Pages

Thursday, 11 April 2019

বদিউর রহমানঃ মীরা, কেমন আছ?




মীরা, কেমন আছ?
বদিউর রহমান

“মীরা কেমন আছ?” কথাটা বলতে চেয়েও বলতে পারিনি। সে তখন সস্তা মদের নেশায় টলতে টলতে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। চুলগুলো অবিন্যস্ত, ক্ষুধাতুর শীর্ণকায় শরীরটাকে টানতে টানতে। মুহূর্তের জন্য তার থেমে যাওয়ায় আমার ধারণা সেও বিলক্ষণ আমাকে চিনতে পেরেছে। হয়তো সেও কুশল জিজ্ঞাসা করতে চেয়েছিল। ছোটবেলার এক খেলার সঙ্গীকে।
আমাদের বাড়ির অনতিদূরে আমাদের একটা পুকুর আছে। পশ্চিম পাড়ে বেশ কিছু আমগাছ। একপাশে রউফদের মাটির ঘর। ওর বাবা একজন রাজমিস্ত্রী। বিহারের লোক। নন্দীবাবু তাদেরকে ঐ জায়গায় থাকতে দিয়েছিলেন।
নন্দীবাবুর বিশাল রাইস মিল। ধান শুকানোর জন্য বিস্তৃত এলাকাজুড়ে সিমেন্ট করা ঘেরা চাতাল। সেই চাতাল, দেওয়াল ইত্যাদিতে প্রায়শই মিস্ত্রী কাকুর কাজ। তাই তাদেরকে নন্দী বাবুর ঐ জায়গায় বসবাস করতে দেওয়া। মিস্ত্রী কাকুর ছেলেমেয়ে—আনোয়ার, রউফ, যুবাইদা কাউকে কখনো স্কুলে যেতে দেখিনি। তারা ছোট থেকেই লোকের বাড়ি কাজ করত। আনোয়ার ভাই আমাদের বাড়িতে বেশ কয়েক বছর ছিল। তার ছোট ভাই রউফ ছিল আমার বয়সী। সে ছিল ভীষণ দুরন্ত ও সাহসী। যুবাইদা তাদের ছোট্ট ফুটফুটে বোন। সুন্দর মুখশ্রী। গায়ের রঙটা চাপা হলেও ভারি মিষ্টি ছিল তার চেহারা। কে বলবে যে সে এক রাজমিস্ত্রীর মেয়ে।
রউফদের বাড়ির কাছে একটা আমগাছের ডালে বাঁধা ছিল একটা দোলনা। কখনো কখনো খেলার জন্য রউফদের বাড়ি যেতাম। দোলনাটা ছিল বিশেষ আকর্ষণ। আমরা পালা ক’রে দুলতাম। সেখানে মাঝেমধ্যেই আর একটা মেয়ে আসত। নাম তার মীরা। সে দোলনা চাপায় খুব পটু। আমরা যত জোরে তাকে দোলা দিতাম সে নির্ভয়ে দোল খেত আর ততোধিক জোরে হাসত। তার হাসিটা মনে হতো পর্বত শিখর থেকে ঝরে পড়া প্রবল স্রোতের ঝর্ণা। অমন নির্মল হাসি খুব কম শুনেছি। মীরা ছিল ছিপছিপে শ্যামবর্ণের। কাটা কাটা নাক চোখ। হাসলে পরে সারিবদ্ধ উজ্জ্বল সাদা দাঁতগুলো মুক্তমালার মতো দেখাত।
একদিন বিকেলে দোলনা চড়ার পর রউফ বলল, “চল বালির পাহাড়ে”। নন্দী বাবু বালির খাদ করছে আর বালিগুলো মাটির তলা থেকে তুলে পাহাড়ের মতো স্তূপ করা বালির পাহাড় ছিল অনতিদূরে। অতএব সেখানে যেতে কোনো বাধা ছিল না।
রউফের দেখাদেখি আমরা সকলে বালির পাহাড়ে উঠলাম। অনেক উঁচুতে উঠে রউফ নীচের বালিতে দিল ঝাঁপ। আমরাও বালিতে ঝাঁপ  দেওয়া খেললাম। বালির স্তূপে ঝাঁপ দেওয়ায় কোনো কষ্ট নেই। আছে বেশ শিহরণ। এক নতুন ধরণের খেলা। বেশ উপভোগ করলাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগে আমরা সকলে যে যার বাড়ি অভিমুখে রওয়ানা দিতে চাইলে মীরা বলল “আমি এখন বাড়ি যাব না। বাড়িতে এখন লোক থাকে। মা মারবে।” তাকে বললাম, “সন্ধ্যাবেলায় পড়তে বসবি না?” সে বলল, “আমি পড়ি না। তোদের মতো স্কুলেও যাই না।” ভেবেছিলাম ওর কী মজা! পড়াশুনোর কোনো ঝক্কি ঝামেলা নেই। দিনরাত শুধু খেলা আর খেলা।
তারপর যত বড় হয়েছি আমার খেলাধূলা তত কমেছে পড়াশুনোর চাপে। বিশিষ্ট বিষয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য ছাড়তে হয়েছে নিজের গ্রাম। দীর্ঘদিন কলকাতা শহরে থাকতে থাকতে ভুলে গিয়েছিলাম অনেক কথা, বহু চেনা-জানা মুখ। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর পর হলেও মীরাকে চিনতে ভুল করিনি যদিও ছেলেবেলার মীরার সঙ্গে বর্তমান মীরার আকাশ-পাতাল তফাৎ। বর্তমান মীরা বিগত দিনের জীবন্ত প্রেতাত্মা। চেনা সত্ত্বেও তাকে কুশল জিজ্ঞাসা করতে পারলাম না। ছেলেবেলায় বুঝিনি, বড় হয়ে জেনেছিলাম ওরা নিষিদ্ধ এলাকার মানুষ। এক সময় মীরা ছিল নির্মল, নিষ্পাপ। খেলা করেছি নির্দ্বিধায়। এখন তাকে আমার জিজ্ঞাসা করা যাবে না “মীরা কেমন আছ?”

০২-০৬-২০০৭
সল্টলেক, কলকাতা


Thursday, 4 April 2019

স্যার বদিউর রহমান শতকোটি অভিনন্দন আপনাকে!



স্যার বদিউর রহমান, শতকোটি অভিনন্দন আপনাকে!
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

অধ্যাপক মুহাম্মদ বদিউর রহমান। পশ্চিমবঙ্গজুড়ে আরবি মহলের  একটি সুপরিচিত নাম। ছাত্রদের মাঝে "বি আর স্যার" নামে অধিক চর্চিত। পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি ভারতের অন্যান্য রাজ্য এবং বাংলাদেশেও তিনি এক সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। ১৯৮৩ থেকে শিক্ষকতা করছেন। কয়েক দশক যাবৎ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। বিভাগীয় প্রধানের পদও সামলেছেন বহুবার। ২০১২ সালে অবসর গ্রহণ করার পরও কয়েক বছর এক্সটেনশন-এ ছিলেন। সে-সময়েই (২০১২-২০১৪) আমি তাঁর শিষ্যত্ব লাভের সুযোগ পাই। বর্তমানে তিনি আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগে ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি রূপে কর্মরত। 

শিক্ষকতার পাশাপাশি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট মেম্বার, সেনেট মেম্বার, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল মেম্বারের দায়িত্বও সামলেছেন। তাঁর এক অপূর্ব গবেষণা কর্ম হল "ইস্‌লামিক স্টাডিজ ইন্‌ বেঙ্গল"। এটি ছিল স্যারের পি এইচ ডি-র থিসিস। ডক্টর ত্বহা হুসাইন এর তিনি অনুরাগী। তাঁর পাণ্ডিত্য ও প্রতিভা সম্পর্কিত একাধিক আর্টিকেলও লিখেছেন। সেগুলি পরবর্তীতে "এসেজ অন ত্বহা হুসাইন" নামে বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে। আরবি সাহিত্যের ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর একটি খুব সুন্দর বইও আছে, "হিস্ট্রি অফ এরাবিক লিটারেচার" নামে। এছাড়া বিভিন্ন পত্রিকা ও জার্নালে তাঁর বহু মূল্যবান আর্টিকেল ও গবেষণা পেপার প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর গবেষণা ও কাজকর্মের মুখ্য উপজীব্য হল--  "রবীন্দ্রভাবনা ও আরববিশ্ব", "রবীন্দ্রনাথ ও আরবজগৎ", বঙ্গভূমিতে আরবি চর্চার ইতিহাস, আলিয়া মাদ্‌রাসা ও ওরিয়েন্টালিস্টদের অবদান। আল্লামা মাসুমি, প্রোফেসর মাসুদ হাসান, প্রোফেসর যুবায়ের খান, প্রোফেসর রাহাতুল্লাহ প্রমুখদের খুব কাছের এবং প্রিয় ছাত্র ছিলেন। তাঁদের সম্পর্কে স্যারের কিছু স্মৃতিচারণামূলক তথ্যবহুল রচনাও রয়েছে। 

এসবের পাশাপাশি তিনি কবিতা লেখেন। আরবি ও বাংলা উভয় ভাষায় কাব্য চর্চা করেন। বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর বহু কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বহু ছোটগল্পেরও স্রষ্টা। তাঁর অপূর্ব কয়েকটি ছোটগল্প হল-- ছাতা কাহিনী, টাইম বাবু, ইংরেজি শেখা, মাস্টার মশাই এবং সবই মায়া। বাংলা ও আরবির পাশাপাশি ইংরেজি, হিন্দি এবং উর্দু সাহিত্যেও স্যারের বেশ দখল রয়েছে। ক্লাসে আরবি কাব্যকবিতা বা অন্য কিছু পড়ানোর সময় হরহামেশায় তিনি শেক্সপিয়ার, কিটস, ওয়ার্ডসওয়াথ, মুন্সী প্রেমচাঁদ, গালিব, ইকবাল, নজ্রুল, শরৎ, মাইকেল, রবি ঠাকুর প্রমুখদের রচনার উদ্ধৃতি দিতেন।      

বাংলার বর্তমান প্রজন্মের আরবির শিক্ষকরা প্রায় সকলেই তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ছাত্র। সুঠামদেহী, সুশ্রী, মিতভাষী এই মানুষটি বরাবরই প্রচারবিমুখ। কিন্তু সূর্যের আলো তো ছড়াবেই। ফুলের সৌরভও তো আবদ্ধ থাকে না, তার ধর্মই যে বিচ্ছুরিত হওয়া। আর তাই আরবি ভাষা ও সাহিত্যে অনবদ্য অবদানের জন্য এবার তাঁকে 
 রাষ্ট্রপতি পুরস্কারে সম্মানিত করা হল। রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি বেঙ্কাইয়া নাইডু তাঁর হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন। অধ্যাপক রাহাতুল্লা ও অধ্যাপক শহীদুল্লাহ সাহেবের পর আরবি ভাষা ও সাহিত্যের সেবার জন্য তৃতীয় বাঙালি অধ্যাপক হিসাবে তিনি এই সম্মাননা লাভ করেন।

২০১২ সালে স্নাতকোত্তরে উঠে স্যারের শিষ্যত্ব গ্রহণের সৌভাগ্য হয় আমার। সেসময় ত্বহা হুসাইনের প্রতি স্যারের অনুরাগ, তাঁর পাণ্ডিত্য ও প্রতিভা সম্পর্কিত স্যারের  লেখাগুলো আমার ভাবনার দৃষ্টিকোণকে বদলে দেয়। পরবর্তীতে আরবি সাহিত্যের ইতিহাস বিষয়ক স্যারের বইটা এবং "রবীন্দ্রভাবনা ও আরববিশ্ব" বা "রবীন্দ্রনাথ ও আরবজগৎ" সম্পর্কিত স্যারের একাধিক আর্টিকেল আমাকে পথ দেখায় অনুবাদ সাহিত্যের। অনুপ্রাণিত করে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে কাজকর্ম করতে। তারপর প্রতিনিয়ত, প্রতিদিন, সময়অসময়ে শিখতে থাকি কাব্যানুবাদের কলাকৌশল ও খুঁটিনাটি স্যারের কাছে।

বিশ্বকবি রবি ঠাকুরের আরব ও পারস্য ভ্রমণ। সেখানে আধুনিক যুগের কবি সম্রাট আহ্‌মাদ শাওক্বির বাড়িতে তাঁদের আলাপ, এবং হুসাইন শাওক্বির "আবি শাওক্বি" গ্রন্থে তার অবতারণা, ইরাকে গিয়ে কবি আয্‌-যাহাবির আপ্যায়ন, ইরান পৌঁছে শিরাজির সমাধিতে ফুল দেওয়া, এবং সে বিষয়ে খোদ রবি ঠাকুরের "পারস্যে" নামে বই লেখা এমন অনেক তথ্য উপস্থাপন করে স্যার বাঙালি আরবি পড়ুয়াদের সম্মুখে গবেষণার একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।

তপ্সিয়া, কলকাতা
০৫-০৪-২০১৯ 

Sunday, 17 March 2019

আব্দুল মাতিন ওয়াসিমঃ জল ও জীবন এবং আমি...!


Image result for লাঙ্গলের পেছনে ছোট ছেলে
জল ও জীবন এবং আমি...! 
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



আমি তখন খুব ছোট। পড়ি কদমডাঙা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সকালে উঠে, কিছুক্ষণ বইখাতা নিয়ে বসতাম। তারপরে খেয়েদেয়ে বাবার সাথে যেতাম মাঠে। বাবা হাল বাইতেন আর আমি বাবার পেছন পেছন থাকতাম। বর্ষাকালে সঙ্গে থাকতো একটি থলে। তখনকার দিনে হাল-চাষের সময় জলের সাথে ভেসে আসত ছোট ছোট মাছ। সেগুলি ধরে থলের মধ্যে রাখতাম। দুপুর বেলা বাড়ি ফিরে মায়ের হাতে তুলে দিতাম সেই মাছগুলি। আবার আলু তোলার পর আলুর খেতে হাল বাইলে, খুঁজে না-পাওয়া আলুগুলো বেরোতো; আর আমরা সেগুলো কুড়িয়ে থলেতে, কখনো হাফপ্যান্টের পকেটে, কখনো লুঙির কোছায় রাখতাম। প্রায়ই মাঠের আলে বসে কাঁচা পেঁয়াজ আর কাঁচা লংকা দিয়ে বাবার সাথে পান্তাভাত খেতাম পরমানন্দে। 

তখন আমাদের গ্রামে জলের ব্যবস্থা খুব ভালো ছিল না; টিউব-ওয়েলের পাশাপাশি লোকে কুয়োর জলও খেত। আমাদের অত বড় গ্রামে মাত্র তিনটে টিউবওয়েল ছিল; পূব পাড়ে একটা, পশ্চিম পাড়ে একটা, আর একটা আমাদের বড়-বাড়িয়াতে। তবে কুয়ো ছিল বেশ ক'টা। খোদ আমাদের বাড়িতেই ছিল একটা। কুয়োর জলে বাসন মাজা, কাপড় কাঁচা, চান করা সবই করতাম। এমনকি পানও করতাম। 

সেদিনগুলিতে জল পান নিয়ে তেমন মাথা ব্যাথা ছিল না কারোর। এর জন্য অবশ্য কলেরা-ডাইরিয়ার মতো মহামারী এবং অত্যন্ত ভয়ানক পরিস্থিতির সম্মুখীনও হতে হয়েছে প্রান্তিক মানুষদের। সেসময় স্কুলে গিয়ে আমরা তুলাই নদীর জল পান করেছি। উত্তরের মাঠে গেলে বাটুয়াদীঘির জল, পূবের মাঠে গেলে ফকিরকুড়ির জল, এছাড়াও পুকুরের জল, গাঙের জল, চৌকার জল আমাদের তেষ্টা মিটিয়েছে। 


তারপর এক দীর্ঘ যাত্রা, প্রায় কুড়ি বছরের...। 
এখন আমি থাকি কোলকাতায়। ভালো মাইনের সরকারী চাকরি করি। কলেজে গেলে অ্যাকুয়াগার্ডের জল আর ফ্ল্যাটে মিনারেল ওয়াটার; এর বাইরের জলের সাথে আমার জিভের আর তেমন সাক্ষাৎ হয় না বললেই চলে। এখনো যখন মাঝেমধ্যে ছুটিতে গ্রামের বাড়ি যাই, দেখি অসংখ্য মানুষ, পুরুষ-মহিলা সকলে চৈত্রের জ্বলন্ত দুপুরে খাঁ খাঁ মাঠে কাজ করছে; মাথায় একটা ছেঁড়া লুঙি বা এক ফালি কাপড়। গায়ে বহু পুরনো জীর্ণ একখানা গেঞ্জি। কারুর অবস্থা আরও করুণ...। 

তবে তাঁরা এখন আর গাঙের জল খায় না। বাড়ি থেকে প্লাস্টিকের বোতলে করে জল আনে। সেই বোতল পুকুরের জলে বা গাঙের পানিতে বা খেতের কাদাজলে ডুবিয়ে রাখে; যাতে জল গরম না হয়। এসব দৃশ্য দেখে আমার অজান্তেই হাতদুটো প্রসারিত হয়। স্মৃতি আর বাস্তবের সংগমে দাঁড়িয়ে হাতড়াই বাবার সেই হাতদুটো। খুঁজি, আর খুঁজে চলি; কিন্তু খুঁজে আর পাই না...। 

ক'দিন ছুটি কাটিয়ে ফিরে আসি আবার এই তিলোত্তমার বুকে। যেখানে এখন শুধুই স্বার্থের গন্ধ। কংক্রিটের বিশাল জঙ্গল, আরও কতকিছু। তবে এখানেও সবাই অ্যাকুয়ার জল পায় না। মিনারেলও না। টাইম-কলের পাশে লম্বা লাইনে দাঁড়ায় বালতি-বোতল-গামলারা। মারামারি-হাতাহাতি-ঝগড়াও করে মালিকেরা। 

সুদীর্ঘ সংগ্রামের পরে স্বাধীনতা পেয়েছি আমরা। হয়তো তার চেয়েও দীর্ঘ সংগ্রামের প্রয়োজন এক ফোটা স্বাদু ও পেয়ো জল সবার মুখে তুল দিতে। তাই প্রস্তুত হতে হবে এখনই। আরো একটা লড়াই লড়তে হবে। তবে এবারের লড়াইটা হবে জীবনের জন্য; জলের জন্য...।   

১৭-০৩-২০১৮
পার্কসার্কাস, কোলকাতা

আব্দুল মাতিন ওয়াসিমঃ খোলা-তালাক

Image result for বিচ্ছেদ

 খোলা-তালাক 

আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

দু' মাস হতে চলল সারাহ্‌ বাপের বাড়িতেই আছে। প্রথম প্রথম তেমন কেউই বিষয়টাকে আমল দেয়নি। কিন্তু, একমাস হয়ে গেল শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছে না দেখে, পাড়াপড়শির কৌতূহল বাড়তে লাগল। আস্তে আস্তে বিষয়টি নিয়ে কানাকানি শুরু হল। কোনোভাবে পাশের বাড়ির মল্লিকা বৌদি একদিন জানতে পারলো, সারাহ্‌ নিজে খোলা-তালাক দিয়ে এসেছে স্বামীকে। ব্যাস, মুহূর্তের মধ্যে আলোর গতিতে ছড়িয়ে পড়ল ব্র্যাকিং নিউজটা। আর শুরু হয়ে গেল আলাপ-আলোচনার পালা। কি কল-তলা, কি পুকুর-ঘাট, কি ফিদ্দুর চায়ের দোকান- সব জায়গাতেই হট্‌-পট্যাটো সারাহ্‌। পাড়াপড়শি-আত্মীয়স্বজন প্রায় সবাই একসুরে খোদ সারাহ্‌কেই দায়ী করতে লাগল। নজরূল মিঞা তো চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলেই বসলেন-- "কত বড় স্পর্ধা দেখো, মেয়ে হয়ে ডিভোর্স দিয়ে এসেছে স্বামীকে...!" 

সারাহ্‌ বহু রাত বিনিদ্র যাপন করেছে শ্বশুর বাড়িতে। পণের টাকা পরিশোধ করতে পারেনি তাঁর বাবা, তা নিয়ে উঠতে-বসতে শাশুড়ি-ননদের কাছে খোঁটা শুনতে হয়েছে তাঁকে। রয়্যাল-এনফিল্ড পায়নি বলে স্বামী বহুবার তাঁর গায়ে হাত তুলেছে। সেসব কথা কিন্তু পাড়ার কেউ জানে না। আর তারা জানতেও চায়নি কোনোদিন। তারা শুধু একটাই কথা জেনেছে আর তা নিয়েই দিনরাত কানাঘুষো করছে সবাই-- সারাহ্‌ তালাক দিয়েছে নিজের স্বামীকে; খোলা-তালাক।

১৪-০৩-২০১৮
মোমিনপুর, কোলকাতা 

Friday, 8 March 2019

আব্দুল মাতিন ওয়াসিমঃ ভ্রূণ



 ভ্রূণ 
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

বাব্‌লি আবারও মা হতে চলেছে। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে কোনোভাবে জানতে পারল, এবারও গর্ভে এসেছে এক কন্যা সন্তান। কী করবে বুঝতে পারছে না বিমল। বসে আছে মাথা নীচু করে, চুপচাপ, ঘরের এক কোণে। কিছুক্ষণ পর উঠে দাঁড়ালো সে। ঘর থেকে বেরিয়ে উভয়ে দ্রুত পৌঁছালো ডাক্তার শিরিনের ক্লিনিকে...।

সব শুনে ডাক্তার শিরিন বললেন, "এবরশন মহাপাপ এবং আইনতঃ দণ্ডনীয় অপরাধ"। বাবলি ও বিমল উভয়ে সমস্বরে, ঝাঁঝালো কন্ঠে, একরাশ হতাশা ও বিরক্তি মিশিয়ে বলে উঠল, "টাকা দিচ্ছি। কাজটা করে দিন। এত কথা শুনতে চাইনা"। 

শিরিনের চোখ ছলছল করে উঠল। দীর্ঘ দশ বছর ধরে তাঁর গর্ভ যে হাহাকার করছে একটি ভ্রূণের জন্য। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "অন্য কোথাও যান"।

Tuesday, 5 March 2019

আব্দুল মাতিন ওয়াসিমঃ ক্লাস ওয়ান থেকে টু’য়ে



ক্লাস ওয়ান থেকে টু’য়ে

তারপরের দিন সকালে যথারীতি গিয়ে ক্লাসে বসলাম।  গ্রামের প্রাইমারী স্কুল থেকে ক্লাস থ্রি পাশ করে যাওয়ার সুবাদে বাংলা, অংক এবং ইংরেজিতে তেমন অসুবিধা হওয়ার কথা ছিল না। গ্রামের মক্‌তবে উর্দু ও আরবি শিখেছিলাম। তাই উর্দু পড়ার পাশাপাশি একটু আধটু বলতে ও লিখতেও পারতাম। বুঝতামও খানিকটা। কিন্তু আরবি পড়তে পারলেও তেমন লিখতে পারতাম না। বুঝতে তো পারতামই না। কারণ, আমাদের দেশের প্রায় সব জায়গারই একই অবস্থা, আরবি অনেকেই পড়তে শেখে কিন্তু লিখতে, বুঝতে এবং বলতে শেখে না। এমনকি যারা আরবিতে গ্রাজুয়েশন ও মাস্টার্স করেছে বা করে তাঁদেরও অনেকে সঠিকভাবে আরবি লিখতে ও বলতে অক্ষম।

যাইহোক প্রথমদিন, অচেনা পরিসর, এক অদ্ভুত রকমের আড়ষ্টতা নিয়ে ক্লাস ওয়ানের শ্রেণীকক্ষে ঢুকলাম। এবং টিফিনের আগের প্রায় সবকটা পিরিয়ডই মোটামুটি ভাবে উতরে গেলাম। টিফিন বিরতিতে বইখাতা ক্লাসে রেখেই ফিরে গেলাম রুমে। হস্টেলের মাত্‌বাখ (রান্নাঘর) থেকে পাওয়া এক চামুচ সেদ্ধ ছোলা আর বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া এক বাটির মতো মুড়ি সর্ষে তেলে মেখে টিফিন করলাম। তারপর গেলাম ক্লাসে। টিফিনের পর প্রথম পিরিয়ডটা ছিল আরবির। পড়তে পারলেও মানে বুঝতাম না। তাই কী করবো, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। ঐ দিকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ক্লাসে ঢুকেই এক এক করে সবাইকে নির্ধারিত অংশের অর্থ জিজ্ঞেস করছিলেন। না পারলে, ছড়ি দিয়ে হাতের তালুতে আঘাত করছিলেন। আমি বসেছিলাম দ্বিতীয় লাইনে। ভয়ে, শুনে শুনে ঐ অংশটুকুর অর্থ মুখস্থ করে ফেললাম। যখন শিক্ষক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, না-দেখে পুরোটাই মুখস্থ শুনিয়ে দিলাম। কিন্তু তিনি যাতে বুঝতে না পারেন, তার জন্য  বইয়ের উপর খামোখা আঙ্গুল ফেরাচ্ছিলাম। 

ক্লাস শেষে ফিরে গেলাম হস্টেল বিল্ডিঙে। যোহরের সালাতের (মধ্যাহ্ন প্রহরের নামায) আধ ঘণ্টা আগে ছুটি হয়েছিল। দ্রুত স্নান সেরে মসজিদে গেলাম। নামায শেষে ঘরে ফিরে থালাটা নিয়ে ছুটলাম মাত্‌বাখের দিকে। ছোটদের আলাদা লাইনে দাঁড় করানো হতো। কখনো কখনো একই লাইনে সবাইকে দাঁড় করানো হতো, সেক্ষেত্রে বড় দাদারা ছোট ভাইদের লাইনের প্রথমে পাঠিয়ে দিতেন। তাই গিয়ে দাঁড়ালাম লাইনের প্রথমে। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে দিল জামিল (বাবুর্চি) কাকু। তিনটে বড় বড় গামলায় ভাত, তরকারী ও ডাল। ভাত ও তরকারীর গামলার দায়িত্বে দুজন শিক্ষক আর ডালের দায়িত্বে এক সিনিয়র দাদা। এবং এই পুরো সিস্টেমটাই রুটিন মাফিক ভাগ করা ছিল শিক্ষক ও কিছু সিনিয়র দাদাদের মাঝে। সেদিনের দায়িত্বে ছিলেন মাস্টার আব্দুর রশিদ ও ইউসুফ। তবে ডালের দায়িত্বে থাকা ঐ দাদার কথা মনে করতে পারছি না এখন। যাইহোক ভাত-ডাল-তরকারী নিয়ে কামরায় ফিরলাম। হস্টেলের খাবার কেমন হয় তা অনেকের জানা। বিশেষ করে হস্টেলের ডাল; সমুদ্রে মুক্তো খুঁজতে ডুবুরী যেমন পরিশ্রম করে ঠিক তেমনই মুশুরের দানা খুঁজতে হস্টেলের আবাসিকরা। স্বভাবতই অতি কষ্টে গলাধঃকরণ করলাম। 

উপমহাদেশের বেশির ভাগ মাদ্‌রাসায় মধ্যাহ্ন ভোজনের পর, আসরের সালাত (বিকেলের নামায) পর্যন্ত ছেলেরা যে যার কামরায় (রুমে), কেউ হাতের লেখা লেখে, কেউ হোমওয়ার্ক করে, কেউ বসে বসে বই পড়ে, আবার কেউ বেঘোরে ঘুমোয় তো কেউ ক্বায়লুলাহ্‌ (মধ্যাহ্ন ভোজনের পর শুয়ে, তবে জেগে একটু আরাম করা। এবং নবি (সা) প্রায়শই এভাবে দুপুরের খাবারের পর বিশ্রাম নিতেন। তাই এটি একটি সুন্নত রূপে সমাদৃত) করে। তখন আমি জাহাঙ্গীর কাকুর রুমে থাকতাম। বিছানায় শুয়ে শুয়ে সেদিন ক্লাসে কী কী হয়েছে সব কাকুকে খুলে বললাম। শেষে বললাম, “কাকু আমি না সব পারছি। শুধু আরবি আর হিন্দিতে একটু অসুবিধাআমার মনে হয় ক্লাস টু’তে ভর্তি হলে ভালো হবে!”

জাহাঙ্গীর কাকু ও তার রুমমেটরা সবাই মিলে আমাকে একদিনেই হিন্দি পড়তে এবং একটু আধটু লিখতে শিখিয়ে দিল। আমি উর্দু ভাষা টুকিটাকি জানতাম, ফলে হিন্দি বুঝতে আমার তেমন অসুবিধা হচ্ছিল না। কেন না ঐ দু’টো  ভাষা তো সহোদরা। একটা যদি মা হয়, তো আরেকটা হল মাসি। সন্ধ্যাবেলা, মাগ্‌রিবের সালাত (সূর্যাস্তের নামায) আদায়ের পর ওদের শেখানো কৌশল অনুযায়ী সালাম দিয়ে ঢুকলাম প্রিন্সিপ্যাল স্যারের অফিসে। কাঁদো কাঁদো স্বরে আমার সব কথা বললাম। হিন্দি বইটা সামনে ধরে ‘লাল মুর্‌গি কুক্‌ কুক্‌ কুক্‌’ গল্পের প্রথম পাতাটা এক শ্বাসে পড়ে ফেললাম। স্যার হাসতে হাসতে বললেন, “যাও কাল থেকে ক্লাস টু’র ঘরে বসবে”
-আব্দুল মাতিন ওয়াসিম 

Friday, 1 March 2019

বদিউর রহমানঃ বৃথা আক্ষেপ

Image may contain: one or more people, glasses and text

 বৃথা আক্ষেপ   
বদিউর রহমান


যৌবন যবে গত চিরতরে,
মৃত্যু আসিবে হঠাৎ একেবারে।
সে দুইয়ের মাঝে বার্ধক্য আসি’
ন্যুব্জ আমাকে নতজানু করে।

বলিল না সে তো বিদায়ের ক্ষণে ,
আবার হইবে দেখা তোমা’ সনে।
নিয়তি লিখন এমনই তো হবে,
ফিরিবে না কভু গত যৌবনে।

দেখিতাম যারে আঁখিদ্বয় ভরি’
ধূসরতা আসি দৃষ্টিকে হরি’,
পারি না বুঝিতে বেদনার ভারে
চেনাকে অচেনা বলে ভুল করি।

হাতটা ধরিয়া সোহাগের সুরে,
বলিতাম যারে, বসিও না দূরে,
কী বা ভয় তব, আমি তো আছিই।
তাহা বিনে দুখ দেহমন জুড়ে।

আজ মোর ক্ষীণ দৃষ্টি শকতি,
আরও দুর্বল চালিকা শকতি,
মহাকালে আজ উধাও হয়েছে
ক্ষীণ হতে ক্ষীণ চিন্তা শকতি।


৩০-০৪-২০১৭