Pages

Monday, 16 September 2019

মাহমুদ দারবিশঃ জেরুজালেমে



জ়েরুজ়ালেমে
মাহ্‌মুদ দার্‌বিশ, ফিলিস্তিন
অনুবাদ- আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
 
জ়েরুজ়ালেমে, পুরনো প্রাচীরের ভেতোর  
আমি হেঁটে চলেছি যুগ যুগ ধরে
কোনো স্মৃতি ছাড়াই, যে স্মৃতি
নির্ভুল করে তোলে আমাকে, দিশা দেয় সুপথের;    
খানে নবী-রসুলগণ নিজেদের মাঝে
ভাগ করে নিয়েছেন আল্‌-কুদ্‌সের ইতিহাস
বেহেশতের সিঁড়ি বেয়ে তাঁরা ছুয়েছেন আকাশ
আর যখন ফিরেছেন, মিলিয়ে গেছে অন্ধকার ও হতাশা;
এখানে যে ভালোবাসা ও শান্তি পবিত্র
এবং তাদের বিচরণ অবাধ এই শহরজুড়ে।
আমি হাঁটছিলাম একটা ঢালু পথ ধ’রে
আর ভাবছিলাম, কীভাবে বিতর্ক করে বর্ণনাকারীরা
পাথরের উপর লেখা আলোর কথাগুলো নিয়ে?
আলো-লোভী পাথর থেকেই কি বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা?
আমি ঘুমের মধ্যে হাঁটি আর স্বপ্নে তাকিয়ে থাকি 
দেখি, সামনে-পেছনে পারাপার জুড়ে কোথাও কেউ নেই;
সকল আলো সকল গন্তব্য আমার

আমি হাঁটি, ভেসে বেড়াই নানা রূপে
প্রকাশিত হই অন্য ছাঁচে, আলো মেখে
শব্দগুলো অঙ্কুরিত হয় ঘাসের মতো,
যেন নব ইসায়ার (আ) মুখ নিঃসৃত বাণী—
“যদি বিশ্বাস না করো, শান্তি পাবে না তুমি”।
আমি হাঁটি অন্য রূপে, নিভৃতে আর আমার ক্ষতগুলো
ঐশ্বরিক সাদা গোলাপের মতো পবিত্র;
আমার হাত দুটো একজোড়া পায়রার মতো
ঝুলে থাকে ক্রুশের র, বয়ে চলে পৃথিবীর ভার।

আমি এখন হাঁটি না, শূন্যে ভাসি
অন্য কেউ হয়ে, আমার প্রকাশ ঘটে নানা রূপে;  
দেশ নেই, কাল নেই, তাহলে কে আমি?
আমি কেউ নই, আমি মে’রাজের উপস্থিতি মাত্র।
তবে একাকী বসে ভাবি— নবী মুহাম্মদ (সা)
কথা বলতেন যে ভাষায় সে তো আরবি
আমারই মাতৃভাষা, “তারপর কী?”
আর কী বলার আছে তোমার...?
হঠাৎ চিৎকার করে উঠল এক নারী-সিপাহী
বলল, আবার এসেছো তুমি?
আমি না তোমাকে খুন করেছিলাম?
বললাম, তুমি আমাকে হত্যা করেছিলে ঠিকই
কিন্তু আমি ভুলে গেছি সে-কথা,   
তোমার মতো, আমি মৃত্যুকে মনে রাখিনি
আমি যে ফিলিস্তিনি, কুদ্‌সের অধিবাসী

[আল্‌-আ’মাল আল্‌-জাদীদাহ্‌ আল্‌-কামেলাহ্‌, মাহ্‌মুদ দার্‌বিশ ৫১-৫২]


[এই অনুবাদটা প্রকাশিত হয়েছে মাসিক তারজুমানে আহ্‌লে হাদিস, সেপ্টেম্বর ২০১৯ সংখ্যায়] 




في القدس
محمود درويش

في القدس، أَعني داخلَ السُّور القديمِ،
أَسيرُ من زَمَنٍ إلى زَمَنٍ بلا ذكرى
تُصوِّبُني. فإن الأنبياءَ هناك يقتسمون
تاريخَ المقدَّس... يصعدون إلى السماء
ويرجعون أَقلَّ إحباطاً وحزناً، فالمحبَّةُ
والسلام مُقَدَّسَان وقادمان إلى المدينة.
كنت أَمشي فوق مُنْحَدَرٍ وأَهْجِسُ: كيف
يختلف الرُّواةُ على كلام الضوء في حَجَرٍ؟
أَمِنْ حَجَر ٍشحيحِ الضوء تندلعُ الحروبُ؟
أسير في نومي. أَحملق في منامي. لا
أرى أحداً ورائي. لا أرى أَحداً أمامي.
كُلُّ هذا الضوءِ لي. أَمشي. أخفُّ. أطيرُ
ثم أَصير غيري في التَّجَلِّي. تنبُتُ
الكلماتُ كالأعشاب من فم أشعيا
النِّبَويِّ: ((إنْ لم تُؤْمنوا لن تَأْمَنُوا)).
أَمشي كأنِّي واحدٌ غيْري. وجُرْحي وَرْدَةٌ
بيضاءُ إنجيليَّةٌ. ويدايَ مثل حمامتَيْنِ
على الصليب تُحلِّقان وتحملان الأرضَ.
لا أمشي، أَطيرُ، أَصيرُ غَيْري في
التجلِّي. لا مكانَ و لا زمان . فمن أَنا؟
أَنا لا أنا في حضرة المعراج. لكنِّي
أُفكِّرُ: وَحْدَهُ، كان النبيّ محمِّدٌ
يتكلِّمُ العربيَّةَ الفُصْحَى. ((وماذا بعد؟))
ماذا بعد؟ صاحت فجأة جنديّةٌ:
هُوَ أَنتَ ثانيةً؟ أَلم أَقتلْكَ؟
قلت: قَتَلْتني... ونسيتُ، مثلك، أن أَموت.


Tuesday, 10 September 2019

আবুত-তাইয়িব আল‌-মুতানাব্বী


আবুত্‌-তাইয়িব আল্‌-মুতানাব্বী
( ৯১৫-৯৬৫ খ্রি / ৩০৩-৩৫৪ হি )
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

পরিচিত ও জন্ম
আব্বাসি যুগের অন্যতম প্রধান কবি আল্‌-মুতানাব্বীতিনি আরবি সাহিত্যের প্রাচীন নীতির পরিবর্তন করে এক অভিনব রীতি প্রবর্তন করেন। কাব্য ও দর্শনকে তিনিই সর্ব প্রথম একাত্ম করে তুলেন। প্রকৃত নাম আহমাদ উপনাম আবুত্‌ তাইয়িবতবে ‘আল্‌-মুতানাব্বী’ (নবিত্বের দাবীদার) নামে অধিক পরিচিত। পিতার নাম হুসাইন। ৯১৫ খিষ্টাব্দে (মোতাবেক ৩০৩ হি) কুফার কিন্দা নামক স্থানে এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন।

বিদ্যার্জন  
কবি জন্মেছিলেন এক হতদরিদ্র পরিবারে। তাঁর পিতা জনসাধারণের জন্য জল সরবরাহের কাজ করতেন। বাল্যকালে কবি পিতাকে জল সরবরাহের কাজে সাহায্য করতেন। দৈন্যতা হতে মুক্তি পাবার আশায় পিতা-পুত্রে সিরিয়া গমন করলেন। রাজধানী দামেস্কাসে আশ্রয় নিলেন। সেখানে পিতা নিজ পুত্রের জন্য সাধ্যমত বিদ্যার্জনের ব্যবস্থা করলেন। দৈন্য অবস্থাকে পরাজিত করে বালক মুতানাব্বি মনোনিবেশ করলেন বিদ্যা চর্চায়। ক’বছর বাদ তাঁর বুৎপত্তির কথা ছড়িয়ে পড়ল দামেস্কাসের আনাচেকানাচে।

উচ্চাভিলাষ
যৌবনকালেই নিজ কবিত্বের ছাপ ফেলেন সাহিত্য জগতে। যৌবনেই কবি রূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। গ্রামীন ভাষা ও শৈলীতে কাব্য রচনা করে ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করেন। ক্রমাগতভাবে তাঁর ভক্তদের সংখ্যা বাড়তে লাগলনিজ প্রতিভা ও অনুরাগীদের ভালোবাসা দেখে উচ্চাভিলাষী কবি খলীফা বলে দাবী করে বসলেন। মুহূর্তের মধ্যে বিষয়টি চারু হয়ে গেল। খবর পেয়ে রাজ্যপাল তাঁকে বন্দী করলেন। কিন্তু কবি বন্দীশালায় রাজ্যপালের প্রশংসা করে একটি অপূর্ব কবিতা রচনা করলেন। তাঁর সেই কবিতা[1] শুনে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে মুক্ত করে দিলেন।
কবির উচ্চাভিলাষ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল আকাশছোঁয়া। তাই সিরিয়ায় কাল্‌ব গোত্রে, অন্য বর্ণনানুসারে বাদিয়াতুস্‌ সামাওয়াহ নামক স্থানে ৩২৩ হিজরিতে তিনি নবি হওয়ার দাবী করেন। কাব্যালংকারে সজ্জিত স্বরচিত কবিতাগুলিকে নিজের মু’জিযা (অলৌকিক বিষয়) ও ঐশীবানী বলে অভিহিত করেন। এবং বলেন, নবি মুহাম্মদ (সা)-ও আমার আগমনের এবং নবিত্বের সুসংবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “লা নাবিউন্‌ বা’দি” (আমার পরে ‘লা’ নামের একজন নবি হবেন।) আর আকাশে আমার নাম ‘লা’।[2]  
হিমস প্রদেশের অধিপতি লু’লু’ এ বিষয়টি জানতে পেরে তাকে বন্দী করেন। পরবর্তীতে কবি নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হওয়ায় তাকে মুক্ত করে দেন তিনিকবির এই মিথ্যা দাবীর কারণেই তাঁকে আল্‌-মুতানাব্বী (নবীত্বের দাবীদার) নামে আখ্যায়িত করা হয় এবং এ নামেই তিনি অধিক পরিচিত।

সাইফুদ্দৌলাহ ও কাফুরের দরবারে  
কারাগার হতে মুক্তি লাভের পর কবি ইন্তাকিয়ার রাজ্যপাল আবুল আশাইর-এর মাধ্যমে আলেপ্পোর আমির সাইফুদ্দৌলাহর নিকট পৌঁছোতে সক্ষম হন সেখানে তাঁর স্নেহাশ্রয়ে নয় বছর থাকেন। শেষের দিকে কবি ও সাইফুদ্দৌলাহ্‌র মাঝে কোনো এক বিষয়ে মনমালিন্য হয়। যার কারণে কবি ৩৪৬ হিজরিতে সেখান থেকে মিশর যাত্রা করেন[3]
মিশরে পৌঁছে ইক্‌শীদ বংশীয় শাসক মালিক কাফুর-এর দরবারে আশ্রয় গ্রহন করেন। কিন্তু সেখানে আশানুরূপ সমাদর না পাওয়ায় সেখান থেকে বাগদাদ অভিমুখে রওয়ানা হন। সেখানেও বেশি দিন স্থায়ী হতে পারেননি; আরও কিছু জায়গায় পরিক্রমা করে অবশেষে বুয়াইদ শাসক আযদুদ্দৌলাহর নিকট আশ্রয় নেন।

পরলোকগমন
৩৫৪ হিজরিতে পারস্য হতে বাগদাদ যাচ্ছিলেন। সঙ্গে ছিল পুত্র মাহসাদ ও দাস মাফ্‌লাহ। পথিমধ্যে আস্‌-স্বাফিয়া[4] নামক স্থানে দস্যু দ্বারা আক্রান্ত হন। প্রাণ বাঁচাতে পালাবার উপক্রম করেন। আর তাকে পলায়নপদ দেখে দাস মাফ্‌লাহ চিৎকার করে বলে— না, লোকেরা আপনার সম্বন্ধে বলবে, আপনি ভয়ে পালিয়ে গেছিলেন। অথচ আপনিই তো বলেছেন, “আল্‌-খায়লু ওয়াল্‌-লায়লু...” (আমাকে চেনে ঘোড়া, রাত আর বিস্তীর্ণ মরুভূমি। আমাকে চেনে তরবারি, বল্লম, কাগজ ও কলম।)[5] কবি ফিরে আসে আক্রমণ করেন এবং বীরত্বের সাথে লড়তে লড়তে শহীদ হয়ে যান।

কাব্য-বৈশিষ্ট
আরবি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে তাঁকে গণ্য করা হয়। তাঁর অধিকংশ কাব্য তাঁর জীবনকালে সাক্ষাৎ পাওয়া রাজাদের প্রশংসা করে লেখা। কারো কারো মতে, তাঁর ৩২৬টি কবিতা তাঁর জীবনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে রচিত হয়েছে। নয় বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও রসবোধের জন্য তিনি পরিচিত। তাঁর কবিতার আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে সাহস, জীবনদর্শন ও যুদ্ধের বর্ণনা। তাঁর অনেক কবিতা তৎকালীন সময়ে এবং বর্তমান আরব বিশ্বেও বিস্তৃত এবং সমাদৃত। তাঁর কবিতাকে প্রবাদতুল্য গণ্য করা হয়। তেমনই একটি বিখ্যাত উক্তি হল, "সিংহের দাঁত দেখা গেলে ভেবো না সিংহটি হাসছে।"
কবি মুতানাব্বি তাঁর মেধার কারণে সে-সময়ের অনেক নেতার সান্নিধ্যলাভের সুযোগ পান। সেসব নেতা ও রাজাদের প্রশংসা করে কবিতা লেখেন। বিনিময়ে শাসকরাও তাঁকে অর্থ ও উপহার প্রদান করেন। তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর শক্তিশালী কাব্যিক ধারা জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।
মুতানাব্বি ছিলেন একজন ভাবকবি তিনি কাব্য ও দর্শনের মাঝে সমন্বয় সাধন করেছেন। কবিতাকে আবু তাম্মাম ও তাঁর মতালম্বীদের বন্ধন থেকে মুক্ত করেছেন। কাব্যিক রচনাশৈলীর ক্ষেত্রে আরবীয় সনাতন পদ্ধতি পরিহার করেন। তিনি ছিলেন আরবি কাব্যে এক অভিনব পদ্ধতির অগ্রপথিক। কবিতায় ব্যাপকহারে প্রবাদের যোগ ঘটান যুদ্ধের বর্ণনায় অভিনবত্ব আনেন এবং প্রশংসা ও নিন্দা উভয় ক্ষেত্রেই নতুনত্ব প্রবর্তন করেন। তাঁর কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট হল ব্যাক্তিত্বের ছাপ, মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং ইচ্ছার নিখুঁত চিত্রায়ন এবং জীবনের উদ্দেশ্যাবলীর বিবরণ প্রদান। এই সকল কাব্যিক গুনাবলী তাঁকে আব্বাসি যুগের শ্রেষ্ঠ কবির আসনে আসীন করেছে।  



[1]
أ مالك رقي و من شأنه     هبات اللجين و عتق العبيد
دعوتك عند انقطاع الرجا     ء و الموت مني كحبل الوريد            
[2] আহ্‌মাদ হাসান যাইয়াত, তারিখ, পৃষ্ঠা—
"و في سنة 323 هـ ادعى النبوة في الشام، و لما سئل عن النبي ص قال: إنه بشر بمجيئي و أخبر بنبوتي فقال: لا نبيٌ بعدي، و أنا اسمي في السماء (لا)."
[3] আহ্‌মাদ হাসান যাইয়াত, তারিখ, পৃষ্ঠা—
" فضمه الأمير إليه حتى لا يفارقه في الحرب و لا في السلم، و لم يزل معه في حال حسنة حتى حدثت بينهما جفوة ففارقه إلى مصر في سنة 364 هـ."
[4] الصافية  
[5]  
لا يتحدث الناس عنك بالفرار و أنت القائل:
الخيل و الليل و البيداء تعرفني     و السيف و الرمح و القرطاس و القلم

Thursday, 5 September 2019

رابندرانات طاغور: جعلتني غير نافد



جعلتني غير نافد   
رابندرانات طاغور
ترجمة – عبد المتين وسيم

جعلتني غير نافد؛ 
عطفك بي مثل هذا.
وملأتَ حياتي من جديد 
بعد فراغها مرارا.
كم من تلال وشواطئ الأنهار
جُبتَ حاملا هذا المزمار
وكم من ألحان رجّعتَ بها
أبتِ، لمن أقول عنها!

وبلمستك الخالدة هذي
فقَدَ حدودَه قلبي
وفي جم البهجة
تفور الكلام مني.
وتمنحني مِلأ قُبضتي
في كلا الليل والنهار
ما نفدت على مضي الأعصار  
أبتِ، فلم أزل أتناول حُقْب الأحقاب.

(الأقلام الحّرة، ٢٤ أغسطس ٢٠١٩)


আমারে তুমি অশেষ করেছ
   এমনি লীলা তব ।
ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ
   জীবন নব নব ।
কত যে গিরি কত যে নদীতীরে
বেড়ালে বহি ছোট এ বাঁশিটিরে,
কত যে তান বাজালে ফিরে ফিরে
   কাহারে তাহা কব ।

তোমারি এই অমৃতপরশে
   আমার হিয়াখানি
হারাল সীমা বিপুল হরষে
   উথলি উঠে বাণী
আমার শুধু একটি মুঠি ভরি
দিতেছ দান দিবসবিভাবরী,
হল না সারা কত না যুগ ধরি
    কেবলি আমি লব ।

শান্তিনিকেতন
৭ বৈশাখ ১৩১৯
গীতিমাল্য ২৩ 

Friday, 23 August 2019

প্রতিবেশী ও ইসলাম

প্রতিবেশী ও ইসলাম
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

প্রতিবেশী। সমাজ ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তাই ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকারকে অনেক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। রাসূল (সা) বলেছেন, জিবরীল (আ) আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি তাগিদ করতেন যে, আমার মাঝেমধ্যে মনে হতো হয়তো প্রতিবেশীকে সম্পদের উত্তরাধিকারী করা হবে। [বুখারী ৬০১৪, মুসলিম ২৫২৪] কিন্তু বর্তমান সমাজ এ বিষয়ে চরম উদাসীন। বিশেষ করে আমরা যারা শহরে থাকি, বছরের পর বছর কেটে যায় পাশের বাড়ির লোকেদের সাথে কোনো কথা হয় না, খোঁজ-খবর নেয়া হয় না; বরং অনেক সময় আমাদের আচরণে প্রতিবেশীরা কষ্ট পায়। অথচ প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ একজন মুসলিমের নৈতিক দায়িত্ব। রাসূল (সা) বলেছেন যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌ পরকালকে বিশ্বাস করে সে যেন প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ করে”। [মুসলিম ১৮৫] যে আল্লাহ্‌ পরকালকে বিশ্বাস করে সে যেন প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। [মুসলিম ১৮৩]   
আরবি শব্দ জার (বহু বচন জীরান)-এর অর্থ প্রতিবেশী। আমাদের আশেপাশে যারা বাস করে তারাই আমাদের প্রতিবেশী। ধর্ম, বর্ণ বা জাতিতে ভিন্ন হলেও। তারা আত্মীয় হোক বা অনাত্মীয়, মুসলিম হোক বা অ-মুসলিম প্রতিবেশীর দৃষ্টিকোণ থেকে সবাই সমান। তাদের খোঁজ-খবর রাখা, বিপদ-আপদে এগিয়ে যাওয়া, সুখ-দুঃখে শরিক হওয়া, উপঢৌকন আদান প্রদান করা, সেবা-শুশ্রষা করা, তাদের প্রয়োজন ও অধিকারকে গুরুত্ব দেয়া, কোনোভাবে তাদেরকে কষ্ট না দেওয়া একজন মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব।
পবিত্র আল্‌-কুর্‌আনে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন করা হয়েছে। মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন ও এতিমের পাশাপাশি প্রতিবেশীর অধিকারের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে— “তোমরা আল্লাহর উপাসনা করো এবং কোনো কিছুকে তার সাথে শরিক করো না। পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতি, অভাবগ্রস্ত, নিকটস্থ-প্রতিবেশী, দূরবর্তী-প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, মুসাফির ও তোমাদের দাস-দাসীদের সাথে ভালো ব্যবহার করো। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না”। [সুরাহ আন্‌-নিসা ৩৬] যারা প্রতিবেশীর সাথে ভালো আচরণ করে, যথাযথভাবে তাদের হক আদায় করে তাদেরকেই প্রকৃত এবং উত্তম প্রতিবেশী অভিহিত করা হয়েছে—“যে ব্যক্তি নিজ প্রতিবেশীর দৃষ্টিতে ভালো সেই সর্বোত্তম প্রতিবেশী। [ইবনু খুযাইমা ২৫৩৯, বায়হাকী ৯৫৪১, মুস্‌নাদ আহমদ ৬৫৬৬] আর যারা নিজ প্রতিবেশীর খেয়াল রাখে না তাদেরকে তিরস্কার করা হয়েছে— “ঐ ব্যক্তি মুমিন হতে পারে না যে পেটপুরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী না খেয়ে কষ্ট পায়[মুসনাদ আবু ইয়ালা ২৬৯৯, ল্‌-আদাবুল মুফ্‌রাদ ১১২]
অনেক সময় প্রতিবেশী অভাবে দিন কাটে। কিন্তু সে লজ্জায় কারোর কাছে হাত পাতে না, কাউকে বুঝতেও দেয় না। আল্‌-কুর্‌আনের ভাষায় এরা ‘মাহ্‌রূম’ (বঞ্চিত)। এদের ক্ষেত্রে আল্‌-কুর্‌আনের নির্দেশ হল—“এবং তাদের সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও মাহরূমের অধিকার[সূরা আয্‌-যারিয়াত ১৯] তাই আমাদের উচিৎ, তাদের খোঁজ খবর নিয়ে এমন ভাবে সাহায্য করা যাতে তারা লজ্জা না পায়। যেমন, সে যাকাত গ্রহণে যোগ্য কি না তা বিবেচনা করে, প্রয়োজনে তাকে না-জানিয়েই যাকাত দেওয়া। মনে রাখতে হবে, “যে তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করে আল্লাহ্‌ তার প্রয়োজন পূরণ করেন[বুখারী ২৪৪২, মুসলিম ২৫৮০] কারণ তা-ই ঈমানের দাবি। নবী (সা) বলেছেন—“যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌ এবং আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন নিজ প্রতিবেশীকে সম্মান করে মুসলিমের বর্ণনায়, “সে যেন নিজ প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ করে”। [বুখারী ৬০১৮, মুসলিম ৪৮]  
শুধু তাই নয়, পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় ও সুন্দর করার বিধানও দিয়েছে, তোমরা হাদিয়া (উপঢৌকন) আদান-প্রদান করোতাতে তোমাদের মাঝে হৃদ্যতা সৃষ্টি হবে”। [ল্‌-আদাবুল্‌ মুফ্‌রাদ ৫৯৪] বড় বা দামী কিছু দিতে না পারলে, অন্তত “ভালো কিছু রান্না করলে তার ঝোলটা তাকে দিয়ে এসো এবং তাতে তাকে শরীক করো”। [মুসলিম ২৬২৫] এবং গৃহিণীদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, “তোমাদের কেউ যেন প্রতিবেশীকে হাদিয়া দিতে সংকোচ বোধ না করে। যদিও তা বকরীর খুরের মত কোনো নগন্য বস্তু হয় [বুখারী ৬০১৭] কারণ, রান্নার ঘ্রাণ দেয়াল-দরজা পেরিয়ে বাতাসের কাঁধে চেপে প্রতিবেশী শিশুর মনে জায়গা করে নেয়! আর তাই সামান্য কিছু পাঠিয়ে যদি ঐ ছোট্ট শিশুর মনের ইচ্ছা পূরণ করা হয় নিশ্চিত আল্লাহ খুশি হবেন এবং আমাদের রুজিরোজগারে বরকত দেবেন। পরিচারক ও রাঁধুনির ক্ষেত্রেও একই বিধান ইসলামের, “তোমাদের খাদেম (পরিচারক) যখন তোমাদের জন্য খাবার তৈরি করে নিয়ে আসে তখন তাকে যদি সাথে বসিয়ে খাওয়াতে না পারো, অন্তত তাকে দু-এক লুকমা হলেও দাও (অর্থাৎ সামান্য কিছু দিয়ে হলেও তাকে ঐ খাবারে শরিক করো) কারণ, সে-ই তো কষ্ট করে, আগুনের তাপ সহ্য করে ঐ খাবার তৈরি করেছে”। [বুখারী ৫৪৬০]
প্রতিবেশীদের মধ্যে যে যত কাছে থাকে তার অধিকার ততো বেশী। মা আয়েশা (রা) একবার নবী (সা)-কে জিজ্ঞেস করলেন, “আমার দুই প্রতিবেশী। এদের মধ্যে আমি কাকে হাদিয়া দেবো? রাসূল (সা) বললেন, যে তোমার বেশি কাছে থাকে তাকে”। [বুখারী ৬০২০] যদি সে ভিন্ন ধর্মের হয় তবুও। বিখ্যাত তাবেয়ি মুজাহিদ (রহ) বলে, একবার আমি আব্দুল্লাহ্‌ বিনম্‌র (রা)-এর কাছে বসে ছিলাম। তার খাদেম বকরীর ছাল ছাড়াচ্ছিল। তিনি তাকে বললেন, তোমার এ কাজ শেষ হলে প্রথম আমাদের ইহুদী প্রতিবেশীকে দেবে। তখন এক ব্যক্তি বলল, আল্লাহ্‌ আপনাকে সুমতি দিন, আপনি ইহুদীকে আগে দিতে বলছেন! ইব্‌নু আম্‌র বললেন, হ্যাঁ, কারণ রাসূল (সা) প্রতিবেশীর অধিকারকে এত বেশি গুরুত্ব দিতেন যে, আমার মনে হতো, হয়তো প্রতিবেশীকে সম্পদের উত্তরাধিকারী করে দেওয়া হবে[ল্‌-আদাবুল্‌ মুফ্‌রাদ ১২৮]
তাই, একজন মুমিনের প্রাথমিক দায়বদ্ধতাগুলির একটি হল নিজ প্রতিবেশীর সুবিধা-অসুবিধার খেয়াল রাখা। যদি কেউ খেয়াল না রাখে, তার দরিদ্র, অভাবী প্রতিবেশীর ক্ষুধা নিবারণ না করে, তাকে “সাক্বার” নামক জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে—“(জাহান্নামীদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে) কোন্‌ বিষয়টি তোমাদেরকে ‘সাক্বার’ নামক জাহান্নামে নিক্ষেপ করেছে? তারা উত্তরে বলবে, আমরা নামায পড়তাম না এবং দরিদ্র ও অভাবীদের খাবার দিতাম না। [সূরা আল্‌-মুদ্দাস্‌সির ৪২-৪৪] প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি তাদের অসুবিধা দূর করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে—“কোনো প্রতিবেশী যেন অপর প্রতিবেশীকে তার দেয়ালে কাঠ, খুঁটি ইত্যাদি স্থাপন করতে বাধা না দেয়[বুখারী ২৪৬৩, মুসলিম ১৬০৯] এবং দৈনন্দিন জীবনে নিত্যপ্রয়োজনীয় ছোট-খাট জিনিসের আদানপ্রদানের ক্ষেত্রেও প্রতিবেশীর প্রতি যত্নশীল হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যারা দেয় না আল্লাহ্‌ তাদেরকে ভর্ৎসনা করে বলেছেন, দুর্ভোগ এমন নামাযীদের জন্য, যারা তাদের সালাত সম্বন্ধে উদাসীন, যারা লোক-দেখানোর জন্য সেসব কাজ করে, এবং গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় ছোট-খাট জিনিস অন্যদের দিতে অস্বীকৃতি জানায়[সূরা আল্‌-মা’ঊন ৪-৭]
এসবের পাশাপাশি, কেউ যদি নিজের জায়গা বা বাড়ি বিক্রি করতে চায়, সেক্ষেত্রেও ঐ জমি বা বাড়ির পার্শ্ববর্তী প্রতিবেশী হক সবচেয়ে বেশি তাই প্রথমে তাকেই প্রস্তাব দিতে হবে। যদি সে কিনতে না চায় তাহলে অন্যের কাছে বিক্রি করতে কোনো আপত্তি নেই। তবে তাকে না জানিয়ে অন্যের কাছে বিক্রি করা যাবে না। কারণ, তাতে সে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। এটাই আইনসিদ্ধ ও শরিয়ৎ-সম্মত। একেই শরীয়তের পরিভাষায় ক্কে শুফ্আ বলে। এই মর্মে রাসূল (সা) আদেশ দিয়েছেন, যদি কেউ তার জমি বিক্রি করতে চায় তাহলে সে যেন (প্রথমে) তার প্রতিবেশীকে জানায়[ব্‌নু মাজাহ্‌ ২৪৯৩] এমনকি প্রতিবেশীর জন্য অপেক্ষা করার নির্দেশও দিয়েছেন, “শুফ্আ’-র বিষয়ে প্রতিবেশীর হক সবচেয়ে বেশি। প্রতিবেশি উপস্থিত না থাকলে তার অপেক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে যখন তাদের উভয়ের যাতায়াত একইথে হয়।” [ইব্‌নু মাজাহ্‌ ২৪৯৪, তির্‌মিযী ১৩৬৯]
প্রতিবেশীর সাথে মানুষের সম্পর্ক সকাল-সন্ধ্যা বা রাত-দিনের নয়; বরং তা মাস ও বছর বা সারা জীবনের। তাই শান্তিপূর্ণ বসবাসের জন্য প্রতিবেশীর সৎ ও ভালো হওয়া অত্যন্ত জরুরী। যদি প্রতিবেশী মন্দ হয় তাহলে ভোগান্তির শেষ থাকে না। তাই ভালো প্রতিবেশী পাওয়াকে রাসূল (সা) সৌভাগ্যের ব্যাপার বলেছেন, উত্তম প্রতিবেশী ব্যক্তির সৌভাগ্যের কারণ[মুসনাদ আহমাদ ১৫৩৭২, ল্‌-আদাবুল মুফরাদ ১১৬] এবং ভালো প্রতিবেশীর জন্য প্রার্থনাও করতে বলেছেন, “তোমরা মন্দ প্রতিবেশী থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও[নাসায়ী ৫৫০২, বায়হাকী ৯১০৬] কারণ একজন মন্দ প্রতিবেশী সাধারণ জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে। তাই সুকৌশলে এমন সমস্যার সমাধান করতে হবে। যেমনটা রাসূল (সা) করেছিলেন।এক ব্যক্তি রাসূল (সা)-এর কাছে এসে তার প্রতিবেশীর ব্যাপারে অভিযোগ করল। রাসূল (সা) তাকে বললেন, তুমি ধৈর্য ধরো। এভাবে তিনবার আসার পর তৃতীয় বা চতুর্থ বারে নবীজী তাকে বললেন, তোমার বাড়ির আসবাবপত্র রাস্তায় বের করে দাও। সাহাবী তা-ই করলেন। অতঃপর মানুষজন সেই রাস্তা দিয়ে যচ্ছিল এবং ঐ প্রতিবেশীকে অভিশাপ দিচ্ছিল। তখন ঐ প্রতিবেশী নবী (সা)-এর কাছে গিয়ে বলল, আল্লাহর রাসূল! মানুষ আমাকে যা তা বলছে। নবী (সা) বললেন, মানুষ তোমাকে কী বলছে? সে বলল, মানুষ আমাকে অভিশাপ দিচ্ছে। রাসূল (সা) বললেন, তার আগেই আল্লাহ তোমাকে লানত করেছেন। সে বলল, আল্লাহর রাসূল! আমি আর প্রতিবেশীকে কষ্ট দেবো না। তারপর নবী (সা) অভিযোগকারীকে ডেকে বললেন, তুমি (প্রতিবেশীর অনিষ্ট থেকে) নিরাপদ হয়েছ। [মুসতাদরাক হাকিম ৭৩০৩, আল-মুজামুল কাবীর তবারানী ৩৫৬, হীহ ইবনে হিববান ৫২০]
আমরা যেমন নিজ প্রতিবেশীর কাছ থেকে ভালো ব্যবহার, সদাচরণ ও সহমর্মিতা আশা করি, ঠিক তেমনি সেও আমাদের থেকে ভালো ব্যবহার প্রত্যাশা করে। তাই প্রতিবেশীর হক আদায়ের পাশাপাশি তাদেরকে কষ্ট দেওয়া থেকে বেঁচে থাকাও অত্যন্ত জরুরী। কারণ “কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বাদী-বিবাদী হবে দুই প্রতিবেশী। [মুসনাদ আহমাদ ১৭৩৭২, ল্‌-মুজামুল্‌ কাবীর- তবারানী ৮৩৬] তাছাড়া, প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়ার বিষয়টিকে নবী (সা) ঈমানের দুর্বলতা বলে চিহ্নিত করেছেন। কোনো প্রকৃত মুমিন কখনই প্রতিবেশীকে কষ্ট দিতে পারে না। রাসূল (সা) বলেছেন, “আল্লাহর শপথ সে মুমিন নয়! আল্লাহর শপথ সে মুমিন নয়! আল্লাহর শপথ সে মুমিন নয়! সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, কে? নবীজি বললেন, যে ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়। [হীহ বুখারী ৬০১৬]
 শুধু তা-ই নয়, প্রতিবেশীর সাথে মন্দ আচরণ করলে ব্যক্তির সব কৃতকর্ম বরবাদ হয়ে যায়। “এক ব্যক্তি রাসূল (সা)-কে এমন এক নারীর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করল, যে নফল নামায পড়ে, রোযা রাখে, দুহাতে দান করে, কিন্তু কথার মাধ্যমে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়, “তার কী হবে?” রাসূল (সা) বললেন, তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” [মুসনাদ আহমাদ ৯৬৭৫, আল-আদাবুল মুফরাদ ১১৯] এমনকি প্রতিবেশীর ক্ষেত্রে কোনো অন্যায় করলে অন্যের তুলনায় সেই অন্যায়ের কদর্যতা ও ঘৃণ্যতা দশ গুণ বেড়ে যায়। রাসূল (সা) বলেছেন—“কোনো ব্যক্তি দশজন নারীর সাথে অবৈধ যৌনাচার করলে যে গুনাহ হয় প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে করলে তার চেয়েও বেশি গুনাহ হয়...দশ বাড়িতে চুরি করা যত বড় অন্যায় প্রতিবেশীর বাড়িতে চুরি করা তার চেয়েও বড় অন্যায়[মুসনাদ আহমাদ ২৩৮৫৪, আল-আদাবুল মুফরাদ ১০৩, বায়হাকী ৯৫৫২]
গ্রামগঞ্জে প্রতিবেশীরা অধিকাংশ সময় একে অপরের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে তাদের বাড়ির সীমানা অথবা জমির আল বাঁধা নিয়ে। এবং অপেক্ষাকৃত সবল জন জোরপূর্বক নিজের সীমানা বাড়িয়ে নেয়। এই মর্মে তার মনে রাখা উচিৎ, “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে এক বিঘত জমি দখল করল, কিয়ামতের দিন ঐ জমির সাত-তবক জমিন তার গলায় বেড়ি আকারে পরিয়ে দেয়া হবে[হীহ মুসলিম ১৬১১]  
পাশাপাশি বসবাস করার কারণে উভয়ের ভালো-মন্দ এমনকি বহু গোপন বিষয় একে অপরের দৃষ্টিগোচর বা কর্ণগোচর হয়। সকল বিষয় পরস্পরের জন্য আমানতস্বরূপ। আর আমানতের গোপনীয়তা বজায় রাখা একজন মুমিনের মুখ্য বৈশিষ্ট। এবং তার সুফলও সে পাবে, “যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ ঢেকে রাখে আল্লাহ্‌ও কিয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন। [হীহ মুসলিম ২৫৮০]  
একজন প্রকৃত মুসলিম সর্বাবস্থায় নিজ প্রতিবেশীর খেয়াল রাখবে। তার হক আদায় করবে। নিজ কথা ও কর্মের অনিষ্ট থেকে তাকে নিরাপদ রাখবে। যদি তার প্রতিবেশী খারাপ হয় এবং তাকে কষ্ট দেয় তবুও। কারণ, একজন মুমিন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সত্য, ন্যায় এবং মঙ্গলের পথকে আঁকড়ে ধরে থাকে। সর্বদা ভালো আচরণ করে। তার তো স্বভাবই হল “তোমার সাথে যে মন্দ আচরণ করে তুমি তার সাথে ভালো আচরণ করো”। এবং ধৈর্য ও সদাচরণের মাধ্যমে ঐ প্রতিবেশীর অনিষ্টকে প্রতিহত করতে চেষ্টা করবে। যেমনটা আল্‌-কুর্‌আন শিখিয়েছে—“উত্তম আচরণের মাধ্যমে মন্দকে প্রতিহত করো; তাহলে তোমাদের শত্রুতা পরম মিত্রতায় রূপান্তরিত হবে”। [সূরা ফুস্‌সিলাত ৩৪–৩৫] এবং এর ফলস্বরূপ সে আল্লাহ্‌র প্রিয়পাত্র হয়ে উঠবে, “আল্লাহ্‌ তিন ব্যক্তিকে পছন্দ করেনতাদের একজন হল ঐ ব্যক্তি, যার একজন মন্দ প্রতিবেশী রয়েছে। এবং সেই প্রতিবেশী তাকে কষ্ট দেয়। কিন্তু ঐ ব্যক্তি ধৈর্য ধরে এবং আল্লাহর আশীর্বাদ ও করুণা আশা করে”[মুসনাদ আহমাদ ২১৩৪০, মুসতাদরাক হাকিম ২/৮৯, বায়হাকী ৯১০২]
আমার বিশ্বাস, প্রতিবেশী মুসলিম হোক বা-মুসলিম, আত্মীয় হোক বা অনাত্মীয় সবার প্রতি যত্নবান হওয়া একজন মানুষের মানবিক দায়বদ্ধতা এবং একজন মুসলিমের ঈমানি দায়িত্ব। যদি আমরা এই দায়িত্ব পালন করি তাহলেই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা এবং সম্প্রীতি সহমর্মিতার বাতাবরণ তৈরি করা সম্ভব হবে। এবং ‘এক পৃথিবী এক পরিবার’ বাস্তব রূপ লাভ করবে।
[পূবের কলম, ২৩ আগস্ট ২০১৯-এ প্রকাশিত]