আমাদের জীবনে কিছু মানুষ এমনও থাকেন, যাঁদের সঙ্গে রক্তের কোনো সম্পর্ক থাকে না, অথচ তাঁরা
নিঃশব্দে হৃদয়ের গভীরে জায়গা দখল করে নেন। সময়ের স্রোত কত কিছুই না ভাসিয়ে নিয়ে
যায়, কিন্তু কিছু মুখ,
কিছু হাসি, কিছু মুহূর্ত কখনো
মুছে যায় না। আমার শৈশবের স্মৃতির পাতায় এমনই এক অমলিন নাম— পাগলি বেটি। তাঁর আসল নাম মোমেনা
বেওয়া। নিতান্তই সহজ-সরল, নিষ্পাপ ও মমতাময়ী একজন মানুষ। দারিদ্র্য ছিল তাঁর চিরসঙ্গী।
কিন্তু অভাব তাঁর সততা ও আত্মসম্মানকে কোনো দিন পরাজিত করতে
পারেনি।
তাঁর স্বামীকে লোকে ডাকত আশি পাগলা নামে। তিনিও ছিলেন বেশ সহজ-সরল মানুষ। অন্যদের সাহায্য করতে ভালোবাসতেন। জমিতে কাজ করা বা ভার বওয়া
যে কাজই হোক না কেন, হাসিমুখে করতেন। সেবার নড়বড়িয়া শিবের মেলা
বসেছে। অনেকেই দোকান নিয়ে যাচ্ছে, ব্যবসা করবে, কিছু মুনাফা কামাবে। আশি পাগলা এক দোকানীর মালপত্র ভারে করে মেলায় নিয়ে গেলেন। ভেবেছিলেন, বিনিময়ে মিষ্টি খেতে পাবেন, হাতে দু-চারটা টাকাও
আসবে।
কিন্তু নিয়তি তাঁর জন্য অন্য গল্প লিখে রেখেছিল। প্রথম দিনেই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মেলা প্রাঙ্গণেই তিনি পৃথিবী ত্যাগ করলেন। যে ভারে
করে অন্যের মাল বয়ে নিয়ে গেছিলেন, সেই ভারেই তাঁর নিথর দেহ ফিরে এল গ্রামে।
সেদিন থেকে পাগলি বেটির জীবন আরও কঠিন হয়ে গেল। লোকের বাড়িতে কাজ করে কোনোমতে তাঁর সংসার চলত। আমার মা কোথাও গেলে আমাদের বাড়ির সব দায়িত্ব তাঁর হাতেই তুলে দিতেন। তাছাড়া রান্নাবান্নায় সাহায্য
করা, ঘরের ছোটখাটো কাজ সামলানো, আমাকে আগলে রাখা সবই তিনি করতেন। আমাকে নিজ সন্তানের মতো করে ভালোবাসতেন। প্রায়ই আমাকে সাথে করে তাঁর ছোট্ট
কুঁড়েঘরে নিয়ে যেতেন। সেই ঘরে কোনো আসবাবই ছিল না, ছিল না কোনো ঐশ্বর্য; ছিল শুধু দারিদ্র্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত উষ্ণতা।
একদিন আমি তাঁর উঠানে খেলা করছি। হঠাৎ দেখি, তিনি একটা বাটিতে করে ধোঁয়া ওঠা
সাদা সাদা কিছু খাচ্ছেন। দূর থেকে দেখে মনে হলো গরম দুধ!
আমি দৌড়ে গিয়ে বললাম— “মহোঁ খাম বেটি!”
তিনি মৃদু হেসে বললেন—
“না বা, এইলা তোক খাবা
হবানে।”
কিন্তু আমি ছিলাম জেদের রাজা। শেষ পর্যন্ত নিজের বাটি থেকে অন্য বাটিতে একটু ঢেলে আমার হাতে দিলেন। আমি এক চুমুক দিতেই মুখ বিকৃত হয়ে গেল, এ কেমন দুধ! আমার মুখ দেখে তিনি এমন প্রাণখোলা হাসি দিলেন,
যা আজও আমার কানে বাজে। তারপর স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন— “এইলা দুধ নায় বা,
মাড়। ভোক লাগিছে তো, তার নাগিন ছাঁকি করে তাতে এনা নুন দি খাছেন হাঁরা।”
আরও একটা দিনের কথা খুব মনে পড়ে।
পাগলি বেটি নানাহারপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে
যাবেন। আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় তিন-চার মাইল পথ। মূল উদ্দেশ্য, সেখানে বিনা
পয়সায় ওষুধ পাওয়া যাবে।
আমি বায়না ধরলাম, আমিও যাব। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে আমাকে নিয়েই তিনি রওনা দিলেন। পথে কারও একটা বাড়িতে আমরা একটু বিশ্রাম নিলাম।
সময়ে পৌঁছে ডাক্তার দেখানো হল। তারপর ওষুধ নিয়ে আবার হাঁটতে
হাঁটতে বাড়ির পথে।
মহিপালে এক দোকানের সামনে এসে আমার চোখ আটকে গেল একটা রঙিন বলে। শিশুমনের
লোভ সামলাতে না পেরে কান্না শুরু করে দিলাম। আমার কান্না থামাতে পাগলি বেটি আমাকে বলটা কিনে দিলেন। তারপর আমলাপুকুরে তাঁর এক পরিচিত বাড়িতে দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা সন্ধ্যার
আগেই বাড়ি ফিরলাম।
পরদিন সকালে বলটা নিয়ে খেলা করছি। হেন সময়ে আমার এক দাদা বলটা নিয়ে একটা কিক মারতেই সেটা ফেটে গেল। তা দেখে আমি কান্না জুড়ে দিলাম। আমার কান্নায় পুরো বাড়ি মাথায় উঠল। খবর পাগলি বেটির কানে যেতেই তিনি দৌড়ে এলেন। আমাকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন— “কান্দি না বা, মুই তোক আরও একটা বল কিনি দিম।”
তুলাইর স্রোত মাঝেমধ্যে থেমে যায়। কিন্তু সময়ের নদী থেমে থাকে না। জীবনের পড়ন্ত প্রহরে এসে পাগলি বেটি দ্বিতীয়বার বিয়ে করলেন। আমাদের গ্রাম থেকে কিছুটা দূরের পৈনালা গ্রামের এক বয়স্ক মানুষকে। অনেকেই তা ভালো চোখে দেখেনি। অনেকে তা নিয়ে ছিঃছাঃ করেছিল। কিন্তু আমি কৌতূহল বশত একদিন তাঁকে পৈনালায় দেখতে গেলাম।
ছোট্ট মাটির বাড়ি। সুন্দর করে লেপে-পুঁছে রাখা। তবে ঘরে আসবাবপত্র কিছুই নেই। আমাকে দেখে তিনি বেজায় খুশী হলেন।
ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন, নাশতা খাওয়ালেন। আমাদের গ্রাম ও লোকজন নিয়ে কত গল্প করলেন।
তার কয়েক বছর পর, পাগলি বেটি পৈনালা ছেড়ে পাকাপাকি
ভাবে আমাদের গ্রামে চলে আসলেন। ওই বাড়িটা বিক্রি করে আমাদের গ্রামে জায়গা কিনে, তাতে কঞ্চির বেড়া আর খড়ের ছাউনি দিয়ে ছোট্ট একটি আশ্রয় গড়ে তুললেন। সেই কুটিরেই তাঁদের বেশ ক’টা বসন্ত ওভাবেই কেটে গেল। হঠাৎ একদিন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এমন অসুস্থ যে নিজে উঠে বসতেও পারতেন না। তাঁর স্বামীই সব করতেন। তাঁকে ধরে বসিয়ে
দেওয়া,
গোসল করানো, রান্নাবান্না করা, হাতে করে তাঁকে খাইয়ে দেওয়া, সবই করতেন নিঃশব্দে,
ভালোবেসে।
খবর পেয়ে একদিন তাঁকে
দেখতে গেলাম।
সেদিন আমার কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা। নিচে বসতে পারছিলাম না। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পাগলি বেটি অভিমান ও অনুযোগের স্বরে বললেন—
“বসেক বা। কেনে বসি না তে? গরিব মানুষ মুই, এংকার করি বসি না নাকি?" কথাগুলো শুনে বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠেছিল। কিন্তু কোনো উত্তর দিইনি। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
পরবর্তীতে গ্রামের মানুষ
কয়েকবার চাঁদা তুলে তাঁকে রায়গঞ্জ ও মালদায় ডাক্তার দেখাতে নিয়ে
গেছিল। কিন্তু কোনো সুফল মেলেনি। তাঁর স্বামী দিনভর
অন্যের বাড়িতে কাজ করত। তারপর
বাড়ি ফিরে রান্না করে তাঁকে খাইয়ে দিত। গ্রামের মানুষও যে যার
সাধ্যমতো সাহায্য করতো।
এভাবেই কাটছিল তাঁদের জীবন। একদিন ভোরে খবর
এল, তাঁর স্বামী উঠোনের এক পাশে পড়ে আছে। গ্রামের মানুষ খবর পেয়ে ছুটে গেল।
কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।
দুপুর গড়িয়ে তাঁর কাফন-দাফন সম্পন্ন হল। তাঁর চলে যাওয়ার পর পাগলি বেটির ঠাই হল তাঁর এক নিকট
আত্মিয়ের বাড়িতে, পার্শ্ববর্তী গ্রাম পাইটকাপুকুরে। আমি কয়েক বার তাঁকে দেখতে যেতে চেয়েছি, কিন্তু মা কিছুতেই যেতে দেয়নি। শুনেছি, কেউ গেলে পাগলি বেটি ভীষণই রিয়েক্ট করতেন। খুব বাজে
বাজে গালি দিতেন। হয়তো তাই মা আমাকে যেতে দেননি। পাগলি বেটির প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও
ভালোবাসা কমে যাক, মা চাননি। হয়তো মা চেয়েছিলেন, পাগলি বেটি বেঁচে থাকুক
আমার স্মৃতিতে, খড়ের ছাউনি দেওয়া ছোট্ট ঘর, ধোঁয়া ওঠা এক বাটি মাড়, দু’টাকা দিয়ে কেনা রঙিন ফুটবল আর মায়াভরা সেই হাসি নিয়ে, বেঁচে থাকুক আজীবন সহাস্য বদনে!
মোমিনপুর, কোলকাতা
১৫ জুন ২০২৬

No comments:
Post a Comment