মথিত হয়ে এমন কাব্য-কুসুমের জন্ম দিয়েছে যার ঘ্রাণ সমগ্র বিশ্বের হাওয়ায় স্পন্দিত। কবিতার ধ্বংসস্তুপের উপর নব পদ্ধতির প্রাসাদ রচনার তিনি প্রয়াসী। এই শিল্প চেতনাই তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে নব রুপায়ণের লক্ষ্যে। কবি অতি মাত্রায় পাশ্চাত্য প্রভাবে প্রভাবিতআর এর একমাত্র কারণ হল এই যে লেবানে জন্মগ্রহণ করলেও কবির দীর্ঘজীবন কেটেছে রাশিয়া এবং আমেরিকায়।
 
সৃজনশীল ব্যাক্তিত্বঃ
আইন বিধানের শিক্ষক হওয়ার জন্য তিনি অতুলনীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম, মেধা ও চিন্তা শক্তির দ্বারা আরবী সাহিত্যের আধুনিকীকরণ করেছেন। তিনি অসংখ্য সাহিত্য রচনা করে আরবী সাহিত্যের জগৎকে নতুন রুপ দিয়েছেনআরবী সাহিত্যের আধুনিকীকরণ ও সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো বেশ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেতিনি ২৫টিরও বেশী গ্রন্থ বহু প্রবন্ধ রচনা করেছেন, যেমন— যাদুল্‌ মা‘আদ, আল্‌—য়াদির, আল্‌-আওসান, সাওতুল্‌ ‘আলাম, আন্‌-নূর ওয়াদ্‌ দাইহূর, ফী মাহাব্‌বির্‌ রীহ, দারূব, আব্‌‘আদু মিন মোস্কো ওয়া মিন্‌ ওয়াশিন্‌তান, আল্‌-মারাহিল। এছাড়া তিনি অনেক গল্প কাহিনী লিখেছেন যেমন— হাওয়ামিশ, আবূ বাত্‌তাহ্‌, কানা মা কানা, ইয়া ইব্‌না আদাম, আল্‌-ইয়াওমুল্‌ আখীর, মির্‌দাদ, লেকা, মুজাক্‌কারাতুল্‌ আর্‌কাশ, আকাবির। তিনি বহু নাটক রচনা করেছেন যেমন— আইয়ুব, আল্‌-ওয়ারাকাতুল্‌ আখীরাহ্‌, আল্‌-আবাউ ওয়াল্‌ বানূন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক গ্রন্থ রচনা করে আরবী সাহিত্যের জগতে এক নতুন দিগন্তের সুচনা করেন। প্রবন্ধ, গল্প, কাহিনী, নাটক, রম্য রচনা, দৃষ্টান্ত মুলক কবিতা, চিঠিপত্র, পূর্বের ইতিহাস ঐতিহ্য, বিভিন্ন মনীষীদের জীবনী সংক্রান্ত বিষয়ে পৃথক পৃথক গ্রন্থ রচনা করে স্বীয় অবদান অক্ষুন্ন রেখেছেন
 
মৃত্যুঃ
প্রায় এক শ’ বছরের দীর্ঘ জীবনে নানা বিষয়ে অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করে, আরবি সাহিত্য ও আরব সমাজকে নানা আঙ্গিকে নানা ভাবে সমৃদ্ধ করে ২২শে ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮ সালে আশ্‌-শাখ্‌রূব গ্রামে ইহলোক ত্যাগ করেন।