আমি তখন খুব ছোট। সবে প্রাইমারিতে
ভর্তি হয়েছি। চারপাশের পৃথিবীটাকে রোজ নতুন ভাবে আবিষ্কার করছি। সেই সময় প্রিয় দা প্রস্তুতি নিচ্ছিল তার জীবনের এক বড়
পরীক্ষার।
প্রতিদিন ভোররাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রথম যে শব্দটা আমার কানে ভেসে আসতো,
সেটা ছিল প্রিয় দা’র পড়ার আওয়াজ।
তার ঘরের জানালাটা ছিল আমাদের উঠানের একেবারে গা ঘেঁষে, তাই তার জোরে জোরে পড়ার শব্দ সহজেই ভেসে আসত আমাদের ঘর
পর্যন্ত। অদ্ভুত এক ছন্দ
ছিল সেই পড়ায়। মনে হতো, শব্দগুলো যেন বইয়ের পাতা
ছাড়িয়ে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
প্রিয় দা’র ভালো নাম প্রিয়নাথ সরকার। কালু জ্যাঠুর ছোট ছেলে। আমাদের ঘর-সংসারের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক বেশ গভীর। আমাদের বাড়ি,
জমি,
পুকুর, বসতভিটা, খামার সবই যেন একসুতোয় গাঁথা। এই ঘনিষ্ঠতার পেছনে আছে ইতিহাসের এক জটিল অধ্যায়। স্বাধীনতার পর,
দেশভাগের সেই অস্থির সময়ে,
এক্সচেঞ্জ পলিসির মাধ্যমে আমার বড় দাদু চলে যান পূর্ব
পাকিস্তান
অধুনা বাংলাদেশে। তাঁদের জায়াগায় গোপেশ জ্যাঠুরা
এপারে চলে আসেন। আর আমরা হয়ে যাই একে অপরের
আপনজন। তাই আমাদের হাসি-কান্না,
উৎসব-অনুষ্ঠান সবকিছুই প্রায় একসাথে হতো।
প্রিয় দা’ রোজ ভোরে আওয়াজ
করে পড়ত। সেই আওয়াজে ভোরের নীরবতা কেমন যেন জীবন্ত হয়ে উঠত। ঠিক তখনই বাবা আমাকে
ঘুম থেকে তুলে দিতেন। মৃদু গলায় বলতেন, “দেখো,
তোমার প্রিয় দা কত ভোরে উঠে পড়তে বসেছে। তুমিও ওঠো, পড়তে বসো।” ঘুম জড়ানো চোখে আমি অবাক হয়ে শুনতাম সেই পড়ার শব্দ। কৌতূহলী হয়ে বাবাকে
জিজ্ঞেস করতাম,
“প্রিয় দা এত কী পড়ছে?” বাবা হেসে বলতেন,
“ও এবার মাধ্যমিক দেবে।”
“মাধ্যমিক” শব্দটা তখন আমার
কাছে এক রহস্যের মতো ছিল। শুনেই আমি হা করে বসে থাকতাম। মনে মনে ভাবতাম, এ নিশ্চয় খুব কঠিন কিছু। না হলে কেউ কি আর এত ভোরে উঠে, এত মন দিয়ে পড়তে বসে! ছোট্ট মনে একটা অদ্ভুত শ্রদ্ধা আর
বিস্ময় মিশে যেত প্রিয় দা’কে ঘিরে।
প্রিয় দা আমাদেরকে খুব ভালোবাসতো। বাড়ির উঠোন থেকে শুরু করে খেলার মাঠ, এমনকি পাথারেও যখন গরু-ছাগল চরাতে যেতাম, সে আমাদের আগলে রাখত। মনে হতো, সে শুধু পাশের
বাড়ির ছেলে নয়,
আমাদের পরিবারেরই একজন। রক্তের না হলেও হৃদয়ের সম্পর্কে বাঁধা। ছোটদের খেলাধুলায় ঝগড়াঝাটি,
ঠেলাঠেলি, মারামারি লেগেই
থাকে, আমাদের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু যতবারই এমন
কিছু ঘটত,
প্রিয় দা ঢাল হয়ে দাঁড়াত আমাদের সামনে। ওর উপস্থিতি মানেই একটা ভরসা। আমরা জানতাম, যা কিছুই হোক না,
প্রিয় দা আছে।
আনন্দ দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রিয় দা’র জুড়ি ছিল না। সে, জোগাই দা,
বাবলু কাকু, রবিউল দা,
মোমেন দা সকলে মিলে আমাদের জন্য নানারকম খেলার আয়োজন করত। আমাদের ছোট্ট পৃথিবীটাকে রঙিন করে তুলত তাঁদের সহজ-সরল খেলাগুলো। প্রিয় দা নিজের হাতে আমাদেরকে তালপাতার নৌকা বানিয়ে দিত, আমরা সেগুলো পুকুরের জলে ভাসিয়ে
দিতাম। নারকেল পাতা দিয়ে তার তৈরি ঘড়ি ও
চশমা আমাদের কাছে ছিল অমূল্য ধন। সে কখনো থানকুনি পাতার
গলার হার বানিয়ে দিত। আমরা সেগুলো গলায় ঝুলিয়ে
আনন্দে মেতে উঠতাম। ছোট ছোট এই সৃষ্টিগুলোই তখন আমাদের কাছে ছিল এক বিরাট বিস্ময়, এক অপরিসীম আনন্দের উৎস।
প্রিয় দা’ মাঝেমধ্যে ছোট ছোট ঢেপটিয়া সাপ পকেটে করে নিয়ে ঘুরে বেড়াত। আর হঠাৎ আমাদের সামনে এসে পকেট থেকে সেগুলো বের করে খেলা দেখাত। আমরা হতবাক হয়ে
তাকিয়ে থাকতাম। ভয়, কৌতূহল আর আনন্দ মিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি হতো মনে। তাছাড়া লাটিম খেলায় অসাধারণ দক্ষতা ছিল তার। লাটিম
ছুঁড়ে দিয়ে সুতো টেনে সেটাকে নিজের হাতে এনে ঘোরাত, আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। ভাবতাম, নিশ্চয় সে জাদু জানে!
তারপর, জীবনের স্রোত আমাকে অন্য দিকে টেনে নিয়ে গেল।
পড়াশোনার জন্য আমি চলে গেলাম হোস্টেলে। আমার বাড়িতে থাকা সীমিত হয়ে গেল। ফলে আমার জীবন থেকে আগের মতো নির্ভার ও দৌড়ঝাঁপে ভরা দিনগুলো ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল। আর সময় তার নিজের নিয়মেই আমাকে বড় করে তুলল।
অন্যদিকে, প্রিয় দা’র জীবনেও কত কিছু বদলে গেল। যথা সময়ে তার বিয়ে হয়ে গেল। একদিন সে নিজেই
আমাকে ডেকে বউদির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। লাজুক হাসি, নতুন সংসারের উষ্ণতা সব মিলিয়ে যেন এক শান্ত,
স্বাভাবিক জীবনের ছবি। কিছুদিন পর খবর এলো, তাদের ঘর আলো করে এসেছে এক ফুটফুটে মেয়ে। তিনজনের ছোট্ট সংসার। আনন্দ, অভাব, হাসি, কষ্ট সবকিছু মিশিয়ে বেশ ভালোই চলছিল তাদের দিনকাল।
কিন্তু সুখের সেই ছবি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। প্রিয় দা জন্ডিসে আক্রান্ত হল। গ্রামের মতো করেই
তার চিকিৎসা চলতে লাগলো। ডাক্তার, কবিরাজ, ওষুধ-পানি, ঝাড়ফুঁক সবই। কখনো একটু ভালো, আবার কিছুদিন পর আগের মতোই খারাপ। এইভাবে প্রায় এক-দেড় বছর কেটে গেল।
তখন আমি কোলকাতায় পড়াশোনা করি।
ছুটিতে বাড়ি ফিরেছি। একদিন জানতে পারলাম, প্রিয় দা’র অবস্থা খুব ভালো নয়। বিকেলে দেখতে
গেলাম। যে মানুষটা একসময় আমাদের আগলে রাখত, হাসিখুশি,
চঞ্চল আজ তার
শরীরটা যেন কেবল হাড়গোড়ের একটা ছায়া। চোখেমুখে সেই চেনা দীপ্তি নেই। দৃশ্যটা দেখে
বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তবুও মনে আশা ছিল, হয়তো ভালো হয়ে
যাবে,
হয়তো আবার আগের মতোই প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠবে।
কিন্তু না।
পরের দিন সকালে,
বেলা একটু গড়াতেই হঠাৎ কান্নার রোল উঠল। আমরা সবাই ছুটে গেলাম। গিয়ে দেখি, সব শেষ। প্রিয় দা আর নেই। নিথর, নিশ্চুপ। আমাদের ছেড়ে চলে গেছে চিরতরে। পাশে জ্যাঠিমা বসে আছেন, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন ছোট ছেলের নিথর দেহের দিকে। চোখে জল নেই, কিন্তু সেই শূন্য দৃষ্টি যেন হাজারো অশ্রুর চেয়েও ভারী। বউদি ছোট্ট মনাকে কোলে নিয়ে বসে আছে। একেবারে স্তব্ধ, পাথরের মতো।
খবর পেয়ে পাশের বাড়ির তাপস দা ছুটে এলো। তাদের নিয়ম-রীতির অংশ হিসেবে, সে প্রিয় দা’র নিথর দেহের হাত-পায়ের হাড় ভেঙ্গে দিল। সেই দৃশ্য
দেখে আমার বুকের ভেতরটা কেমন হু-হু করে উঠল। অসহায় ও অস্থির বোধ করতে লাগলাম। বড় দা বুঝতে পেরে আমাকে টেনে বাইরে নিয়ে এলেন। বেরিয়ে আসার মুহূর্তে, চোখের সামনে একে একে কতশত স্মৃতি ভেসে উঠল—খেলার মাঠে
আমাদের আগলে রাখা সেই ছায়ামূর্তি, তালপাতার নৌকা
বানিয়ে দেওয়া সেই হাত,
পকেট থেকে সাপ বের করে আমাদের চমকে দেওয়া সেই দুষ্টু হাসি, আর লাটিম ঘোরানোর সেই অবাক করা দক্ষতা। সবকিছু হঠাৎ করেই থেমে গেল। প্রিয় দা যেন এগিয়ে গেলেন, আর আমরা পিছনে পড়ে রইলাম।
হেস্টিংস, কোলকাতা
২৩ এপ্রিল ২০২৬

No comments:
Post a Comment