Pages

Wednesday, 21 March 2018

জিতে গেল চণ্ডিপুর - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



খবরটা আগেই চাউর হয়ে গেছিল পুরো এলাকায়বালাসপুর মাঠে ফাইনালে উঠেছে চণ্ডিপুর তাই মাঠে নামার আগেই বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল তুমুল উত্তেজনাষোল টিমের টুর্নামেন্টে মফস্বলের এই ফুটবল টিম, যাদের প্রত্যেকটা খেলামাদের বুক ধড়ফড় করে ওঠে, তারা আজ লড়বে শহরতলীর এক শক্তিশালী ও অভিজ্ঞ দলের বিরুদ্ধে। যেন শুধু একটা ফুটবল ম্যাচ নয় আমাদের স্বপ্ন, আমাদের অহংকার, আমাদের সম্মানের লড়াই।

 

হাট-বাজার ও চায়ের দোকান থেকে শুরু মন্দির ও মসজিদ পর্যন্ত, সর্বত্রে একটাই আলোচনাকে জিতবে ফাইনালে, কী হবে কালকে, চণ্ডিপুর পারবে তো? বাড়ির বড়রা প্রস্তুতি নিচ্ছিল বালাসপুর মাঠে যাওয়ারকিন্তু আমাদের মতো ছোটদের জন্য ছিল কড়া বারণ কেননা ফাইনাল ম্যাচ, প্রচুর লোক হবে সেখানে, তা নিয়ে উত্তেজনাও তুঙ্গে, ঝুটঝামেলাও হতে পারে। কিন্তু মন কি আর মানে! আমাদের বুকের ভেতর তখন শুধু একটাই তাগিদএই ম্যাচ না দেখলে যেন জীবনের একটা বড় কিছু মিস হয়ে যাবে।

 

ফলে আমি, লাবু, আমু ও সুলতান দা আমরা কজন চুপিসারে বেরিয়ে পড়লাম। তুলাই নদীর সরু পাড় ধরে, একে অপরের হাতে হাত রেখে, কখনো দৌড়ে, কখনো গুটি গুটি পায়ে, আবার কখনো খানিকটা থেমে একটু জিরিয়ে নিয়ে, এগিয়ে চললাম বালাসপুরের পথেমনে হচ্ছিল, আমরা যেন কোনো গোপন অভিযানে বেরিয়েছি। খানিকটা পথ এগোতেই দূর থেকে ভেসে আসতে লাগলো মানুষের গর্জন, বাঁশির শব্দ আর ঢোলের তালে তালে লোকজনের চিৎকার সে সব শুনে আমাদের হৃদস্পন্দন যেন আরও দ্রুত ও আরও তীব্র হয়ে উঠল। আমরা দ্রুত পা চালাতে আরম্ভ করলাম।  

 

মাঠে পৌঁছে দেখলাম, খেলা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। চারিদিকে মানুষের ঢল নেমেছেউল্লাস, উত্তেজনা ও চিৎকারে আকাশ-বাতাস যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। পূব দিকে একদল আদিবাসী তিরধনুক হাতে দাঁড়িয়ে আরেকদল ঢোল, করতাল, মাদল নিয়ে মুহুর্মুহু নেচে-গেয়ে উঠছে। আর যখনই চণ্ডিপুর বল নিয়ে আক্রমণ শানাচ্ছে, তখনই চারিদিক থেকে লোকজন একসাথে গর্জে উঠছেচাপাও চণ্ডিপুর, চাপাও!

 

মনে হচ্ছিল, পুরো মাঠটা যেন এক প্রাণে বেঁচে আছেএকসাথে নিঃশ্বাস নিচ্ছে, একসাথে দৌড়োচ্ছে, একসাথে লড়ছে। চণ্ডিপুর ফুটবল টিম সেদিন প্রাণপণ লড়েছিল। তাদের প্রতিটা পাসে ছিল নিখুঁত হিসে, প্রতিটা দৌড়ে ছিল জয়ের ক্ষুধা, আর প্রতিটা শটে ছিল স্বপ্নের ঝলক।

 

একবার সেন্টার ব্যাক থেকে তারাপদ দারুণ একটা লং বল তুললবল বাতাস চিরে গিয়ে পড়লো ফিলিপের পায়ে। ফিলিপ যেন জাদু দেখালএকজন, দুজন করে পরপর তিনজনকে ড্রিবল করে উঠে এল সামনে। তারপর পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে একটা মাপা ক্রস তুলল। বক্সের ভেতরে অপেক্ষা করছিল সলিম। সে লাফিয়ে উঠে হেড করলবলটা সোজা গোলপোস্টের দিকে ছুটে গেল... কিন্তু অল্পের জন্য ক্রসবারে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে গেল বাইরে চারিদিক থেকে একসাথে যেন একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলোশ্‌শ্‌শ্‌…!”

 

কিছুক্ষণ পরে আরেকটা সুযোগডান দিক দিয়ে বয়ে চলা আক্রমণ। স্বর্ণকমলের দুর্দান্ত পাস, ইর্‌শাদুল দ্রুত দৌড়ে গিয়ে বলটা কন্ট্রোল করল, তারপর মাটি ঘেঁসে পাস বাড়াল বক্সের ভেতরসামনে একেবারে ফাঁকা গোল! সলিম ছুটে এসে শট নিলকিন্তু প্রতিপক্ষের গোলরক্ষক অবিশ্বাস্য ডাইভ দিয়ে হাতের আঙুল ছুঁইয়ে বলটাকে পোস্টের বাইরে ঠেলে দিল। আমরা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলামগোলটা যেন হাতের নাগালে এসেও হারিয়ে গেল।

 

আরেকবার, ম্যাচের শেষদিকে, কর্নার পেল চণ্ডিপুর। পুরো মাঠ স্তব্ধ। আমরা যেন বুকের ধুকপুক আওয়াজও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি কর্নার কিক নিল ফিলিপবলটা বেঁকে এসে পড়ল গোলের মুখেহুড়োহুড়ির মধ্যে তারাপদ মাথা ছুঁইয়ে দিল। বলটা গোললাইনের একেবারে সামনে পড়ে ধীরে ধীরে এগোচ্ছিলআমরা প্রায় উদযাপন শুরু করে দিয়েছিলামকিন্তু শেষ মুহূর্তে এক ডিফেন্ডার ছুটে এসে লাইন থেকে বলটা ক্লিয়ার করে দিল! আর তা দেখে আমাদের বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল।

 

সেদিন এমন অসংখ্য সুন্দর ও নান্দনিক ফুটবল উপহার দিয়েছিল চণ্ডিপুর। কিন্তু ভাগ্য যেন সেদিন তাদের সহায় ছিল না। শেষ পর্যন্ত জয় তাদের অধরাই থেকে গেছিল।

 

খেলা শেষ হতেই অনেকের চোখে জলখেলোয়াড়দের, দর্শকদের, এমনকি আমাদের মতো ছোটদেরও। আমরা বুঝতে পারছিলাম না, কেন এত কষ্ট হচ্ছে শুধু মনে হচ্ছিলআমাদের কিছু একটা হয়েছে, আমাদের স্বপ্নটা ভেঙ্গে গেছে। কিন্তু আজ, এতদিন পরে, যখন সেই সেদিনের ম্যাচের কথা মনে পড়ে, মনে হয়সেদিন আমরা যেন হেরেও জিতে গেছিলাম কারণ, সেই চণ্ডিপুর টিমে ছিল এক অন্যরকম গল্প। সেই টিমে ছিল মুসলিম, ছিল হিন্দু, ছিল সাঁওতালসবাই ছিল একসাথে, এক হৃদয়ে বাঁধা। মাঠে তারা ছিল শুধু খেলোয়াড়, আর মাঠের বাইরে তারা যেন এক পরিবার তারা একসাথে জিততে চেয়েছিল, একসাথে লড়াই করেছিল, একসাথে হেরেছিল, আর একসাথে কেঁদেছিল।

 

আরও মনে হয়, আমাদের সেই সেদিনের চণ্ডিপুর যেন এক বৃহৎ ভারতের ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবিযেখানে কোনো ভেদাভেদ ছিল না, ছিল না কোনো বিভাজনের রেখা, না ধর্ম আর না জাতি নিয়ে গর্বের লড়াই ছিলছিল কেবল মিলেমিশে থাকার, পাশাপাশি বসবাসের, একে অপরের হাতে হাত রেখে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পথচলার গল্প

 

কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই ছবিটা যেন ধীরে ধীরে, দিন দিন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। আজকের পৃথিবীতে, বর্তমান সমাজে, সেই সরল ঐক্য আর সম্প্রীতির দৃশ্য যেন ক্রমশই বিরল হয়ে উঠছে। শুধু আমাদের দেশেই নয়, গোটা পৃথিবীজুড়ে সেই অদৃশ্য ফাটল ক্রমশ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।  

 

বে, যখনই মনে পড়ে সেই বালাসপুর মাঠ, সেই চণ্ডিপুর টিম, সেই একসাথে হাসা-কাঁদা মানুষগুলোতখন বুকের ভেতর কোথাও একটা আশার আলো জ্বলে ওঠে। মনে হয়, সেই দিনগুলো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি এখনও বেঁচে আছে, আমাদের স্মৃতির ভাঁজে, আমাদের অনুভবের গভীরে, আর আমাদের স্বপ্নের ভেতরে।

 

তপ্সিয়া, কোলকাতা

২১ মার্চ ২০১৮ 

No comments:

Post a Comment