Pages

Tuesday, 30 April 2019

বদিউর রহমানঃ তাবিজ


দু’দিন আগে সকালের দিকে একজন রুহুল আমীনের ফোন এল কয়েক বছর থেকে তিনি জাঙ্গিপাড়া কলেজে আরবীর অধ্যাপক কোন এক কালে আমার কাছে এম.. পড়েছেন ঘটনাচক্রে আমার অধীনে পি.এইচ.ডি. করেছেন মূলত: আমার কুশল জানার জন্যই ফোন মাঝে মধ্যেই ফোন করেন, আমার খোঁজ-খবর নেন অথচ আমি মনে করি যে অনেকের মত উনিও জানতে চান যে এখনও বেঁচে-বর্তে আছি কি না  কখনও আক্ষেপ করেন স্বশরীরে সাক্ষাৎ করে আমার খোঁজ নিতে পারছেন না বলে বাস্তবকে আমি অস্বিকার করতে পারি না আমার ব্যস্ততা কম বলে অন্যের ব্যস্ততা বেশি থাকবে না এমন তো নয় আর সব সময় সাক্ষাৎ করে কুশল জানা সম্ভবপর নয় তাই ওসব নিয়ে দুঃখ করার কিছু নেই ফোন করলে গলার স্বরটা প্রাণবন্ত করে জানান দেবার চেষ্টা করি আমি এখনও সজীব ঐ ফোনটা শেষ করার পর দু মিনিটও হয়নি আবার ফোন এল এটা আর একটা রুহুল আমীনের এ ছাত্রটির পি.এইচ.ডি গবেষণা এখনও চলছে; আরবীতে জনৈক্য শিশুসাহিত্যিকের সাহিত্য কর্মের উপর ইনি অবশ্য অন্য এক অধ্যাপকের কাছে গবেষণা করছেন বিষয়বস্তুটা আমারই পছন্দের
তাঁর ফোনটা যেদিন এলো তার মাস খানেক আগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল তাঁর গবেষণাকেন্দ্রিক কয়েকটা প্রশ্ন করেছিলাম কেমন কাজ করছে জানার জন্যে সেদিন তিনি বলেছিলেন জিজ্ঞাস্য অনেকগুলি বিষয়ই ওঁর জানা- তার উপর কিছু লেখার কাজও শুরু করেছেন বাড়ি গিয়ে ফোনে সব উত্তর দেবেন ঐসব প্রশ্ন ইত্যাদির ব্যাপারগুলো আমি ভুলেই গিয়েছিলাম মাস খানেক পর উনি স্মরণ করতে মনে পড়লো খুব গুছিয়ে সুন্দর করে সবকটা কথার উত্তর দিলেন ভালো লাগল আমার অনুমান ছিলো ছাত্রটি স্কুলে শিক্ষকতা করলেও গবেষণাটা সিরিয়াসলি করবে অনুমানটা সত্য হতে চলেছে দেখে তৃপ্তি পেলাম ঐ ফোনটা শেষ করার আগে তাঁকে বললাম-তোমার আগে আর এক রুহুল আমীন ফোন করেছিলেন; দু জনের মধ্যে তফাৎ হলো দুটো; এক: উনি ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়ে গেছেন আর উনি কলেজের অধ্যাপক তুমি এখনও ঐ সম্মানীয় ডিগ্রিটা পাওনি আর দ্বিতীয়ত: ডিগ্রিটা পাওয়ার পর বর্তমান স্কুল ছেড়ে অধ্যাপক হতে হবে ছেলেটা বড়ই ভদ্র বলল- োওয়া করবেন যেন আপনার কথাগুলো বাস্তবায়িত হয় পুনরায় আমি বললাম যে, “কিন্তু পরপর দুই রুহুলের -বলতে পার রুহুল স্কয়ারের- ফোন আসাটা বড় কাকতালীয় বলে মনে হচ্ছে আবার দু’জনায় উত্তর ২৪ পরগনার উত্তরে বললেন-হ্যাঁ স্যর উনাকে চিনি ওঁর বাড়ি বসিরহাটের কাছে”তখন বললাম- বসিরহাটের বিখ্যাত মৌলানা রুহুল আমীন সাহেবকে জান? এমন হতে পারে ওঁর স্মরণে অথবা ভক্তিতে তোমাদের ওদিকে অনেক ছেলের নাম রাখা হয় ঐ নামে। কেননা তিনি ছিলেন বিখ্যাত আলেম ও ধর্মভিরু মানুষ। ফুরফুরার দাদাহুজুরের বিশেষ খলিফা ও লেখা-লেখির জন্য দোওয়া প্রাপ্ত মনিষা পুনশ্চ বললাম- জান তাঁর ব্যাক্তিগত লাইব্রেরীতে প্রচুর মূল্যবান আরবী-ফারসি বই ও ম্যানুস্ক্রিপ্ট ছিল যেগুলির অধিকাংশ তাঁর পড়া। তাছাড়া তিনি চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশটা ধর্মীয় বইও লিখেছেন আর সেই বইগুলোতে যে সমস্ত বিখ্যাত বইয়ের টীকা –পাতার নম্বরসহ- আছে সেই বইগুলো এখনও আমি পড়ে উঠতে পারিনি। মসলা মাসাইল থেকে আরম্ভ করে ফিকহে হানাফির উপর তাঁর প্রচুর লেখালেখি আছে। এমনকি তাবিজের উপরও তাঁর লেখা বই তাবিজাত (ষষ্ঠভাগ) আমার কাছে আছেসেটা অবশ্য আমার কেনা ন- ঐ অধ্যাপক রুহুলের। তাছাড়াও আমার কাছে ‘আমালে কুরআনি’ শিরোনামে আব্দুল আজীজ দেহলাবির একটা বই আছে আর আছে উর্দুতে নাকশে সুলাইমানী ইত্যাদি। উত্তর এল “কিন্তু হাদিসে তো তাবিজ ইত্যাদি বারণ”। বললাম- “হ্যাঁ ঠিকই বলেছ। সৌদি আরব থেকে প্রচুর বই এনেছি তার মধ্যে তাবিজের বিরোধিতায় লেখা বইও আমার কাছে রয়েছে। তাছাড়াও রয়েছে ওখানকার বই ‘হিসনুল মুসলিম মিন আযকারিল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ’[1]  এবং ‘আদ দুআও মিনাল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ’ ও আল’এলাজু বির রুক্বা মিনাল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ[2] আর ‘নেয়ামুল কুর’আনে’ ও ‘নেক আমল’ জাতীয় বইতে বিভিন্ন দোওয়া ও তাবিজের নকশা দেখতে পাই”। ফোনের ওপ্রান্ত থেকে ধর্মভিরু রুহুল বললেন: যে, “স্যর তাবিজ-তালাতে শিরক বিদআতের ভয় থাকে”। বললাম- ঐ জাতীয় তাবিজের লেখাটা লেই বোঝা যা; সেগুলো এ্যাভয়েড করবে। তাবিজের বইয়েতে দেখেছি একটা তাবিজ; তাতে লেখা- “লি খামসাতুন উতফিয়ো বিহা নারায়াবা তারপর হযরত আলী, হাসান, হোসেন, বিবি ফাতেমা ইত্যাদির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। যা নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। ঐ জাতীয় তাবিজ ব্যবহার করবেনা। আর বিভিন্ন সুরার ছক কাটা তাবিজও দেখতে পাবে বিশেষ করে কোর’আন মাজিদেউর্দু তরজমাঐ রকম ছকের তাবিজ করাটাও যুক্তিযুক্ত নয়। তাছাড়া তাবিজ লিখে গলায়, হাতে, কোমরে অথবা শরীরের কোন অংশে স্থায়ীভাবে বেঁধে রাখা ঠিক নয় কেননা মানুষের অপবিত্র অবস্থায় কোর’আনের আয়াত সঙ্গে করে রাখাটা উচিত নয়। তবে আয়াতে কোরআনি পড়ে ফুঁক দিলে, পানি পড়া দিলে বেশ কাজ হতে দেখেছি। আমার মত উন্নাসিক মানুষও অনেক সময় উপকার পাই। বহুদিন আগে পান্ডুয়ায় ফুলের বাগান করতাম। একটা বোগনভেলিয়ার ঝোপ ট্রিম করতে হেঁসো চালাতেই ঐ গাছের ভেতরের দিকের বোলতার বাসা থেকে একটা বোলতা আমার হাতে কামড় দেয়। সাংঘাতিক যন্ত্রণা শুরু হল। মনে পড়ে গেল: ‘ইযা বাতাশতুম বাতাশতুম জাব্বারীন’। সাতবার এক নিঃশ্বাসে পড়তে পড়তে একটা আঙ্গুল চক্রকারে কামড়ান জায়গাটায় ঘোরালাম। জালা যন্ত্রণা চলে গেল। অনেকবার আমার নিজের গলায় মাছের কাঁটা আটকে গেলে ‘ওয়া ইযা বালাগাতিল হুলকূম... পড়েছি। সত্বর কাঁটা নেমে গেছে। আমার সঙ্গে বসে খাওয়ার সময় কারও সে রকম হলেও ঐ আয়াত পড়ে কাজ হয়েছে। সাপকে আমি ভীষণ ভয় করি; তার জন্যও দুয়া পড়ি। সাপের দংশন থেকে নিস্তার পেতে, অন্যান্য হিংস্র প্রাণীর আক্রমণ থেকে বাঁচতে বিশেষত রাস্তার কুকুরদের ভয়ে দোওয়া পড়ে দেখেছি কাজ হয়বাচ্চারা আঁতকে কেঁদে উঠলে সুরা ফাতিহা পড়ে ফুঁক দিয়ে দেখেছি বেশ কাজ হয়। ব্যাথা বেদনা, মাথা ব্যাথার জন্য কিছু আয়াত পড়ে দিলেও কাজ হয়। তবে বিয়ের পর থেকে এখনও পড়ে চলেছি স্ত্রীকে বশিকরণ করতে বিভিন্ন দোওয়াকেন জানি না কাজ হলনা। বরং উলটো অ্যকশন হচ্ছে”ওদিক থেকে ছাত্রের স্বলজ্জ হাসির মৃদু আওয়াজ পেলাম। বললাম- রুহুল “তাবিজ দেওয়া শুরু কর; প্রচুর ইনকামও বলল: ‘না স্যর ওটা আমার নীতি বিরুদ্ধ। আমার পয়সার দরকার নেই’। বললাম: সে কী? আমি তাবড় কট্টর তাবিজ বিরোধি অনেক কাসেমী, সাহারানপুরী মৌলানাকে দেখেছি তাঁরা জীবনের শুরুর দিকে তাবিজ ইত্যাদির বিরোধিতা করতেন, পরে দেখেছি তাঁরা সব কিছুই করতছেকথায় কথায় বলেন জ্বীনের আসর হয়েছে। অতএব অনেক টাকার ধাক্কা। বহু খানকা বা পীরের দরগায় গিয়ে দেখেছি তাবিজের জন্য হাপিত্যেশ করে অনেককে বসে থাকতে। একবার একটা ছাউনির নিচে দেখি একজন মাদ্রাসার ছাত্র একই তাবিজ কাগজের পর কাগজে লিখে চলেছে। জিজ্ঞেস করলাম- ‘তা একই জিনিস লিখে অত জমা করছ কেন’? বলল- “হুজুরের আদেশএগুলোতে উনি একবার ফুঁক দিয়ে বিভিন্ন জনকে দেবেন”। আজকাল তাবিজ নাবেশির লোক দিয়ে লিখিয়ে পারিশ্রমিক দেওয়ার দিন শেষ করেছে জেরক্স মেশিন। জেরক্স করা তাবিজও আমার নজরে রসেছে। কদিন আগে খোদ কলকাতায় এক নতুন জিনিস দেখলাম। একটা ছোট্ট দোকানঘর। কিছু সামগ্রী সাজান। সেগুলো বিক্রির জন্য নয়, লোক দেখানোর জন্য। টুপি দাড়িতে দোকানদারের আসল কাজ তাবিজ দেওয়া দোকানের ভিতর বেশ কিছু মহিলা তাবিজের জন্য অপেক্ষা করছেন দোকানদার টেলিফোনে কারও সমস্যার কথা শুনছেন কিছুক্ষণ পর পর দেখলাম বিড় বিড় করে কিছু পড়ে ফোনেতেই ফুঁক দিয়ে দিচ্ছেন আমি অবাক কী বিচিত্র এই দেশ কী বিচিত্র মনুষ্যপ্রাণী’ “তা রুহুল, শিক্ষকতার পাশাপাশি শুরু করে দাও এই কারবার। এ কারবারে ইনকাম ট্যাক্স নেই, সেলস ট্যাক্স নেই, নেই জি.এস.টি.ওপার থেকে রুহুলের হাসি। বললাম- বিশ্বাস করলেনা’? বলল- ‘না তা নয়; তবেবললাম- তাহলে শোন। গতকাল গিয়েছিলাম এক ইংরেজির অধ্যাপকের সঙ্গে দেখা করতে। তাঁর কাছে বসলে ইংরেজি সাহিত্যের তারক সেন, গৌরীবাবু, দিপ্যেন্দ চক্রবর্তী, জ্যোতিভট্টাচার্য, অরুন দাশগুপ্ত, কালিদাস বোস, ভবতোষ চ্যাটার্জি, অমল ভট্টাচার্য প্রমুখ বিভিন্ন অধ্যাপকের ইংরেজি সাহিত্যের পঠন-পাঠন নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা শুনি। আর আমি হই ঋব্ধ। হয়ত কখনো অনুবাদে ফরাসি ছোটগল্প শুনিয়ে দিলেন কখনও হয়ত মপাসাঁ কখনো হয়ত গ্রীক ট্রাজেডি ও সেক্সপিয়ারের তুলনা করে কিছু বললেন। দুবার তিনবার চলে চা। দীর্ঘক্ষণ পরে বের হওয়ার সময় ওঁর বাড়ির জানালা দরজায় লটকানো তাবিজগুলো দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম: ‘এগুলো?’ ইশারায় বললেন- “ওসব তাঁর স্ত্রীর ব্যাপার প্রচন্ড বাতিকগ্রস্ত”। বললেন- “অপনার পরিচিত এক পীরের কাছে উনি প্রায়ই যান আর ঐগুলো তাঁর কাছ থেকে নিয়ে এসে ঘরের বিভিন্ন জায়গায় লটকে দেন। যেখানে যান সেখানে ঐ পীর সাহেবদের বংশের অন্যান্য পীরজাদারাও পাশাপাশি ঘরে বসেন। একবার কী হয়েছে আমার স্ত্রী সেখানে গিয়ে দেখেন ওর পীর তখন ঘরে নেই; তাই ও তাঁর ঘরে বসে অপেক্ষা করছিল। দেখেকি অন্য ঘর থেকে আর একজন পীরজাদা ওকে ডাকছেন সেখানে যেতে। অর্থাৎ খদ্দের ভাঙানো আর কী” তারপর বললেন- “এই দেখুন এই ‘সোলেমানী তাবিজে’-র বাংলা বইটা কিনে সারা দিন পড়ছে। মাথাটা না খারাপ হয়”। তারপর বললেন- “এই বইয়ের এই তাবিজটা পড়ুন”। দেখি স্ত্রী সঙ্গমে দীর্ঘক্ষণ বীর্য ধারণ করার তাবিজ। বললেন: “তাবিজের নামে এই সব! অবশ্য তাবিজের ব্যবসাটা চলছে ভাল। পাশের মসজিদের এক ইমাম সাহেবের কথা বললেন। ইমামতি করে চার-পাঁচ হাজার টাকা মাইনে পান। তিনি এক একটা তাবিজ দেন কমপক্ষে তিন, চার হাজার টাকায়। সারা দিনে আট, দশটা তাবিজ তো দেনই। তা হলে হিসেব করে বলুন তো ওঁর প্রতিদিন কত টাকা ইনকাম! বিশ্বাস করুন একটা ফ্লাট কিনেছেন দেখলে তাজ্জব হয়ে যাবেন”।
বললাম আমি আপনার কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করি। ওদের মত মানুষের কাছে প্রচুর টাকা কিন্তু সব-ই ক্যাশে। হুয়াইট মানি বলতে ট্যাক্স দেওয়া টাকা ওঁদের নেই। আজ থেকে বছর কুড়ি পূর্বে ইলিয়ট রোডের বাটা মোড়ের বাড়িটার মালিকের কাছে গল্প করছিলাম। চা শেষ করে চলে আসতে চাইলে উনি বললেন- “কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন আঠারো বিশ বছরের ক্ষুদে পীর সাহেব আসবেন। যিনি একজন স্বনামধন্য পীর সাহেবের নাতি। আসছেন আমার এই বিল্ডিং-এ একটা ফ্লাট কিনবেন বলে। আপনি তো জানেন আমি বাইশ করে বিক্রি করছি। আমার  ডাক্তার জামাইবাবু আবার ওনাদের বিশেষ ভক্ত। তাই ডাক্তার ভাইয়ের মধ্যস্থতার কারণে একুশে দিতে হচ্ছে”কথার মাঝেই ওনারা কয়েকজন হাজির হলেন। প্রথমে কোল্ড ড্রিঙ্কস দিয়ে আপ্যায়ন করা হল। তারপর এল নাস্তাখেতে খেতে ফ্লাটের ব্যাপারে কথা হল। ছোট্ট পীর সাহেব বললেন আরও পঞ্চাশ হাজার কমাতেবাড়ির মালিক তাঁদের সম্মান রক্ষার্থে তাতেই রাজি হলেন। তাঁরা দশ লাখ টাকা ক্যাশ দিয়ে তখনই বানা করতে চাইলেন। বিল্ডিং মালিক বললেন- আমি বাড়িটা হুয়াইট মানিতে করেছি। আমাকে চেকে পেমেন্ট করতে হবে। তখন পীর সাহেবের নাতি সেভাবে টাকা দিতে অপার বলে জানালেন আর জানালেন ক্যাশে টাকা নিন তাতে না হয় দু লাখ আরও দিয়ে দেবেন। বিল্ডিং মালিক শুধু চেকেই টাকা নেবেন বলে শেষ কথা বলে দিতে তাঁর আর ফ্লাট কিনতে পারেননি।
পীর সাহেবদের টাকার অভাব নেই। দু’ তিন বছর পূর্বে একজন স্যানেটারী কম্পানির হেড প্লামবার আমাকে বলল- “আপনাদের জাতের এক পীর সাহেবের বাড়িতে তাঁদের এক ছেলের বিয়ে উপলক্ষে মনের মত বাথরুম সাজিয়ে দিয়ে এলাম। খরচ পড়ল আঠারো লক্ষ”আমি তাজ্জব।
বিলাসবহুল ওরকম বাথরুম ওনাদের হবে নাই বা কেন! ওঁদের কাছে টাকা উড়তে উড়তে পৌঁছে যায়। ভক্তিভরে লোকেরা ওঁদের মুঠো মুঠো টাকা দিয়ে ধন্য ন। ওনারা তো কারও কাছে ভিক্ষা চাননা। মানুষজন ভক্তিভরে নজরানা পেশ করেন মাত্র। তবে ওনারাও প্রতিদানে দেন দোওয়া যা থেকে ভক্তের প্রাণে আসে প্রশান্তি। এক ভেড়ির মালিক তাবিজ ও পানিপড়া নিচ্ছেন। পনেরো হাজারে কথা হয়েছে। পানিতে ফুঁক দেওয়ার সময় জানতে চাওয়া হল জলকর কতটা। উত্তর শুনে রেটটা বেড়ে দাড়ালো পঁচিশ হাজার। এই গল্পটা শুনাচ্ছিলাম আর এক জন পীর সাহেবকে। উনি বললেন- “আমার কাছে পাঠাবেন, দশে কাজ করে দেব”।
রুহুলকে বললাম ‘উপায় করতে শেখ আর শেখ বিদ্যাটার মার্কেটিং করতে’আবশ্য আমি ব্যক্তিগতভাবে আয়াত পড়ে ফুঁক দেওয়ার পক্ষপাতি কিন্তু তাবিজ লিখে শরীরে বাঁধার পক্ষপাতি নই। সেই রকমই আয়াতুল কুরসী কী অন্য সুরা লিখে বাড়িতে-গাড়িতে ঝুলিয়ে রাখারও পক্ষপাতি নই। আজকাল তো বিভিন্ন সুরা লেখা হারের লকেটও পাওয়া যায়। আমার বক্তব্য হল ঐগুলো ঝুলিয়ে লাভ হয় না ঐ আয়াতগুলো প্রতিদিন পাঠ করতে হয় তা না হলে আমার সঙ্গে যা হয়েছিল সেটা বলে নিই।
গাড়িতে ঝুলানোর জন্য ঐ রকম কয়েকটা সুরা লেখা রেপলিকা কিনেছিলাম বন্ধুদের গিফট করার জন্যকা’বা শরীফের ছবিওয়ালা সেই রকম craft কিনেছিলাম আমার গাড়িতে লাগাতে। বহুদিন অব্যবহৃত হয়ে সেগুলো বাড়িতেই পড়ে ছিল। আসলে সেগুলোর কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। হঠাৎ একদিন সেগুলো আমার স্ত্রীর নজরে পড়ে। আমাকে কা’বা শরীফের রেপলিকাটা গাড়িতে ঝুলিয়ে দিতে বলে। আমি চেষ্টা করেছিলাম গাড়ির ড্যাসবোর্ডের উপরে আয়নায় ঝুলিয়ে দিতে। ঝোলানোর দড়িটার ফাঁসটা ছোট হওয়ায় আমি আয়নায় ঝোলাতে পারিনি। সেটা ড্যাসবোর্ডের উপরে রাখা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়ার সময় দেখি আমাদের দারোয়ান সকালে গাড়ি ধোওয়ার সময় কায়দা করে সেটা আয়নার কাছে ঝুলিয়ে দিয়েছে। সন্ধ্যায় ফেরার সময় গ্যারাজে দারোয়ান উপস্থিত ছিল। গাড়ি থেকে নামার সময় আমার মুখ দিয়ে ‘আল্লাহ’ শব্দটা বের হয়। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দারোয়ানকে রসিকতা করার জন্য বললাম: ‘আল্লাহ’ কী জান? উত্তরে বল: “আপনার গাড়িতে তো ঝুলিয়ে দিয়েছি”। নাউযুবিল্লাহ, আমি হতভম্ব। তাকে বুঝিয়ে বলতে সেও আল্লার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করল।
তাই আমার বিশ্বাস দোওয়া দরুদ ঝোলানোর জন্য নয়। সেগুলো পাঠ করার মধ্যে উপকার নিহিত। ট্রেন, বাস, গাড়িতে সফরের দোওয়া; বাড়িতে বের হওয়া ও ঢোকার দোওয়া, শোওয়ার দোওয়া, খাওয়ার দোওয়া, স্মরণ শক্তি বৃদ্ধির দোওয়া ও আরও বিভিন্ন দোওয়ার বরকতে আমার জীবনের চলার পথ সুগম হয়েছে। যেদিন সেগুলো পড়তে ভুলে গেছি কিছু না কিছু অনর্থ হয়েছে। সহজ সরল দোওয়াগুলো শিখে নিয়ে পড়তে থাকুন, ভাল থাকবেন। শান্তি পাবেন যেটা ইদানিং বড়ই দুর্লভ।

   



[1]- রচনাসাইদ বিন আলি আল ক্বাহতানী বাংলা অনুবাদ: মোঃ এনামুল হক সৌদি আরব
[2]- একই রচনাকারির লেখা। দোওয়া করার নিয়মাবলি থেকে জিনের তদবীরও দেওয়া আছে।

Friday, 26 April 2019

আব্দুল মাতিন ওয়াসিমঃ সহযাত্রী


সহযাত্রী
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

হঠাৎ করে চারিদিকে “আগুন... আগুন... আগুন” শব্দ হতে লাগল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগুনের শিখা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল পুরো বাসেহুড়মুড়িয়ে একে একে সবাই নেমে পড়ল বাস থেকেনিমেষের মধ্যেদাউ দাউ করে জ্বলতে লাগল বাসটা। মুহূর্তেই আগুন সম্পূর্ণ বাসটাকে গ্রাস করে নিল লেলিহান শিখার সাথে কুণ্ডুলি পাকিয়ে উপরে উঠতে লাগলো নিকষ কালো ধোঁয়া। সবাই নেমে পড়লেও তখনো ভেতরে আটকে বাসের হেল্পার রমেশ।

অন্যদিকে, বাসের ড্রাইভার সেলিম এক লাফে বেরিয়ে পড়েছে বাস থেকে। বেরিয়ে ছোটাছুটি করছে সে টেনেহিঁচড়ে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সবাইকে। সেই সাথে, সমান তালে তার চোখ দুটো খুঁজছে রমেশকে। তাকে বাইরে কোথাও দেখতে না পেয়ে বাসের দরজার কাছে ছুটে গিয়ে চিৎকার করতে লাগল— বেরিয়ে আয় রমেশ, বেরিয়ে আয় ভাই
ভেতর থেকে রমেশ বলে উঠল— দাদা আর একটু
বাসটি ততক্ষণে অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে...। 

দু’ মিনিটের মাথায় বেরিয়ে এল রমেশ ততক্ষণে ঝলসে গেছে তার অর্ধেক শরীরস্থিরভাবে দাঁড়াতে পারছেনা সেতবুও শক্ত হাতে বুকে আগলে রেখেছে বাসের ক্যাবিনে রাখা শিব কাবার ছবি দুটো। দেখে সেলিম বললকী দরকার ছিল এত ঝুঁকি নেওয়ার!

রমেশ বলতে লাগলদাদা, দু’টো টাকা রোজগারের জন্য, নিজের, পরিবারের, পাড়াপড়শি, সবার ভালো চেয়ে রোজ সকালে শিবের চরণে দুটো ফুল দিয়ে প্রার্থনা করিতুমিও তো করো; রোজ সবার মঙ্গল চেয়ে নিরাপদ ড্রাইভের জন্য ওই ছবিটার দিকে তাকিয়ে নীচে বাংলা হরফে লেখা “সুব্‌হানাল্লাযি সাখ্‌খারা লানা...” পড়তে পড়তে গাড়িটা স্টার্ট করো। তাহলে কীভাবে এগুলোকে ভেতরে ফেলে আসি বলো!

তার কথা শুনে সেলিম ছলছল চোখে আকাশের দিকে তাকালো হাত দু’টো তার আপনা থেকেই উঠল মোনাজাতের জন্য। কাতর স্বরে ভিক্ষা চাইলইয়া আল্লাহ্‌, তুমি আমার রমেশকে রক্ষা করো!

পার্কসার্কাস, কোলকাতা
২৮-০৩-২০১৮ 

নাজিব মাহফুযঃ বন্দীর উর্দি



বন্দীর উর্দি
মূল- নাজিব মাহফুয, মিশর
অনুবাদ- আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

[নাজিব মাহ্‌ফুয (১৯১১ – ২০০৬)। কায়রোএকটি ধার্মিক পরিবারে জন্ম। অংক ও বিজ্ঞান নিয়ে লেখাপড়া শুরু হলেও স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন দর্শন নিয়ে কর্মজীবনে বহু গুরুত্বপূর্ণ উচ্চতর পদ অলঙ্কৃত করে ১৯৭১ সালে অবসর নেন। লেখালেখি শুরু করেন ছাত্রজীবনে তিনের দশকের মাঝামাঝিতে। প্রথম উপন্যাস আবাসুল্‌ আক্বদার (নিয়তির নিষ্ফলতা) প্রকাশিত হয় ১৯৩৯ সালে। তাঁর উপন্যাসের সংখ্যা ৩৫, ছোটগল্প ২২৩টি এবং ছোটগল্পের সংকলন ১৯টি। এছাড়া রয়েছে একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ, ৭টি নাটক, ২৬টি চিত্রনাট্য এবং অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ। তাঁর উপন্যাস এবং গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে ৩০টিরও অধিক। অসামান্য সাহিত্যকৃতির জন্য বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। এমনকি ১৯৮৮ সালে তাঁকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয় তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি 'সুলাসিয়্যাতুল-ক্বাহেরাহ্‌’ (কায়রো ট্রিলজি বা কায়রো তিনগ্রন্থি, ১৯৫৬-৫৭তে প্রকাশিত)-এর জন্য তবে মৌলবাদীদের হাত থেকে তিনিও নিস্তার পাননি ১৯৯৪ সালে, বিরাশি বছর বয়সে, কায়রো শহরে নিজ বাড়ির কাছেই আক্রন্ত হন তিনি। প্রাণে বেঁচে গেলেও ঐ আক্রমণের ফলে জখম হয় তাঁর ডান হাতের স্নায়ুএকটানা কয়েক মিনিটের বেশি আর লিখতে পারেতেন না অবশেষে ২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট কায়রোতে মৃত্যু হয় তাঁর] 

যাকাযিক স্টেশনে ট্রেনের সময় হয়ে গেছে জাহ্‌শা সিগারেটের বাক্সটা গুছিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে প্রস্তুত হতে লাগল ট্রেন এসে দাঁড়াতেই স্টেশনটা ভোল পাল্টে আস্ত একটা বাজারে পরিণত হ মানুষ এধার-ওধার ঘোরাফেরা করে এটা-সেটা কিনতে লাগলো ট্রেন এসে যখন প্লাটফর্মে দাঁড়াল, ছোট্ট জাহ্‌শা তাঁর ক্ষুদে অথচ অভিজ্ঞ চোখে খদ্দের খুঁজতে আরম্ভ করল

সিগারেট বেচতে তার একদম ভালো লাগে না তাই কেউ তার পেশা জানতে চাইলে, ভীষণ মন খারাপ করে উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে প্রশ্নকর্তাকেই অভিশাপ দেয় তারপর অভিশাপ দেয় নিজের কপালকে। আর মনে মনে ভাবে, যদি ইচ্ছেমতো চাকরি করার স্বাধীনতা থাকতো, তাহলে সে নিশ্চয়ই কোনো ধনী লোকের গাড়ি চালাতো তাতে সে পেতো চকচকে, পরিষ্কার জামাকাপড়, অভিজাত লোকেদের মত রকমারি খাবার। কী শীত, কী গ্রীষ্ম ঘুরতে যেত নানা জায়গায়! দু’মুঠো খাবার জোগাড় করতে এত ঝক্কি পোহাতে হত না তাকে ধুর! এই জীবনে না আছে শান্তি, না আছে কোনো আনন্দ! 

কোনো এক আমলার গাড়ি চালায় ড্রাইভার আলগুর ক’দিন আগে বিপুল আত্মবিশ্বাস নিয়ে তল্লাটের সবচেয়ে সুন্দরী যুবতী নুব্‌ওয়ার কাছে সে প্রেম নিবেদন করছিল আর হাত নেড়ে নেড়ে বলছিল— ‘নুব্‌ওয়া, খোদার কসম, তোমার জন্য শিগগিরি একটি আংটি নিয়ে আসবো আমি নিজে হাতে তোমার আঙুলে সেটা পরিয়ে দেব’ নুব্‌ওয়া লজ্জা পেয়েছিলো, ভুবন ভোলানো হাসি হেসে ওড়নাতে মুখ ঢেকেছিলো। আর তার ঘন-কালো চুল হাওয়ায় দোল খাচ্ছিলো। সে-দিন জাহ্‌শা সেখানেই ছিলো; তাদের আশেপাশেই কোথাও সে দেখে ফেলেছিল তাদের এই প্রেমের দৃশ্য নুব্‌ওয়ার সেই হাসি যেন তীর হয়ে বিঁধেছিল জাহ্‌শার বুকে। ওর বড় বড় চোখের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত রকমের যন্ত্রণা হচ্ছিল বুকের ভেতর আর আলগুরের ভাগ্য দেখে ভীষণ হিংসা হচ্ছিলো  

সে-দিন থেকে জাহ্‌শাও নুব্‌ওয়ার পেছন পেছন ঘুরতে আরম্ভ করলো নুব্‌ওয়া যে-পথে চলাফেরা করে, সিগারেটের বাক্সটা নিয়ে সারাদিন সে-পথেই বসে থাকে জাহ্‌শা তৃষ্ণার্ত চোখে এদিক ওদিক খুঁজে বেড়ায় হঠাৎ একদিন নুব্‌ওয়াকে একাকী পেয়ে আলগুরের মতো করে বলে উঠলো- 'নুব্‌ওয়া, আমি তোমার জন্য আংটি নিয়ে আসব একদিন!' কিন্তু তার কথা শুনে নুব্‌ওয়া লজ্জায় ওড়না দিয়ে মুখ না-ঢেকে তার দিকে এক নজর তাকালো এবং অবজ্ঞার স্বরে বললো— আগে নিজের জন্য একপাটি ভালো জুতো কেনো।” 

কথাটা শুনে নিজের পায়ের দিকে তাকালো জাহশা পায়ে এত পুরু হয়ে ময়লা জমে আছে, মনে হচ্ছে যেন দু’ পায়ে উটের চামড়ার খসখসে মোজা পরে আছে তার উপর জুতোর অর্ধেকটা ক্ষয় হয়ে গেছে কাপড় নোংরা মলিন মুখ,  টুপিটা ছেঁড়া এবং পুরাতন। দীর্ঘশ্বাসের সাথে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো— ‘হায় পোড়া কপাল আমার!’তারপর সিগারেটের বাক্সটা আঁকড়ে ধরে মনে মনে ভাবতে লাগল— ‘ইস্‌ যদি আলগুরের মতো ড্রাইভার হতে পারতাম! কিন্তু চাইলেই কি সব পাওয়া যায়? গরিবের স্বপ্ন তো স্বপ্নই থাকে!’ অতঃপর নিজের কল্পনা, স্বপ্ন ও হতাশাকে সেই ছেঁড়া পকেটে পুরে ফিরে এলো বাস্তবের মাটিতে অপেক্ষা করতে লাগলো ট্রেনের।

অনেক দূরে দেখা দিল একটা ধোঁয়াটে আকৃতির কিছু ক্রমশ নিকটে আসছে...; ট্রেন আসছে! ধীরে ধীরে বগিগুলো স্পষ্ট হতে লাগলো একসময় কর্কশ ও বিকট শব্দ তুলে ট্রেনটা প্লাটফর্মে এসে থামলো। জাহ্‌শা সিগারেটের বাক্সটা নিয়ে দৌড়ে গেলো বগির কাছে দেখে অবাক, সবক’টা দরজার সামনে একজন করে সশস্ত্র সিপাহী পাহারা দিচ্ছে জানালা দিয়ে উঁকি মারছে ভিনদেশী কিছু চেহারা আর উদ্বিগ্ন ক'জোড়া চোখ। কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলো, এরা সবাই যুদ্ধবন্দী ইতালীয় সৈনিক এদেরকে এখন কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে

জাহ্‌শা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ বন্দী সৈনিকদের মলিন-বিবর্ণ মুখগুলো দেখে বুঝতে পারল, এরা সবাই মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হতাশাগ্রস্থ এদের কেউই সিগারেট কিনবে না; এদের কারো কাছে কেনার মত পয়সাও নেই। তবুও, সিগারেটের বাক্সটা উঁচু করে এ-বগি থেকে সে-বগি ঘুরে এলো কয়েকবার যদি তাদের কেউ কিছু কেনে; কিন্তু তারা সবাই নিজেদের মধ্যে গল্প করতে ব্যস্ত ছিলো কয়েকজন বন্দী ছাড়া আর কেউ তার দিকে তাকায়নি ঐ ক'জন ক্ষুধার্ত চোখে তাকিয়ে ছিলো ওর হাতের দিকে; যেন বাক্সসুদ্ধ গিলে খাবে। বিরক্ত হয়ে যখন সে ফিরে যেতে লাগল পেছন থেকে শুনতে পেল এক বন্দীর কণ্ঠ, ভাঙাচোরা আরবি টানে— “সাজায়ের (সিগারেট)”!   

জাহ্‌শা অবাক হয়ে, সন্দেহভরা চোখে তাকালো তার দিকে তারপর বৃদ্ধা ও তর্জনীর মাধ্যমে ইঙ্গিত করল— পয়সা? বন্দী বুঝতে পেরে মাথা নেড়ে জানালো— পয়সা আছে। জাহ্‌শা এগিয়ে গেল জানালার কাছে গিয়ে নিরাপদ দুরত্বে দাঁড়ালো যাতে কোনো বন্দী ছোঁ মেরে সিগারেট নিতে না পারে ইতালয় সৈনিকটি শান্তভাবে গায়ের জ্যাকেটটা খুলে এগিয়ে দিল জাহশার দিকে— এই নাও পয়সা।  

জাহ্‌শা অবাক লাগল। ব্যাপারটা অমন হবে সে আশা করেনি। লোভাতুর দৃষ্টিতে জ্যাকেটটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। খাকি রঙের একটা পোশাক। তাতে সোনালি রঙের বড় বড় গোল গোল বোতাম লাগানো বেশ ভালো লাগল তার। কিন্তু বন্দীকে তা বুঝতে দিল না পাছে ঠকিয়ে নেয় 'নিতান্ত সাধারণ একটা জিনিস' এরকম ভাব দেখিয়ে সিগারেটের একটা প্যাকেট বের করে জ্যাকেটটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়াল সৈনিক ভ্রু কুঁচকে চেঁচিয়ে উঠল— মাত্র এক প্যাকেট! না না, দশ প্যাকেট চাই, দশ প্যাকেট সিগারেট জাহ্‌শা মাথা নেড়ে পিছিয়ে এলো। সৈনিক সুর নরম করে— আচ্ছা, নয় প্যাকেট!
জাহ্‌শা নির্বিকার, বেপরোয়া হয়ে অন্যদিকে হাঁটা দিল।
—আরে দাঁড়াও, আট প্যাকেট দাও!
জাহ্‌শা মাথা নেড়ে জানালো, ‘হবে না’   
—তাহলে সাত প্যাকেট দাও।

জাহ্‌শা আবারও পূর্বের মতো না-সূচক ভঙ্গীতে মাথা নেড়ে বগির কাছ থেকে সরে এলো। সৈনিক এবার নেমে এলো ছ’য়ে। প্লাটফর্মের দিকে যেতে যেতে সৈনিক নেমে এলো পাঁচে হাত নেড়ে ‘হবে না’ জানিয়ে টুলটার উপরে বসার উপক্রম করেছে, ততক্ষণে সৈনিক চারে। কিন্তু জাহ্‌শা এমন ভান করল যেন শুনতেই পায়নি তার কথা। টুলের উপর বসে মেজাজে একটা সিগারেট ধরালো তারপর একটা লম্বা সুখটান দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে তাকে দেখিয়ে ধীরে ধীরে ধোঁয়া ছাড়তে লাগল। এবার সৈনিকের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে অস্থির হয়ে উঠল ছটফট করতে লাগল বগির ভেতর। সিগারেট না পেলে যেন মারা যাবে এবার সে কাকুতি-মিনতি করতে আরম্ভ করল— এই যে ভাই, এই, তিন প্যাকেট দিলেই জ্যাকেট তোমার!

জাহ্‌শা তখনো নির্বিকার। এমন ভাব দেখাল যেন জ্যাকেটের প্রতি তার কোনো আগ্রহ নেই সিগারেটের সুখটানই যেন তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। অবশেষে বন্দী-সৈনিক পরাজিত কণ্ঠে দুপ্যাকেটের দাবী জানালো এবার জাহ্‌শা অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটু নড়ে উঠল। সৈনিক জ্যাকেটটা বাড়িয়ে দিয়ে হাত পাতলো অস্থিরভাবে—এবার তো দাও।

জাহ্‌শা বগির কাছে গিয়ে দু’প্যাকেট সিগারেট সৈনিকের হাতে ধরিয়ে দিল তারপর জ্যাকেটটা বগলদাবা করে ফিরে এলো প্লাটফর্মে তখন তার চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে বিজয়ের আনন্দঠোঁটে মৃদু হাসি। সিগারেটের বাক্সটা টুলের ওপর রেখে পরে নিল জ্যাকেটটা। একটু বড়, ঢিলেঢালা। তাতে কিছু যায় আসে না। দু’প্যাকেট সিগারেটের বদলে অমন একখানা জিনিস পেয়েছে— কে বিশ্বাস করবে সে কথা! এবার বাক্সটা কাঁধে ঝুলিয়ে, বুক চিতিয়ে হাঁটতে আরম্ভ করলো। চোখের সামনে তখন সুন্দরী নুব্‌ওয়ার চেহারা ভাসছে আর মনের ভেতরে আত্মবিশ্বাসের স্বরএবার আর নুব্‌ওয়া আমাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না আমার জামাকাপড় নিয়ে হাসাহাসিও করতে পারবে না। এমন জিনিস কি আছে আলগুরের কাছে? ছ্যাঃ, এমন জ্যাকেট ওর চোদ্দগুষ্টিও দ্যাখেনি!   

‘ওহ হো’— জাহ্‌শার হঠাৎ মনে পড়ে গেল— আলগুর হতভাগাটা তো জ্যাকেটের সাথে প্যান্টও পরেছিল। এবার ভাবতে লাগল,একটা প্যান্ট কীভাবে জোগাড় করি?’ জ্যাকেট পেয়ে যে আনন্দ হয়েছিল তার পুরোটা ততক্ষণে উধাও হয়ে গেছে মন-মস্তিষ্কজুড়ে তখন শুধু প্যান্টের চিন্তা। হঠাৎ ওর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলল চোখে-মুখে ফুটে উঠলো এক অদ্ভুত হাসি। ট্রেনের বন্দীদের ওপর নজর বুলাতে লাগলো। তারপর ট্রেনের কাছে গিয়ে জোরে জোরে চিৎকার করল— সিগারেট, সিগারেট, পয়সা না থাকলে প্যান্ট দিলেও চলবে! সিগারেট, সিগারেট, প্যান্টের বদলে সিগারেট!  

কয়েকবার আওয়াজ দেওয়ার পর যখন কোনো সাড়া মিলল না জাহ্‌শার মনে হল, হয়তো বন্দীরা ওর কথা বুঝতে পারছে না। একটু ভেবে, সিগারেট এবং পরনের জ্যাকেটটার দিকে ইশারা করে আওয়াজ দিল এরকম সাংকেতিক বিজ্ঞাপনের সুফলও মিলল তাড়াতাড়ি। এক সৈনিক লাফাতে লাফাতে জ্যাকেট খুলতে লাগল। জাহ্‌শা আঙুল দিয়ে দেখাল— জ্যাকেট না, ও প্যান্ট চায় লোকটা বিরক্ত হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো তার দিকে। অবজ্ঞার ভঙ্গিতে ঘাড় নেড়ে, শেষে প্যান্ট খুলে ধরিয়ে দিল তার হাতে।  

আর কী চাই তার! খুশিতে নাচলো কিছুক্ষণ তারপর প্লাটফর্মে নিজের জায়গায় ফিরে মুহূর্তের মধ্যে পরে নিল প্যান্টটা এবার দেখতে পুরো ইতালীয় সৈনিকদের মতো লাগছে ভাবতে লাগল, ‘আর কী নেওয়া যায়? টুপি...? কিন্তু, এরা তো কেউই ফেজ টুপি পরে নেই সবার মাথা খালি। অবশ্য সবার পায়ে জুতো তাহলে..., জুতো? আলগুর হারামজাদাকে হারিয়ে বাজিমাত করতে হলে এক জোড়া জুতো দরকার! আবার সে সিগারেটের বাক্সটা হাতে নিয়ে বগির কাছে গিয়ে চেঁচাতে লাগল, সাথে পায়ের দিকে ইঙ্গিত করতে থাকল—সিগারেট, জুতোর বদলে সিগারেট, চাই কারো জুতোর বদলে সিগারেট! 
   
কিন্তু নতুন কোনো খদ্দের পাবার আগেই কর্কশ শব্দে হর্ন বেজে উঠল সময় হয়ে গেছে, এখনই ট্রেন ছেড়ে দেবে। বন্দীসৈনিকরাও গল্প ছেড়ে সজাগ হল। ততক্ষণে চারিদিকে আঁধার হয়ে এসেছে। আকাশে পাখির ঝাঁক কিচিরমিচির করছে; বাড়ি ফিরছে সবাই স্টেশন চত্বরে আকাশটা ধীরে ধীরে ডুবে যেতে লাগল অন্ধকারের গহ্বরে। ঠিক তেমনই জাহশার মনের আকাশ হতাশার এক খণ্ড মেঘে আচ্ছন্ন হতে লাগল। মন খারাপ করে সে দাঁড়িয়ে রইল প্লাটফর্মে ওর আর জুতো পাওয়া হল না। ট্রেন চলতে শুরু করেছে, হঠাৎ সামনের বগির পাহারাদার সিপাহীর নজর পড়ল জাহশার উপর সে রেগেমেগে প্রথমে ইংরেজিতে তারপর ইতালীয় ভাষায় খিস্তি করে বলল — এই শালা, ট্রেনে ওঠ! তাড়াতাড়ি ওঠ বলছি!

জাহ্‌শা বুঝতে পারলো না সিপাহী কী বলছে ও তখন সিপাহীর নাগালের বাইরে দাঁড়িয়ে সিপাহী চাইলেও ধরতে পারবে না তাকে তাই মন থেকে হতাশা ঝেড়ে ফেলতে সিপাহীর অঙ্গভঙ্গি নকল করে মুখ ভ্যাংচালো। ওদিকে, ট্রেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিলো; আরও দূরে... সিপাহী রেগেমেগে এবার আরও জোরে চিৎকার করল— হারামজাদা ট্রেনে ওঠ, নইলে খবর আছে তোর, বলে দিলাম!

জাহ্‌শা ঠোঁট উল্টে আরেকবার মুখ ভ্যাংচালো তারপর ট্রেনের দিকে পিঠ করে হাঁটতে লাগল নিজ গন্তব্যের দিকে সঙ্গে সঙ্গে সিপাহীটি বন্দুক তুলে গুলি করল ওর পিঠে। নিমেষেই বন্দুকের কান-ফাটানো শব্দের নীচে চাপা পড়ে গেল জাহ্‌শার বিস্ময়মাখা আর্তনাদ। প্লাটফর্মেই ঢলে পড়ল তার শরীর হাত থেকে বাক্সটা গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে দেশলাই আর সিগারেটের প্যাকেটগুলো ছড়িয়ে গেল চারপাশে। উপুড় হয়ে পড়ে রইলো তার নিথর দেহ।

[হামাসুল্‌ জুনূন ১৫৭ – ১৬২]

[সৌতি বর্ষ ২, সংখ্যা ১, শারদীয়া ১৪২৬, সেপ্টেম্বর ২০১৯ সংখ্যায় প্রকাশিত] 


بذلة الأسير
نجيب محفوظ
كان جحشة بائع سجائر أول السابقين إلى محطة الزقازيق حين اقترب ميعاد قدوم القطار. وكان يعد المحطة بحق سوقه النافقة. فيمضى على الإفريز فى نشاط منقطع النظير يتصيد بعينيه الصغيرتين الخبيرتين. ولعل جحشة لو سأل عن مهنته للعنها شر لعنة لأنه كبقية الناس برم بحياته ساخط على حظه. ولعله لو ملك حرية الاختيار لآثر أن يكون سائق سيارة أحد الأغنياء، فيرتدى لباس الأفندية، ويأكل من طعام البك، ويرافقه إلى  الأماكن المختارة فى الصيف والشتاء، مؤثرا من أعمال الكفاح فى سبيل القوت ما هو أدنى إلى  التسلية والملهاة. على أنه كانت له أسبابه الخاصة ودواعيه الخفية لإيثار هذا العمل وتمنيه من يوم رأى الغر سائق أحد الأعيان يتعرض للفتاة نبوية خادم المأمور فى الطريق ويغازلها بجسارة وثقة بل سمعه مرة يقول لها وهو يفرك يده حبورا: "سآتى معك قريبا ومعى الخاتم". ورأى الفتاة تبتسم فى دلال، وترفع طرف الملاءة عن رأسها، كأنها تسويها والحقيقة أنها أرادت أن تبدي عن شعرها الفاحم المدهون بالزيت.  
رأى ذلك فالتهب قلبه وأحسّ الغيرة تنهشه نهشا موجعا. وكان به من عينيها السوداوين أوجاع وأمراض. وكان يتبعها عن كثب، ويقطع عليها السبيل فى الذهاب والإياب، حتى إذا خلي بها فى عطفه، أعاد على أذنيها ما قال لها الغر: "سآتى قريبا ومعي الخاتم". ولكنها لوت عنه رأسها، وقطبت جبينها وقالت باحتقار: "هات لك قبقاب أحسن". فنظر إلى  قدميه الغليظتين، كأنهما بطنا بخفي جمل. وجلبابه القذر. وطاقيته المعفرة وقال: هذا سبب شقائى وأفول نجمى. ونفس على الغر عمله. وتمناه على أن آماله لم تقطعه عن مهنته. فثابر على كده قانعا من آماله بالأحلام. وقصد فى ذلك الأصيل إلى محطة الزقازيق، يحمل صندوقه، وينظر القادم. ونظر إلى  الأفق. فرأى القطار قادما من بعد، كأنه سحابة دخان. وما زال يدنو ويقترب، وتتميز أجزائه ويتصاعد ضجيجه حتى وقف على إفريز المحطة. وهرع جحشة إلى العبات المتراصة. فرأى لدهشته على الأبواب حراسا مسلحين ووجوها غريبة تطل من النوافذ بأعين ذاهلة منكسرة. فقيل لهم بأن هؤلاء الأسرى الإيطاليين، تساقطو بين يدى عدوهم بغير حساب. وأنهم يساقون اليوم إلى المعتقلات.
فوقف جحشة متحيرا يقلب عينيه فى الوجوه المغبرة. ثم أدركته الكآبة، لأنه أيقن أن تلك الوجوه الشاحبة الغارقة فى البؤس والفقر لن يكون فى وسعها إشباع نهمها من سجائره. ووجدهم يلتهمون صندوقه بشراهة جوع. فألقى عليهم نظرة سخط واحتقار. وهمّ أن يوليهم ظهره، ويعود من حيث أتى. ولكنه سمع صوتا يصيح به بالعربية بلهجة أفرنجية قائلا: "سجائر".
فحدجه بنظرة دهشة وريبة. ثم فرك سبابته بابهامه: أي نقود. ففهم الجندي وأومأ برأسه. فاقترب محاذرا ووقف على بعد لا تبلغه يد الجندي فخلع الجندي جاكتته بهدوء. وقال له وهو يلوح بها: هذه نقودي. فتعجب جحشة وتفرس فى الجاكتة الرمادية ذات الأزرار الصفراء بين الدهشة والطمع. ووجب قلبه، ولكنه لم يكن ساذجا أو مغفلا. فأخفى ما قام بنفسه أن يقع فريسه للايطإلى. وأبرز فى هدوء ظاهري علبة سجائر، ومدّ يديه ليأخذ الجاكتة. فقطب الجندي جبينه وصاح به: علبة واحدة بجاكتة؟ هات عشرا. فذعر جحشة وتراجع إلى  الوراء، وقد غاض طمعه وأوشك أن يأخذ فى غير السبيل، فصاح به الجندي: أعطنى عددا مناسبا تسعا أو ثمانية. فهز الشاب رأسه بعناد. فقال الجندي: إذن سبعا. ولكنه هزّ رأسه كما فعل فى الأولى، وتظاهر بأنه يعتزم المسير. فقنع الجندي بست، ثم هبط إلى  خمس. فلوح جحشة بيده متظاهرا باليأس وتراجع إلى المقعد وجلس. فصاح به الجندي المجنون: "تعال رضيت بأربع". فلم يلق له بالا، وليدله على عدم اكتراثه أنه أشعل سيجاره، ومضى يدخن فى تلذذ وهدوء. فثارت ثائرة الجندي وأهاجه الغضب وبدا، وكأنه ليس له غاية فى الوجود سوى الاستيلاء على سجائر، فهبط بطلبه إلى ثلاث، ثم اثنين. ولبث جحشة جالسا يغالب اضطرام عواطفه وأوجاع طمعه. ولما نزل الجندي إلى اثنتين، أبدى حركة بغير إرادة. رآها الجندي، فقال له وهو يمدّ يده بالجاكتة: "هات".
فلم ير بدا من النهوض، ودنا من القطار حتى أخذ الجاكتة. وأعطى الجندي العلبتين. وتفرس الجاكتة بعين جذلة راضية، وقد لاحت على شفتيه ابتسامة ظفر. ووضع الصندوق على المقعد. وارتدى الجاكتة، وزررها. فبدت فضفاضه، ولكنه لم يعن لذلك. وتاه عجبا وسرورا. واسترد صندوقه، وأخذ يقطع الإفريز فخزرا طروبا. وارتسمت لعينيه ورة نبوية فى ملاءتها اللفة. فقال متمتما: "لو ترانى الآن، نعم لن تتجافانى بعد اليوم، ولن تلوى وجهها عني احتقارا، ولن يجد الغر ما يفخر به علي". ولكنه ذكر أن الغر يرتدي بدلة كاملة، لا جاكتة مفردة. فكيف السبيل إلى  البنطلون؟ وفكر مليا، وألقى على رؤوس الأسرى المطلة من نوافذ القطار نظرة ذات معنى. ولعب الطمع بقلبه من جديد. فاضطربت نفسه بعد أن أوشكت أن تستقر. ودلف إلى  القطار ونادى بجرأه: "سجائر، سجائر، العلبة ببنطلون لمن ليس معه نقود. العلبة ببنطلون." وأعاد ندائه هذا مثنى وثلاثا. وخشى أن يغيب على الأفهام مقصده. فمضى يومىء إلى  الجاكتة التى يرتديها، ويلوح بعلبة سجائر. وأحدثت إيمائته الأثر المرجو. فلم يتردد جندي أن يهم بخلع جاكتته، ولكنه سارع نحوه وأومأ اليه أن يتمهل. ثم أشار إلى بنطلونه يعنى، أن ذلك بغيته. وهزّ الجندي منكبيه باستهانه. وخلع البنطلون. وتم التبادل. وقبضت يد جحشة على البنطلون بقوة، يكاد يطير من الفرح. وتقهقر إلى  مكانه الأول، وأخذ يرتدي البنطلون، وانتهى فى أقل من دقيقة. فصار جنديا إيطاليا كاملا، ترى هل ينقصه شىء، الموسف حقا أن هؤلاء الأسرى لا يغطون رأسهم بالطرابيش، ولكنهم يضعون أقدامهم فى أحذية. ولا غنى عن حذاء، ليتساوى بالغر الذى يكرب حياته. وحمل صندوقه وهرع إلى القطار وهو يصرخ: "سجائر، العلبة بحذاء، العلبة بحذاء". واستعان على التفاهم بالإشاره، كما فعل فى المرة الأولى. ولكنه قبل أن يظفر بزبون جديد آذنت صفارة القطار بالمسير، فتمخضت عن موجة نشاط، شمل الحراس جميعا. وكانت سحائب الظلام تغشي جوانب المحطة، وطائر الليل يحلق فى الفضاء. فتوقف جحشة وفى نفسه لوعة، وفى عينيه حسرة وغيظ. ولما أخذ القطار يتحرك لمحه حارس فى عربة أمامية. فبدا على وجهه الغضب وصاح بالإنجليزية ثم بالإيطالية: "اصعد بسرعة، أيها الأسير".
فلم يفهم جحشة ما يقول، وأراد أن ينفس عن صدره، فجعل يقلده فى حركاته مستهزءا مطمئنا إلى بعده عن متناول يديه. فصاح به الحارس مرة أخرى، والقطار يبتعد رويدا ورويدا: "اصعد، إنى أحذرك، اصعد".
فزم جحشة شفتيه احتقارا، وولاه ظهره، وهم بالمسير. فكور الحارس قبضة يسراه مهددا، وصو بندقيته نحو الشاب الغافل، وأطلق النار، ودوى عزيف الرصاصة يصم الآذان. واعقبتها صرخة ألم وفزع. وتصلب جسم جحشة فى مكانه. فسقط الصندوق من يده، وتناثرت علب السجائر والكبريت. ثم انقلب على وجهه جثة هامدة.

همس الجنون 157 – 162