Pages

Saturday, 6 June 2020

বদিউর রহমানঃ সব অতিথি দেব ভবঃ নয়!



সব অতিথি দেব ভবঃ নয়!
বদিউর রহমান

গতকাল রাতে এক অদ্ভূত অভিজ্ঞতা হল লকডাউনে গৃহবন্দী নজরবন্দী হাড়ভাঙা বিশ্রামে ক্লান্ত! তার উপর সারাদিনের রোজায় ম্রিয়মান রাত টায় বাড়ির বাইরের গলিটায় পায়ের জড়তা কাটাতে বের হয়েছিলাম দশ-পনেরো মিনিট পর ঘরে ফিরে ফ্যানের সুইচটা সবে মাত্র দিয়েছি, দরজায় হালকা টোকা সন্দেহবশতঃ দরজা খুললাম দীর্ঘদিন ধরে করোনা ভাইরাসের ছবিটা দেখে অভ্যস্ত আমার তাঁকে চিনতে ভুল হলো না অনুমতির তোয়াক্কা না করেই তিনি ভিতরে এলেন ভদ্রতার খাতিরে সোফায় বসতে বলে জিজ্ঞেস করলাম তাঁর আগমনের হেতু তিনি প্রায় আশ্চর্য হয়ে বললেন, “সে কী! জানেন না আমি কখন কার সাথে কী কারণে মোলাকাত করি?” বললাম, “তা তো জানি, কিন্তু…” বললেন, “কিন্তু কী? আপনার ঘর থেকে বের হওয়াটা উচিৎ হয়নি যখন হাঁটছিলেন তখনই আপনার পিছু নিই কিন্তু বয়সেও যে দ্রুততায় হাঁটছিলেন তার সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে আপনার ফ্ল্যাটে এলাম শুনলাম আপনি নাকি আমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে লিখেছেন

করোনা,
একবার তুমি এসো না,
এসেছই যখন,
দেখা না করে যেও না
তোমার সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে,
আমি যদি যাই হেরে,
একটাই তো দুঃখ তখন
গোর দিতে কেউ আসবে না
শুনব না কোনো গঞ্জনা
করোনা, একবারটি এসো না
এসেছ যখন, আমার সঙ্গে
দেখা না করে যেও না
দিন পরে যখন খুলবে রাস্তাঘাট
আর চলবে গাড়িঘোড়া
তখনও তুমি আসতে পারো,
তবে দেখা না করে যেও না
পরে তোমায় দোষ দেবে না কেহ,
গোরে যখন শোয়াবে আমার দেহ,
ছাত্ররা কেউ বলবে ভালই ছিল লোকটা
কেউ বলবে, ওঁর কপালে এমন ছিল শেষটা!”

একটু দম নিয়ে তিনি বললেন, “জানো না বুঝি সারা বিশ্ব আমার ভয়ে থরহরি কম্প! আর তুমি এসেছ আমাকে নিয়ে রসিকতা করতে!” কথা শেষ করেই বলে উঠলেন, “এবার দেখ আমার খেলহাজার অনুনয়-বিনয় করলেও এখন প্রবেশ করছি তোমার শরীরে কিছুক্ষণের জন্য তিনি অদৃশ্য আমি ভয়ে ভয়ে ঢোঁক গিললাম গলায় কেমন একটা অস্বস্তি বোধ হল! একটু ধাতস্ত হতে না হতেই দেখি তিনি স্বস্থানে স্বমহিমায় বিরাজমান তিনি যেন একটু হতাশ আর ক্লান্ত! বিরক্তির সুরে বললেন, “কী মশায়, ফুসফুসটা তো ধোঁয়ায় কালো নিরেট করে রেখেছেন চেষ্টা করলাম হার্টে হুল ফোটাতে ওমা! সেটাও তো দেখি কঠিন হয়ে আছে আপনি যে হার্টলেস তা তো জানতাম না!” বললাম, “তা না হয় হলো; তা একটু চা খেয়ে যান!” বললেন, “বলেন কী! জানেন না গরম চায়ে আমার অ্যালার্জি! অকাল মৃত্যুও হতে পারেএই বলে তিনি রাগে গরগর করতে করতে গাত্রোত্থান করলেন  

Friday, 15 May 2020

আব্দুল মাতিন ওয়াসিমঃ আর্তনাদ



নাক্‌বা দিবসে হুইল চেয়ারে বসে নিজ স্ত্রী ও কন্যার সাথে এক ফিলিস্তিনি দেখতে এসেছেন নিজের দখল হয়ে যাওয়া বাড়ি, বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে রয়েছে দখলকারী ইহুদি দম্পতি…  


আর্তনাদ
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

ভেবোনা, আমি নিঃস্ব ছিলাম।
আমার সবই ছি
বাড়ি-পরিবার-অর্থসম্পদ-সম্ভ্রান্ত বংশশৃঙ্খল, সব।  

একদিন প্রত্যুষে দেখি
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে এক ভিখিরি
ক্লান্ত-অবশ্রান্ত-অসাড়, অস্তিত্ব তার বিপন্ন
ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত
একটু অন্ন ও আশ্রয়ের খোঁজে।
আমি তাকে থাকতে দিলাম, খাবারও দিলাম।

ক’দিন বাদে, ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি
এ কি, আমি বাইরে কেন?
দরজা কড়া নাড়ালাম
বেরিয়ে এলো সেই ভিখিরি
চোখ লাল ও চোয়াল শক্ত করে বলল
‘দূর হো, বেটা সন্ত্রাসী’

হায়, আমি আজ গৃহহারা, অসহায়;
আমি ফিলিস্তিনী...

[দৈনিক পূবের কলমে প্রকাশিত] 

Thursday, 14 May 2020

মাহমুদ দারবিশঃ আমার অভিমান ও ক্রোধ




আমার অভিমান ও ক্রোধ
মাহ্‌মুদ দার্‌বিশ, ফিলিস্তিন
অনুবাদ- আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

হে আমার জন্মভূমি, আমার শাহীন—
তোমার ঠোঁটের ডগায় লেগে থাকা
ওই লেলিহান অগ্নিশিখায়
ঝলসে যাচ্ছে আমার দু’চোখ
ঝলসে যাচ্ছে সব কিছু
আমি এখন ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে
নিঃস্ব, নিঃসঙ্গ ও অসহায়, আমার পাশে
না আছে আরব, না আছে অন্য কেউ
কাঁটায় ভরা এই মরু পথে
আমার একমাত্র সম্বল
আমার অভিমান, আমার ক্রোধ।
আমার এখন একটাই সাধ—
আমার এ হৃদয় যেন রোপে দেওয়া হয়
কোনো বৃক্ষচারার ন্যায়, যাতে
আমার কপালে বা বুকে কোথাও এসে
বাসা বাঁধে কোনো ভারুই পাখি।

হে আমার জন্মভূমি, তোমার একই ছবি
আমার শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য ও যৌবন জুড়ে
আমি এখন বার্ধক্যে, তোমায় ক্ষতবিক্ষত দেখে
এই দীর্ঘ জীবনের প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত
আমি অতিবাহিত করেছি তোমার জন্য
অতিবাহিত করেছি ওক্‌ গাছের ছালও পাতা খেয়ে
যাতে স্পর্শ করতে পারি
তোমার কাঙ্খিত নতুন ভোরের আলো।  

হে আমার শাহীন, তুমি অকারণে বন্দী আজ
তীব্র পিপাসায় নিস্তেজ, আর তোমার মৃত্যু
কুসংস্কারে আচ্ছাদিত তবে অবধারিত
তীক্ষ্ণ তরবারির ন্যায় তোমার লাল জ্বলজ্বলে ঠোঁট
ডুবে আছে আমার চোখের ভেতর;
আমি জানি, আমি তোমার সুদৃশ্য ডানার
পালক হবারও যোগ্য নই
আমি যে এখমৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে
এক নির্জন মরুপথে, যেখানে আমার একমাত্র সম্বল
আমার অভিমান এবং আমার ক্রোধ।


جبين وغضب
محمود درويشفلسطين

وطني يا أيها النسر الذي يغمد منقار اللهبْ
في عيوني،
أين تاريخ العرب؟
كل ما أملكه في حضرة الموت:
جبين وغضب.
وأنا أوصيت أن يزرع قلبي شجرة
وجبيني منزلا للقبّرة.
وطني، إنا ولدنا وكبرنا بجراحك
وأكلنا شجرة البلّوط..
كي نشهد ميلاد صباحك
أيها النسر الذي يرسف في الأغلال من دون سبب
أيها الموت الخرافي الذي كان يجب
لم يزل منقارك الأحمر في عينّي
سيفا من لهب..
وأنا لست جديرا بجناحك
كل ما أملكه في حضرة الموت:
جبين.. وغضب !


[শব্দের মিছিল, ১২ মে ২০২০, অনুবাদ বিভাগে প্রকাশিত]