আমি তখন খুব ছোট। কদমডাঙা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ি। জীবন ছিল তখন অত্যন্ত সরল ও সাদামাটা। সকাল হলেই মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙত। চোখ কচলাতে কচলাতে দেখতাম, বাইরে কুয়াশা ভেজা ভোর,
উঠোনে গরুর ঘণ্টার টুংটাং শব্দ, দূরে কোথাও কোনো বাড়ির উনুনের ধোঁয়া ধীরে ধীরে আকাশে উঠছে, আমি মুখ ধুয়ে বইখাতা নিয়ে পড়তে বসতাম। কাঁচা হাতে স্লেটের উপর চকপেন্সিল দিয়ে লিখতাম অ আ ক খ। কখনো
বাবা, কোনোদিন মা, তো কখনো দাদারা অ আ ক খ লিখে দিতেন
আর আমি তার উপর হাত বোলাতাম কিন্তু মনটা বেশিক্ষণ
বইয়ের পাতায় টিকত না। ফলে খানিকক্ষণ পরেই উঠে পড়তাম। তারপর খেয়েদেয়ে বাবার সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম। বাবা কাঁধে লাঙল নিয়ে হাঁটতেন, আর আমি তাঁর পেছন পেছন হাঁটতাম; বরং বলা ভালো, ছোট ছোট পায়ে একরকম ছুটতাম। মাঠে পৌঁছে বাবা জোয়াল গরুর কাঁধে রেখে বলতেন,
—“বাবু, তুই এইন্না
দাঁড়া, মুই আগে জোয়ালটা ঠিক করি বান্ধোঁ।”
তারপর শুরু হত হালচাষ। মাঠজুড়ে তখন ভোরের সোনালী রোদ। কাদা ভরা জমির ওপর লাঙলের ফলা ঢুকে গিয়ে উলটে দিচ্ছে
মাটির বুক। বাবার দু’টো হাত শক্ত করে ধরে আছে লাঙলের মুঠি, আর গরুরা কাঁধে জোয়াল নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। লাঙল এগোলেই মাটি যেন স্তরে স্তরে খুলে যাচ্ছে। আর তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে মাটির সোঁদা গন্ধ। সেই গন্ধে ভরে যাচ্ছে চারিদিক।
এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে, আমি ওই চাষের জমিতে বাবার পেছন পেছন হাঁটতাম। আর বর্ষাকালে আমার হাতে থাকত একটা ছোট্ট থলে। হালচাষের সময় জমির জলে ভেসে উঠত ছোট ছোট মাছ—চ্যাং,
পুঁটি, কাচকি। আমি আনন্দে
চিৎকার করে উঠতাম,
—“আব্বা, মাছ, মাছ!”
বাবা হেসে বলতেন,
—“ধরেক, ধরেক। আইজ তো দেখেছু ভালোই মাছ হবি।”
আমি কাদা মেখে,
হাঁটু পর্যন্ত জলে নেমে সেই মাছগুলো ধরতাম। হাত ফসকে আবার
জলে পড়ে যেত,
আবার ধরতাম। শেষে যতটুকু পারতাম থলের মধ্যে জমা করতাম।
তারপর দুপুরে যখন বাড়ি ফিরতাম, সেই থলেটা মায়ের হাতে
তুলে দিতাম, যেন এক অমূল্য ধন। মা অবাক হয়ে বলতেন,
—“এতলা মাছ, মোর বাপটা কুঠি পালি তে?”
আমি গর্ব করে, খানিকটা দম টেনে নিয়ে সিনা চওড়া করে, ডান হাতে আলতো করে বুক চাপড়ে বলতাম,
—“মুই পাথারত ধইছু।”
শুধু মাছ নয়,
আলুর মরসুমে আলু তোলার পরে যখন আবার জমিতে হাল চালানো হত, তখন মাটির ভেতরে লুকিয়ে থাকা আলু বেরিয়ে পড়ত। আমি বাবার পেছন পেছন হেঁটে সেগুলো কুড়োতাম। তারপর সেগুলোকে কখনো থলের মধ্যে জমাতাম, তো কখনো হাফপ্যান্টের পকেটে, আবার কখনো লুঙির
কোঁচড়ে।
মাঝেমধ্যে কাজের ফাঁকে আমরা মাঠের আলের ওপর লাহারি খেতে বসে পড়তাম। মা
বাড়ি থেকে পাঠিয়ে দিতেন পান্তাভাত। সঙ্গে রাতের অবশিষ্ট তরকারী, কোনোদিন আলু ভর্তা, কোনোদিন তিসীর শানা, আবার কোনোদিন ডাল ভর্তা, সাথে কিছু কাঁচা পেঁয়াজ ও কাঁচা লংকা।
বাবা বলতেন,
—“সকালের এই মিঠে রোদে পান্তাভাতের কী
স্বাদ! আর এই যে ভাতইন, এতেই আসল শক্তি।”
আলের ওপর বসে পান্তা খেতে খেতে দেখতাম, দূরে ধানের সবুজ খেত দুলছে,
আকাশে সাদা মেঘ ভাসছে, আর মাঠজুড়ে জমির আলে বসে অসংখ্য চাষি, সামনে তাদের পান্তাভাতের থালা। শৈশবের সেই পান্তাভাতের স্বাদ ছিল অদ্ভুত—কেন জানি,
আজকের কোনো দামি খাবারেও সেই স্বাদ ও শান্তি খুঁজে পাই না।
তখন আমাদের গ্রামে পানীয় জলের ব্যবস্থাও ছিল খুব সীমিত। এত বড় গ্রামে মাত্র তিনটে টিউবওয়েল ছিল—একটা পূবপাড়ে, একটা পশ্চিমপাড়ে,
আর একটা আমাদের বড়-বাড়িয়াতে। তাই অনেকেই কুয়োর জল খেত।
আমাদের বাড়িতেও একটা কুয়ো ছিল। সেই কুয়োর জলেই বাসন মাজা হত, কাপড় কাচা হত,
চান করা হত—এমনকি পানও করতাম আমরা।
সেই সময়, স্কুলে যেতে যেতে তেষ্টা পেলে আমরা তুলাই নদীর জল খেতাম। উত্তরের মাঠে গেলে বাটুয়াদীঘির জল, পূবের মাঠে
গেলে ফকিরকুড়ির জল। পুকুরের জল, গাঙের জল, চৌকার জল—যেখানেই জল পেতাম, সেখানেই দু’হাত জড় করে অঞ্জলি ভরে জল তুলে খেতাম।
সেইদিনগুলোতে তেষ্টা মেটানো ছিল খুব সহজ। কিন্তু সেই সহজতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল
ভয়াবহ বিপদও। মাঝেমধ্যে কলেরা-ডাইরিয়া’র মতো রোগ গ্রামে মহামারী রূপে ছড়িয়ে পড়ত। কত পরিবার যে সেই সময় প্রিয়জন হারিয়েছে!
তারপর সময়ের স্রোত আমাকে অনেক দূরে নিয়ে এসেছে। প্রায় কুড়ি বছরের দীর্ঘ পথ
পেরিয়ে আজ আমি থাকি কোলকাতায়। এখানে আমি একটা সরকারি চাকরি করি। কলেজে গেলে অ্যাকুয়াগার্ডের জল খাই, ফ্ল্যাটে ফিল্টারের জল, তো মিটিং ও সেমিনারে মিনারেল ওয়াটার। ফিল্টার্ড জল ছাড়া যেন আর কোনো জল আমার জিভে জায়গা পায় না।
তবে এখনো যখন ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে যাই, যেন অন্য এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াই। দেখি, চৈত্রের প্রখর দুপুরে মানুষ কাজ করছে মাঠে। মাথার ওপর আগুন ঝরা রোদ, খাঁ খাঁ মাঠ,
তবু তারা থেমে থাকে না। কারও মাথায় ছেঁড়া লুঙি, কারও কাঁধে একফালি গামছা। কারও গায়ে বহু পুরোনো জীর্ণ গেঞ্জি। ঘাম ঝরছে দরদর করে। তবু তাদের কাজ থামে না। একটা জিনিস অবশ্য বদলেছে—তারা এখন আর পুকুর বা গাঙের জল খায়
না। বাড়ি থেকে বোতলে করে টিউবওয়েলের বা গভীর নলকূপের জল নিয়ে আসে। আর সেই বোতলগুলোকে পুকুরের জলে, নয়ঞ্জলির পানিতে, কিংবা ক্ষেতের কাদাজলে ডুবিয়ে রাখে—যাতে রোদে জল গরম হয়ে না যায়।
দূর থেকে সেই দৃশ্যগুলো দেখে আমার বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে ওঠে। অজান্তেই আমার হাত দু’টো প্রসারিত হয়ে যায়—
মনে হয় যেন বাবার সেই শক্ত, রুক্ষ,
অথচ স্নেহমাখা হাত দু’টোকে আবার ধরছি। আমি খুঁজি… স্মৃতির ভেতর খুঁজি…হাতড়াই…
কিন্তু খুঁজে আর পাই না।
কয়েকদিন গ্রামে কাটিয়ে আবার ফিরে আসি তিলোত্তমার বুকে। এখানে অট্টালিকা আছে,
আলো আছে, চাকচিক্য আছে, আড়ম্বর আছে, আছে দেখনদারিতা। কিন্তু এখানেও পরিষ্কার ও স্বচ্ছ জল সবার ভাগ্যে জোটে না। অনেক
মানুষ আজও টাইম-কলের সামনে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে—বালতি,
বোতল, ড্রাম, গামলা নিয়ে। সামান্য জল পাওয়ার জন্য ঝগড়া হয়, হাতাহাতি হয়। তখন মনে হয়, আমরা দীর্ঘ সংগ্রাম
করে স্বাধীনতা পেয়েছি। কিন্তু হয়তো তার থেকেও কঠিন আর দীর্ঘ সংগ্রাম এখনও বাকি— প্রত্যেক মানুষের মুখে এক ফোঁটা নিরাপদ পানীয় জল তুলে দেওয়ার সংগ্রাম।
বোধ করি, আজও অনেক মানুষের কাছে জল মানে শুধু তেষ্টা মেটানো নয়। জল মানে বেঁচে থাকার অধিকার। তাই আমাদের আবার প্রস্তুত
হতে হবে,
আরও একটি লড়াইয়ের জন্য। তবে এবারের লড়াইটা ক্ষমতার জন্য নয়, না সীমান্তের জন্য, এবারের লড়াইটা হবে জীবনের জন্য— মানুষের জন্য—জলের জন্য।

No comments:
Post a Comment