২০০৯-এর শেষের দিকে আমি গ্রাম ছেড়ে কোলকাতায় চলে আসি। ভর্তি হই মৌলানা আজাদ কলেজে, আরবি অনার্স নিয়ে। দুরত্ব ও মেধার ভিত্তিতে সিট পেয়ে
যাই বেকার গভর্নমেন্ট হোস্টেলে। মফঃস্বলের সহজ-সরল পরিসর ছেড়ে
হঠাৎই শহরের বিস্তীর্ণ ও
বিশাল জগতে এসে পড়েছি; খালের ছোট্ট মাছ যেমন আচমকা সমুদ্রে পড়ে দিশেহারা হয়ে যায়,
আমার অবস্থাও ছিল খানিকটা সেইরকমই। চারপাশে অচেনা মানুষ, অজানা পরিসর,
জীবনধারার
অচেনা গতি। আর তার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার নীরব সংগ্রাম।
যতদূর মনে পড়ে, কোলকাতায় আমার শুরুর দিনগুলো মোটেও সহজ ছিল না। মানসিক টানাপোড়েন তো ছিলই, তার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল আর্থিক অস্বচ্ছলতার এক অদৃশ্য শিকল। হোস্টেল ফি, মেসের খরচ,
বইখাতা কেনা, অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচাপাতি—সবকিছুই হিসেব কষে করতে হতো। তবে আল্লাহর অশেষ রহমতে ধীরে ধীরে নিজেকে গুছিয়ে নিতে শুরু করলাম। মনের ভেতরটা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠলো। বুকের ভেতর প্রতিকূল
পরিস্থিতির সাথে মোকাবিলা করার সাহস সঞ্চিত হল।
কোলকাতায় এসে আমি যখন আর্থিক বাস্তবতার নাগপাশে আবদ্ধ
হয়ে হাঁসফাঁস করছিলাম, ঠিক তখনই আমার জেলার এক
মহানুভব ব্যক্তির সহায়তায় আমার একটা স্কলারশিপের বন্দোবস্ত হলো। এক বেসরকারী সংস্থা থেকে প্রতি মাসে নির্ধারিত কিছু টাকা। তিন মাস অন্তর অন্তর একসঙ্গে সেই টাকা হাতে পেতাম। আর সেই টাকা হাতে পেয়ে মনে হতো, যেন নিঃশব্দে কেউ এসে পাশে দাঁড়িয়েছে। যেন কানে কানে বলছে,
‘হাল ছেড়ো না, আমরা আছি’।
কিন্তু সেই স্কলারশিপ সংগ্রহ করতে গিয়ে বারবার এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ত।
ইংরেজি,
বাংলা, ইতিহাস ও ভূগোলের ছাত্রছাত্রীদের মাসে প্রায় আমার দ্বিগুণ টাকা দেওয়া হচ্ছে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার ছাত্রছাত্রীদের জন্য বরাদ্দ তো তারও বেশি। আর আমাকে তাদের তুলনায় অনেক কম। এই বৈষম্যের হিসেবটা কোনোভাবেই মেলাতে পারতাম না। এসব দেখে মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগত—জ্ঞান কি তবে বিষয়ের উপর নির্ভর করে কম-বেশি মূল্য পায়? নাকি আমাদের অধ্যয়ন, আমাদের পরিশ্রমের মূল্য কম? সেই প্রশ্নের
উত্তর আমার অজানাই রয়ে গেছে।
এ ধরণের আরও একটা ঘটনা মনে পড়ে। ২০০৮ সালের কথা। তখন আমি ফাজিল অর্থাৎ একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। একদিন শুনলাম, একটি আদর্শ সংগঠন সংখ্যালঘু ছাত্রছাত্রীদের ভালো ফলাফলের
ভিত্তিতে এককালীন একটা স্কলারশিপ দেয়। শর্ত—ভালো রেজাল্ট, চরিত্রবান এবং পড়ুয়া হতে হবে। চারপাশের অনেকে
উৎসাহ দিলেন। আমিও আবেদন
করলাম। মনে মনে আশাও করেছিলাম, স্কলারশিপটা আমি পাবো।
কিন্তু ওই স্কলারশিপটা আমি পাইনি। বলা ভালো, আমাকে দেওয়া হয়নি। তবে যে মেয়েটি স্কলারশিপটা পেয়েছিল,
সে-ও আমার জেলারই। এবং তাকে আমি চিনতামও। আজও অন্তরের এক কোণে প্রশ্নটা বিঁধে রয়ে গেছে—যোগ্যতার বিচারে কি সত্যিই সে আমার চেয়ে এগিয়ে ছিল? উত্তরটা আমার নিজের কাছে কখনোই পুরোপুরি ‘হ্যাঁ’ হয়ে ওঠেনি। তবুও
মেনে নিয়েছিলাম,
‘হয়তো আমার কপালে নেই’ ভেবে।
তারও আগে, ২০০৫-এ বেনারস থেকে ফিরে আমি আলিম পরীক্ষার প্রস্তুতি আরম্ভ করলাম। বাড়িতে
উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় চলে গেলাম বেলপুকুরে। সেখানে মাদ্রাসায় পড়ানোর পাশাপাশি
নিজের পড়াশোনাও জারি রাখলাম। দিনরাতের পরিশ্রম, পড়ার প্রতি
একাগ্রতা, মনের জেদ—সব মিলিয়ে ফলাফলও হলো আশানুরূপ। আলিম পরীক্ষায় আমি রাজ্যে প্রথম হলাম। ফলস্বরূপ নানা জনের স্বীকৃতি, ভালোবাসা, দু’আ এবং বহু পুরষ্কারও পেলাম। তারপর ভর্তি হলাম বাটনা সিনিয়ার মাদ্রাসায়, ফাজিলের ছাত্র হিসেবে। পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আরবি পড়ানোর কাজ জুটে গেল। শিক্ষকতার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের
পড়াশোনাও সমান গতিতে চলতে থাকলো।
আমার এই কাজটি পাওয়ার
পেছনে একজনের বিশাল অবদান ছিল। তিনি আমার দেখা সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষদের
মধ্যে অন্যতম। অনেকে তাঁকে ‘চাচা’ বলে ডাকেন। কেউ ভালোবেসে, তো কেউ শ্রদ্ধা ভরে; আবার কেউবা অবজ্ঞার সুরে, তাঁর কোনো পুঁথিগত ডিগ্রি নেই বলে। কিন্তু তাঁর সততা, নিষ্ঠা, কর্মপ্রিয়তা এবং ধর্মনিরপেক্ষ মানসিকতায় আমি এতটাই মুগ্ধ যে, তাঁকে আজও ‘স্যার’ বলেই সম্বোধন করি।
সেই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে আমি আমার দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতাম। ছাত্রদের পড়ানো, তাদেরকে আদবকায়দা শেখানো, তাদেরকে গড়ে তোলা ইত্যাদি। এসবের মধ্যে এক ধরণের তৃপ্তিও ছিল। কিন্তু এখানেও একটা প্রশ্ন আমাকে তাড়া করতো—মাইনের ক্ষেত্রে এত বৈষম্য কেন?
একই প্রতিষ্ঠানে একই রকমের কাজ করেও পারিশ্রমিক বা মাসোহারায় কেন এত ফারাক?!
তারপর তুলাই দিয়ে বহু জল গড়িয়ে গেছে। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে, বহু লড়াই উৎরে আজ আমি তিলোত্তমার বুকে একটা সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করি। বাহ্যিক ভাবে জীবন অনেকটাই বদলেছে। আর্থিক স্থিতি খানিকটা স্বচ্ছল হয়েছে, সমাজ অল্পবিস্তর
সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছে,
একটা নিজস্ব পরিচয়ও তৈরি হয়েছে।
তবে আজ যখন নিজের চারপাশে তাকাই,
দেখি—সরকারি ব্যবস্থায়
অমন বৈষম্য নেই। বাংলা,
আরবি, ইতিহাস বা ইংরেজি কোনো বিষয়েই মাইনের পার্থক্য করা হয় না। বিজ্ঞান হোক বা কলা, সবাই সমান মর্যাদা পায়। সরকারি স্কলারশিপ, মাইনোরিটি স্কিম, মেরিট-কাম-মিন্স সব জায়গাতেই এই
সমতা বজায় আছে। এমনকি গবেষণার ক্ষেত্রেও সমতা লক্ষ্য করা যায়, যেমন জে আর এফ—সেখানেও বিভাজন নেই। তাহলে ওই বৈষম্যগুলো
কোথা থেকে এসেছিল? কেন তখন আমাদেরকে অমন অসমতার শিকার হতে হয়েছিল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো কোনোদিন জানা যাবে না। কিন্তু অতীতের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলো আমার ক্ষেত্রে শাপে বর হয়েছে, সেই অভিজ্ঞতাগুলো আমাকে জীবনের বাস্তবতা শিখিয়েছে। আমাকে সমতা, ধৈর্য, সংগ্রাম ও আত্মবিশ্বাসের মূল্য বুঝিয়েছে। আর তাই, আজ যখন পিছনে ফিরে তাকাই, কষ্টের সেই দিনগুলোকেও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। আর তখন যেন কানে ভেসে আসে এক
অস্ফুটে উচ্চারণ— “হে দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছো মহান...”।
তপ্সিয়া, কোলকাতা
১৯ মার্চ ২০১৮

No comments:
Post a Comment