সেই সময় আমরা ক’জন মিলে স্কুলে নিত্যনতুন ফন্দি আঁটতাম। একবার দারুণ এক
ফন্দি আঁটলাম। বেশ মজার। পাগলু আগে নিজের
ব্যাগ নিয়ে দৌড় দিল, যেন সে স্কুল থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। আর আমু ও লাবু তাকে দেখিয়ে চিৎকার করে “ধর্ ধর্” বলে ধাওয়া করলো। বাইরে থেকে আপাত দৃষ্টিতে দেখে মনে হল তারা পাগলুকে ধরতে ছুটেছে, কিন্তু আসলে সেটা ছিল স্কুল থেকে পালানোর এক
নিখুঁত কৌশল। আমি তখন চুপচাপ ক্লাসে বসে, যেন কিছুই জানি না। স্কুল ছুটির পর আমি ওদের
বই-খাতাগুলো নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। অন্য দিনে, ফন্দি প্রায় একই থাকলো, সামান্য প্লট চ্যাঞ্জ হল, সেই সাথে চরিত্রগুলো খানিকটা
ওলটপালট হয়ে গেলো। এমন আরও কতো ফন্দি, কতো কৌশল যে আমরা রপ্ত করেছিলাম।
আমাদের সময় কদমডাঙ্গা প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষক ছিলেন মাত্র দু’জন। প্রধান শিক্ষক মুনিরুদ্দিন আহমেদ, আমার জ্যাঠতুতো দাদা, আছোল বড় আব্বার বড় ছেলে। আর সহকারী শিক্ষক সোলেমান মিয়াঁ, আমার বড় বোনাই। আর
তাঁদের সাথে সম্পর্কের এই ঘনিষ্ঠতা আমার স্কুলজীবনকে
অন্যরকম করে তুলেছিল।
দাদা ছিলেন গম্ভীর স্বভাবের মানুষ। তাঁর চলাফেরা, কথাবার্তা সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের পরিমিতি আর শৃঙ্খলা। সবকিছু তিনি পরিপাটি করে এবং গুছিয়ে রাখতে ভালোবাসতেন। আর তাঁর চোখের দৃষ্টি ছিল খুবই তীক্ষ্ণ। মনে হতো, এক লহমায় তিনি আমাদের মনের ভেতরটাও পড়ে ফেলেছেন। অন্যদিকে, দুলাভাই ছিলেন একেবারেই বিপরীত মেরুর মানুষ। প্রাণখোলা, হাসিখুশী, অগাধ রসবোধ সম্পন্ন। সবসময় মজার ছলে কথা বলতেন। তাঁর
সান্নিধ্যে থাকলে হাসি যেন থামতেই চাইত না।
আমি যেহেতু তাঁদেরই বাড়ির ছেলে,
তাই ভালোবাসার পাশাপাশি আমার ওপর ছিল বাড়তি নজরদারিও। স্কুলে যেমন, তেমনি বাড়িতেও, আমি যেন সর্বদা অতন্দ্র
প্রহরীর অধীনে। কোথাও কোনো
দুষ্টুমি করলে তা আর গোপন থাকত না। স্কুলের দুষ্টুমি পৌঁছে যেত বাড়িতে, আর বাড়ির কাণ্ডকারখানা গিয়ে হাজির হতো স্কুলে। ফলে শাসনের
হাত থেকে রেহাই পাওয়ার
আমার কোনো উপায়ই ছিল না।
তবে আমিও কম যাইনা! ছোটবেলার সেই দুষ্টুমিষ্টি বুদ্ধি দিয়ে
আমিও ঠিক নিজের মতো করে প্রতিশোধ নিতাম। যেদিন দাদা স্কুলে আমাকে মারতেন, সেদিন আমরা বাড়ি ফিরে সময়-সুযোগ বুঝে তাঁর
বাগানের কোনো ডাল ভেঙে দিতাম। কখনও আবার
লুকিয়ে গাছের আম পেড়ে খেয়ে নিতাম। দাদা সবই বুঝতেন, কিন্তু আশ্চর্যভাবে বাড়িতে কিছু বলতেন না। শাস্তিটা জমা থাকত স্কুলের জন্য।
আর দুলাভাইয়ের সঙ্গে আমার সেই মজার হিসাব-নিকাশ তো আজও মনে পড়লে হাসি পায়। যেদিন তিনি আমাকে পড়া না পারার
জন্য বা দুষ্টুমির কারণে শাস্তি দিতেন, বা ‘অ্যাই শালা’ বলে ক্ষেপাতেন,
সেদিন বিকেলে আমি সোজা চলে যেতাম তাঁর বাড়ি। তারপর সুযোগ
বুঝে তাঁর ছোট মেয়ে,
মানে আমার ছোট ভাগ্নি শিরীনকে ধরে দে পিটুনি। যখন সে কান্না জুড়ে দিয়ে প্রশ্ন করত, “মামা, আমাকে কেন মারছো?” আমি গম্ভীর মুখে উত্তর দিতাম, “তোমার আব্বা আজকে আমাকে স্কুলে মেরেছে, তাই!”
সেই সময়ের একটা ঘটনা আজও মনে দাগ কেটে আছে। একবার কে বা কারা দাদার বাগানের ছোট ছোট গাছগুলো কেটে দিয়েছিল। আমরা সত্যিই জানতাম না, কে বা কারা করেছে এবং কেন করেছে। গাছগুলোর অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, যেন কোনো অজানা শত্রু প্রতিশোধের আগুনে কেউ এ কাজ করেছে।
কিন্তু দাদা,
না বুঝেই আমাদের ওপর সন্দেহ করলেন। আর সেই ভুল
বোঝাবুঝির শাস্তি নেমে এলো আমাদের উপর।
স্কুলে সেদিন এমন শাস্তি দেওয়া হলো, যা আমাদের অভিজ্ঞতার বাইরে ছিল। টেবিলের নিচে মাথা ঢুকিয়ে, রুকুর মতো করে, দীর্ঘক্ষণ ‘মুরগা’ বানিয়ে রাখা হলো।
সময় যেন তখন থমকে গেছিল,
আমাদের চোখমুখ লাল হয়ে উঠেছিল। শেষমেশ আর সহ্য করতে না পেরে, একসাথে জোর লাগিয়ে টেবিলটা উল্টে দিয়ে দৌড় দিলাম। এক দৌড়ে বাড়ি।
ক’দিন পরে সত্যিটা সামনে আসল। আসল দোষী ধরা পড়ল। যে গাছগুলো কেটেছিল, তাকে বকাঝকা করা হল।
অযথা আমাদের শাস্তি দিয়ে ফেলেছেন ভেবে দাদারও খুব মন খারাপ হল। তিনি আমাদের সবাইকে
ডেকে আদর করলেন। জীবনের ভালোমন্দগুলো বোঝালেন। সেই সাথে বাতাসা-খুরমাও খাওয়ালেন।
এই ছোটখাটো ঘটনাগুলোই আমাদের শৈশবকে করে তুলেছিল রঙিন ও স্মরণীয়। তখন হয়তো শাসনকে ভয় পেতাম, অভিমানও হতো খুব। কিন্তু আজ বুঝি, সেই কঠোরতার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল অফুরন্ত ভালোবাসা, সমুদ্র সমান মায়া আর আমাদের মানুষ করে তোলার এক নিঃশব্দ প্রচেষ্টা। আজ এতদিন পর ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই দিনগুলোই ছিল জীবনের সবচেয়ে নির্মল, সবচেয়ে সত্যিকারের সুখের সময়। কদমডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সেই ছোট্ট প্রাঙ্গণ, দাদা আর দুলাভাইয়ের শাসন, আর আমাদের ছোটখাটো দুষ্টুমি—সব মিলিয়ে আমাদের শৈশব শাঁখের করাতেও এক অদ্ভুত মিষ্টতায় মেখে এক অমূল্য স্মৃতির ভাণ্ডার হয়ে জমে আছে হৃদয়ের এক কোণে, যা কোনোদিন ফুরোবে না।
.png)
No comments:
Post a Comment