আমি সবে মাস্টার্স কমপ্লিট করে পিএইচডিতে এডমিশন নিয়েছি। তপ্সিয়ার কুষ্টিয়া মসজিদের কাছে এক রুমের একটা ফ্লাট ভাড়া নিয়ে থাকি। নিজে ডাল-আলু ভর্তা যা পারি রান্না করে খাই। যেহেতু রমজান মাস তাই রোজা, ক্লাস, গবেষণার কাজ নিয়ে প্রায় জেরবার অবস্থা। ফলে কোনোরকমে কুড়িটা রোজা পার করেই গ্রামের বাড়ি চলে গেলাম। গ্রামে গিয়ে দেখি, আকাশে-বাতাসে ঈদের গন্ধ। সকলের চোখে নতুন পোশাকের স্বপ্ন, লাচ্ছা ও সেমাইয়ের মিষ্টি কল্পনা এবং সবকিছুকে ঘিরে শিশুদের অস্থির অপেক্ষা। আর এই আনন্দের যথাযথ প্রস্তুতি নিতে তারাবীহ্র নামাজের পর মসজিদের উঠোনে একটি মজলিস ডাকা হয়েছে।
আমাদের গ্রামটা চণ্ডিপুর মৌজার সব থেকে বড় গ্রাম। প্রায় এক শ পরিবারের বসত। আট-দশটি বাড়ি ছাড়া বাকি সবাই মুসলিম। তবে সংখ্যার হিসাব কখনোই বড় হয়ে ওঠেনি আমাদের গ্রামে; বড় হয়ে উঠেছে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা এবং সকলের শান্তিপূর্ণ বসবাস।
আমাদের গ্রামে ঈদ আসে যেমন আপন আনন্দ নিয়ে, তেমনি পুজোও আসে খোলা হৃদয়ের আহ্বানে। বিবাহ, আকিকা, অন্নপ্রাশন, শোক কিংবা উৎসব—সব ক্ষেত্রেই একে অপরের পাশে দাঁড়ানো যেন অলিখিত নিয়ম। ধর্ম এখানে দেয়াল নয়, বরং শালীন দূরত্ব বজায় রেখে সহাবস্থানের সাঁকো।
ঈদগাহ পরিষ্কার, নামাজের সময়সূচি
ও অন্যান্য দায়িত্ব বণ্টন—একে একে সবকিছু
নিয়েই আলোচনা হল মজলিসে। শেষদিকে আলোচনার কেন্দ্রে এল ফেতরা। মৌলানা সাহেব
শান্ত কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন,
শুরু হল কথার পীঠে কথা। যুক্তি এল, পাল্টা যুক্তিও
এল। ধীরে ধীরে কথা কাটাকাটি আরও বাড়তে লাগল এবং এক পর্যায়ে তা বিতর্কের রূপ ধারণ
করলো। অবশেষে ইমাম সাহেব ঘোষণা দিলেন—
অধিকাংশ লোক টাকার জিগিরকেই মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানাল। এবং সেই সিদ্ধান্তকে মান্যতা দিয়েই মজলিস সমাপ্তির ঘোষণা দেওয়া হল। লোকজন একে একে উঠতে লাগল। চৌধুরী সাহেব শালটা কাঁধে ঝুলিয়ে হাসিমুখে বাড়ির পথে হাঁটা দিলেন। হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে হিসেব কষে দেখলেন— “পাঁচজনের পরিবার। ২৫০ টাকা। তেমন কিছুই না!” বাড়িতে তো তুলাইপাঞ্জি চাল খাওয়া হয়; মাথা পিছু আড়াই কিলো করে চাল দিলে খরচ আরও বেশি পড়ত। টাকা দেওয়াই তাঁর জন্য সুবিধাজনক।
মজলিসের এক কোণে তখনো চুপচাপ বসে আছেন চাঁদু মোহাম্মদ। চাঁদু চাচা সহজ, সরল মানুষ। পেশায় দিনমজুর। পরনে একটা পুরনো পাঞ্জাবী। ঘাড়ের কাছে ক্ষয়ে গেছে খানিকটা। ঠিক ওই জায়গায় তিন ভাঁজ করে রাখা গামছাটা। সারাদিন খেটে যা পান, তা দিয়েই চলে তাঁর সংসার। রেশনে মাথা পিছু আড়াই টাকায় এক কিলো চাল পান তিনি। সেই চালই তাঁর মাসকাবারি খাবার। মাথা পিছু ৫০ টাকা ফেতরা শুনে তাঁর চোখ দুটো মাটিতে গেঁথে গেল। ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে আছেন। কারও সঙ্গে কোনো কথা নেই। মনে মনে হিসেব কষছেন— “পঞ্চাশ টাকায় রেশনে বিশ কিলো চাল পাবো..., বিশ কিলো চাল!”
এই বিশ কিলো চালে তাঁর পরিবারের আধা মাস চলে যায়। কিন্তু সে কথা বলার মতো সাহস তাঁর নেই। মজলিসে কেউ তাঁকে জিজ্ঞেসও করল না— “চাঁদু, তোমার কি অসুবিধা হবে?” কেউ ভাবল না, ফেতরার এই অঙ্ক কারো জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কি না।
চাঁদু চাচা উঠে দাঁড়ালেন। মসজিদের আলো পেছনে ফেলে অন্ধকার পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে আপন মনে বলতে লাগলেন—ফেতরা তো গরিবের হক। অভাবী ও অসহায় মানুষদের সাহায্যের জন্যই তো ফেতরার বিধান। তবে আজ এই ফেতরা সবচেয়ে ভারী হয়ে চাপল গরিবেরই কাঁধে।
২৪/১১/২০১৬

No comments:
Post a Comment