Pages

Showing posts with label নস্টালজিয়া. Show all posts
Showing posts with label নস্টালজিয়া. Show all posts

Friday, 30 October 2026

বোকা বাক্সে বন্দী শৈশব - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার উপক্রম। পশ্চিম আকাশের শেষ প্রান্তে সূর্যের সোনালি আভাটুকু তখনও মিলিয়ে যায়নি। মাঠ থেকে গরু-ছাগলগুলো নিজ নিজ গোয়ালে ফিরছে, উঠোনে-উঠোনে দিনের শেষ কাজগুলো গুছিয়ে নেওয়ার ব্যস্ততা, কোথাও উনুনের ধোঁয়া, কোথাও সন্ধ্যার রান্নার তোড়জোড়। এরই মধ্যে হঠাৎ করে গোটা গ্রামজুড়ে এক হুলস্থূল কাণ্ড বেঁধে গেল। নিজ নিজ কাজকর্ম দ্রুত সেরে, ছোটরা হাতমুখ ধুয়ে, বড়রা ওজু করে মাগরিবের নামাজ পড়ে, সবাই ছুটলো পুবপাড়ের দিকে। গন্তব্য—সামাদ দা’র বাড়ির বাইরের খোলা জায়গা।  
 
অবশ্য ক’দিন ধরেই এর প্রস্তুতি চলছিল। গ্রামের যুবকেরা উদ্যোগ নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে মুঠো মুঠো চাল তুলেছে। সেই চাল এক জায়গায় জমিয়ে, তার সঙ্গে কিছু টাকা যোগ করে ভাড়া করে আনা হয়েছে একটি ভিসিডি প্লেয়ার আর একটি টেলিভিশন। উদ্দেশ্য, সবাই মিলে সিনেমা দেখা; সে-সময়ের চলতি ও জনপ্রিয় সিনেমা—‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’।
 
মাগরিবের নামাজের পর টেলিভিশন সেট করা হলো, ভিসিডি প্লেয়ারও জুড়ে দেওয়া হলো। বসার জন্য কেউ বাড়ি থেকে মাদুর নিয়ে এসেছে, কেউ ঘরের চাটাই, কেউ খেজুর-পাটি, আবার কেউ খড়ের গাদা থেকে দু-চারটা আঁটি নিয়ে এসেছে। অল্প সময়ের মধ্যেই উঠোনটা যেন কানায় কানায় ভরে উঠল।
 
আমরা শিশুরা একেবারে প্রথম সারিতে গিয়ে বসে পড়লাম। আমাদের পেছনে ডান দিকে বসলেন গ্রামের বয়স্ক পুরুষেরা, আর বাঁ দিকের পুরোটা জুড়ে মহিলাদের বসার ব্যবস্থা হলো। ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সবার চোখ তখন সেই ছোট্ট টেলিভিশনের পর্দায়। সবার মধ্যে এক অদ্ভুত উত্তেজনা! যেন পর্দার ওপারে শুধু একটি সিনেমা নয়, খুলে যেতে চলেছে এক অজানা পৃথিবীর দরজা।
 
কিছুক্ষণ পরেই শুরু হলো ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’। আমাদের কাছে সেটি ছিল একেবারেই নতুন এক অভিজ্ঞতা। পর্দায় কখনও গান, কখনও মজার কৌতুক, কখনও অন্য রকম দৃশ্য—সবকিছুই আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছিলাম। গ্রামের মানুষও বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিলেন সেই অভিনব বিনোদন। কোনো কোনো দৃশ্যে চারদিক থেকে হাততালির শব্দ উঠছিল। আবার সাপুড়ের বাঁশির শব্দ বা সাপের দৃশ্য এলে সবাই খানিকটা চমকে উঠছিলেন, হতচকিত হয়ে তাকিয়ে থাকছিলেন পর্দার দিকে। সেদিনের সেই সন্ধ্যা আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন। উঠোনজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মাদুর-চাটাই, টেলিভিশনের সামনে গাদাগাদি করে বসে থাকা মানুষ, শিশুদের কৌতূহলী চোখ, বড়দের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে সে ছিল এক অন্যরকম আনন্দের সন্ধ্যা।
 
আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, সেই সময় আমাদের এলাকায় বিদ্যুতের সংযোগ ছিল বটে, কিন্তু আশপাশের চার-পাঁচটি গ্রামের কারও বাড়িতে টেলিভিশন ছিল না। তবে বহু বাড়িতে রেডিও ছিল। আর সেই রেডিওই ছিল বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের মাধ্যম। লোকজন রেডিওতে খবর শুনত, নাটক শুনত, নানা অনুষ্ঠান শুনত। ক্রিকেট ও ফুটবলের লাইভ কমেন্ট্রি শুনত। সন্ধ্যা নামলে কোনো কোনো বাড়ির উঠোনে কিংবা বারান্দায় রেডিওকে ঘিরে দু-চারজন মানুষ জটলা করে বসে যেতেন। দূরের কোনো শহর থেকে ভেসে আসা সংবাদ, নাটকের সংলাপ, গান কিংবা ঘোষকের কণ্ঠ—সব মিলিয়ে সেই ছোট্ট যন্ত্রটি আমাদেরকে অচেনা পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিত।
 
এরপর একদিন আমাদের গোটা এলাকায় প্রথম টেলিভিশন এল। কদমডাঙ্গার ইসমাঈল দা কিনলেন। তাঁর বাড়িতে টেলিভিশন আসা মানে চার-পাঁচটি গ্রামের মানুষের কাছে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। সন্ধ্যা নামলেই আশপাশের বিভিন্ন বাড়ি থেকে মানুষ তাঁর বাড়িতে এসে হাজির হতো। কারও হাতে কাজের ক্লান্তি, কারও পরনে দিনের পোশাক—তবু সবার চোখেমুখে একটাই কৌতূহল, আজ টিভিতে কী দেখা যাবে? বিশেষ করে ‘আলিফ লায়লা’ দেখার জন্য মানুষের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। সেই সময় ‘আলিফ লায়লা’ যেন শুধু একটি ধারাবাহিক ছিল না; ছিল সন্ধ্যার এক বিশেষ আকর্ষণ।
 
ইসমাঈল দা’ও যেন বিষয়টি বুঝতেন। প্রতিদিন সময় হলে তিনি টেলিভিশনটি ঘর থেকে বের করে বারান্দায় এনে সেট করতেন। তারপর একে একে লোকজন এসে বারান্দায়, উঠোনে, আশপাশে বসে পড়ত। কেউ মাটিতে, কেউ চাটাইয়ে, কেউ যেখানে একটু জায়গা পেত সেখানেই বসে যেত। ছোট্ট রঙিন পর্দায় তখন খুলে যেত এক অন্য জগৎ—‘আলিফ লায়লা’, কখনও অন্য কোনো সিরিয়াল, আবার কখনও ক্রিকেট কিংবা অন্য কোনো খেলা।
 
ঘটনাচক্রে ইসমাঈল দা’র বড় ছেলে রবি ছিল আমার ক্লাসমেট। সেই সুবাদে আমিও মাঝে মাঝে রবিদের বাড়িতে যেতাম। আর সেই যাওয়াগুলো আমার কাছে ছিল একেকটি বিশেষ সুযোগ। কারণ সেখানে গিয়ে আমি টেলিভিশনে দেখতে পেতাম আমার কল্পনার জগতের একের পর এক চমক—‘চন্দ্রকান্তা’, ‘শক্তিমান’, ‘শাকালাকা বুম বুম’ আরও কত রকম সিরিয়াল!
 
আজ ভাবলে অবাক লাগে, সেই ছোট্ট রঙিন টেলিভিশনের পর্দাটি আমাদের শৈশবের কাছে কত বড় একটি জানালা ছিল! তার ওপারে ছিল এমন এক পৃথিবী, যার সঙ্গে আমাদের গ্রামের বাস্তব জীবনের কোনো মিল ছিল না। অথচ সেই পর্দার সামনে বসে আমরা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। মনে হতো, এই বুঝি পৃথিবীটা আরেকটু বড় হয়ে গেল!
 
এরপর ধীরে ধীরে টেলিভিশন আমাদের এলাকায় আরও বেশ কয়েকটি বাড়িতে পৌঁছে গেল। আমাদের গ্রামে সর্বপ্রথম টেলিভিশন কিনেছিলেন সোলেমান মিয়াভাই। তাঁর বাড়িতে টেলিভিশন আসায় আমাদের বেশ সুবিধাই হলো। আমাদের মতো ছোটদের জন্য টেলিভিশন দেখা যেন অনেকটাই সহজ হয়ে গেল। রবিবার এলেই তখন আমাদের মনে আলাদা একটা অপেক্ষা তৈরি হতো। দূরদর্শনে সকালে চিত্রাহার আর সন্ধ্যায় কোনো হিন্দি সিনেমা। তার জন্য মনটা আগে থেকেই ছটফট করত। আবার শুক্রবারে বিটিভিতে বাংলা সিনেমা। তার সঙ্গে ক্রিকেট খেলা তো ছিলই। ব্যাট-বলের সেই লড়াই দেখার জন্যও আমাদের আগ্রহের অন্ত ছিল না।
 
আত্মীয়তার সুবাদে সলেমান মিয়াভাইর বাড়িতে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের, বিশেষ করে আমার, তেমন কোনো অসুবিধা ছিল না। বরং সেখানে যাওয়ার মধ্যে একটা বাড়তি আনন্দই ছিল। দিদি আমাদের দেখলে বেশ আদর করতেন, খাওয়া-দাওয়াও দিতেন। তারপর আমরা নিশ্চিন্তে বসে টেলিভিশন দেখতাম। দিদির স্নেহ, বাড়ির পরিচিত পরিবেশ, আপনজনের মতো বসে থাকা, কিছু খেয়ে নেওয়া, তারপর একসঙ্গে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে থাকা—শৈশবের সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো তখন হয়তো এত বড় মনে হতো না। কিন্তু সময় যত পেরিয়েছে, ততই বুঝেছি, জীবনের আসল সম্পদ বোধহয় সেই ছোট ছোট আনন্দমুখর মুহূর্তগুলিই।
 
তারপর একে একে আরও কত বাড়িতে টেলিভিশন সেঁধিয়ে গেল—মুনির দা, আজিজ দা, সামাদ দা, আরও কতজনের। আর আমরাও সুযোগ বুঝে কখনও এ বাড়ি, কখনও ও বাড়ি, টেলিভিশন দেখে বেড়াতাম। যে বাড়িতে যে দিন যে অনুষ্ঠান বা খেলা চলছে, সেদিন আমাদের গন্তব্যও যেন ঠিক হয়ে যেত সেই বাড়ি।
 
তবে টেলিভিশন দেখা যে সবসময় সহজ ছিল, তা নয়। অনেক সময় টেলিভিশন দেখার জন্য আমাদেরকে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হতো। কখনও বলা হতো—“তোরা তো ছোট বাচ্চা, বের হয়ে যা।” কখনও সিনেমা চলার সময় ধমক দিয়ে বলা হতো—“যা পড়তে বস।” আবার ক্রিকেট খেলা চললে শুনতে হতো—“তোরা ক্রিকেট কী বুঝিস?”
 
আমরাও এত সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিলাম না। ছোট ছিলাম, কিন্তু টেলিভিশন দেখার ব্যাপারে আমাদের জেদও ছিল প্রবল। মনে মনে যেন পণ করে বসেছিলাম—টেলিভিশন আমরা দেখবই। তাই ঘর থেকে বের করে দিলে আমরা বেরিয়ে আসতাম। কিন্তু বাইরে এসে প্রথমে খুঁজতাম জানালা খোলা আছে কি না। জানালা খোলা থাকলে জানালার কাছে বসেই দেখতাম। বাড়ির লোকজন টের পেলে জানালাটাও বন্ধ করে দিত।
 
তাতেও কি আমরা দমে যেতাম? না। বন্ধ জানালার গায়ে কোথাও কোনো ছোট ছিদ্র আছে কি না, কাঠের ফাঁকে কোথাও সামান্য চিড় আছে কি না—আমরা খুঁজে বের করতাম। সেই সামান্য ফাঁক দিয়ে যদি টেলিভিশনের পর্দার একটুখানি আলো দেখা যায়, তাহলেই হলো। তারপর সেই ফাঁকটুকুতে এক চোখ গুঁজে দিয়ে শুরু হতো আমাদের গোপনে টেলিভিশন দর্শন।
 
ভেতরের লোকজন ভাবত, আমরা বুঝি চলে গেছি। অথচ জানালার ওপাশে আমরা এক চোখে গোটা পৃথিবীটাকে আটকে রেখেছি। কখনও সিনেমা, কখনও চিত্রহার, কখনও ক্রিকেট যা-ই চলুক, আমাদের চোখ আর সরে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একইভাবে জানালার ফাঁকে চোখ রেখে আমরা দেখে যেতাম। এক চোখে পর্দা, অন্য চোখে অন্ধকার। এইভাবেই কখনও পুরো সিনেমা, কখনও পুরো খেলা শেষ করে তবেই বাড়ি ফিরতাম।
 
আর যখন ভেতরের লোকজন আমাদের কৌশল ধরে ফেলত, জানালার সেই ফাঁক বন্ধ করে দিতো, কখনও এমনভাবে জানালায় পর্দা টেনে দিতো যাতে বাইরে থেকে আর কিছুই দেখা না যায়। কিন্তু আমরাও ছিলাম নাছোড়বান্দা। তারা এক কৌশল নিলে আমরা আরেক কৌশল বের করতাম। আমাদের মাঝখানে যেন এক অদৃশ্য যুদ্ধ চলত। ওরা চাইত আমাদের দূরে রাখতে, আর আমরা চাইতাম যেভাবেই হোক পর্দার একটু আলো চোখে মাখতে।
 
আজ সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে হাসি পায়। একটা সিনেমা বা খেলা দেখার জন্য এত লুকোচুরি, এত কৌশল, এত অপেক্ষা, এত জেদ—আজকের দিনে যেন ভাবাই কঠিন। কিন্তু তখন সেই সামান্য আনন্দটুকুর জন্য কত দৌড়ঝাঁপ, কত বুদ্ধি আর কত অপেক্ষা। সেই জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা টেলিভিশনের পর্দাটুকুই তখন আমাদের কাছে ছিল এক বিশাল পৃথিবীর জানালা।
 
তারপর ধীরে ধীরে সময় পাল্টাল। যে টেলিভিশন একদিন আমাদের কাছে ছিল দুর্লভ, সেটিই এখন প্রায় প্রতিটি বাড়ির নিত্যসঙ্গী। এক সময় বাড়িতে টিভি আসা মানেই ছিল পাড়া-প্রতিবেশীর মধ্যে নতুন এক আনন্দের খবর, আজ সেই টিভি প্রায় প্রতিটি ঘরেই নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—টেলিভিশন যত সহজলভ্য হয়েছে, তাকে দেখার মানুষ যেন তত কমে গেছে। এখন আর আগের মতো টেলিভিশনের সামনে সবাইকে একসঙ্গে বসে থাকতে দেখা যায় না। কোনো বিশেষ উপলক্ষে কখনও খেলা, কখনও কোনো গুরুত্বপূর্ণ খবর—এসব একসঙ্গে বসে দেখা হয়। তারপর আবার যে যার নিজের জগতে ফিরে যায়। ঘরের এক কোণে টেলিভিশনটি নীরবে পড়ে থাকে।
 
টেলিভিশনটাও যেন এখন একা হয়ে গেছে। একসময় তাকে ঘিরে কত মানুষের ভিড় ছিল! কত কোলাহল, কত হাসি, কত অপেক্ষা! সন্ধ্যা নামলেই তাকে ঘর থেকে বারান্দায় বের করে আনতে হতো। মানুষ এসে জড়ো হতো। শিশুরা সামনে বসার জন্য ঠেলাঠেলি করত। বড়রা পেছনে বসতেন। কোনো দৃশ্যে হাসির রোল উঠত, কোনো দৃশ্যে হাততালি পড়ত। আর এখন সেই টেলিভিশনই যেন আমাদের অপেক্ষায় থাকে। কারণ মানুষের হাতে হাতে এখন মুঠোফোন। আঙুলের সামান্য স্পর্শেই খুলে যায় তার পর্দা। স্ক্রোল করলেই সামনে চলে আসে নতুন সিনেমা, গান, খবর কিংবা রিল। একটা শেষ হওয়ার আগেই আরেকটা এসে হাজির হয়। কোনো অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। বিনোদন এখন আর অপেক্ষার জিনিস নয়; বরং আমরা যখন চাই, তখনই আমাদের সামনে হাজির হয়ে যায়।
 
আর এখানেই আমাদের শৈশবের সঙ্গে আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় পার্থক্য। তখন আমরা অপেক্ষা করতাম—কখন টেলিভিশন চালু হবে, কখন সিনেমা শুরু হবে, কখন ক্রিকেট খেলা দেখব। কখনও পুরো সপ্তাহ অপেক্ষা করতাম একটা সিনেমার জন্য। সিনেমা শুরু হয়ে গেলে মাঝপথে উঠে যাওয়ার প্রশ্নই ছিল না। কারণ জানতাম, আবার কখন এমন সুযোগ আসবে কে জানে! আর এখন? সবকিছু হাতের মুঠোয়। অপেক্ষা নেই। অভাব নেই। খুঁজে পাওয়ার কষ্ট নেই। তবু কোথাযও যেন সেই আনন্দটা নেই।
 
আজ প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে টেলিভিশন আছে। তবে টেলিভিশনের সামনে মানুষ নেই। আর তাই কখনও বাড়ির কোণে নীরবে পড়ে থাকা টেলিভিশনটির দিকে তাকালে মনে হয়—সে শুধু একটি যন্ত্র নয়; সে যেন আমাদের ফেলে আসা শৈশবেরও এক নীরব সাক্ষী। একদিন তার পর্দার দিকে তাকানোর জন্য আমরা কতটা ব্যাকুল ছিলাম। ঘর থেকে বের করে দেওয়ার পরও জানালার ফাঁক খুঁজে নিতাম। বন্ধ জানালার গায়ে চোখ রেখে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতাম। একটি সিনেমা দেখার জন্য কতটা পথ দৌড়ে যেতাম, কত অপেক্ষা করতাম। একটি ছোট্ট রঙিন পর্দা কীভাবে আমাদের শৈশবকে রঙিন করে দিয়েছিল! আজ সেই একই পর্দা ঘরের এক কোণে নীরবে পড়ে আছে। হয়তো কোনো অভিমান, কোনো অভিযোগ ছাড়াই। কখনো মনে হয়, সে যেন আমাদের ফেরার অপেক্ষায় আছে। কিন্তু আমাদের চোখ এখন ছোট্ট মুঠোফোনের পর্দায় বন্দী। যদিও আমাদের শৈশব পড়ে আছে সেই পুরোনো টেলিভিশনের সামনে—মাটির উঠোনে, মাদুরের ওপর, বারান্দার এক কোণে, কিংবা বন্ধ জানালার গায়ে এক চোখ গুঁজে।
 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা