ঘটনাটা আমার কৈশোর বেলার। সে এক অদ্ভুত বয়স। যে বয়সে মনটা সারাক্ষণ ছুটে বেড়ায়, কোনো বাঁধন মানে না। কখনো তুলাই নদীর স্রোতের মতোই বেপরোয়া, কখনো আবার পূব মাঠে প্রবাহিত হাওয়ার মতো হালকা। স্কুল ছুটি হলেই আমরা বাড়ি ফিরে ব্যাগটা ছুঁড়ে দিয়ে দৌড় দিতাম গ্রামের
মেঠো পথ ধরে। কখনো মিয়াঁদের আমবাগানে পাকা আম কুড়োতে, তো
কখনো বুড়িছোঁয়া আর লুকোচুরির ফাঁকে হঠাৎ ঠিক হয়ে যেত— “চলো, নদীর ধারে যাই, আজ মাছ ধরবো!”
আমরা কয়েকজন তখন যেন এক আলাদা জগতের বাসিন্দা—আমি,
আমু,
রুনা, নাসি, লাবু আর সাইমা দি। আমাদের দিনগুলো কেটে যেত গ্রাম্য জীবনের
সেই নির্মল আনন্দে। কখন যে সকাল
গড়িয়ে বিকেল হয়ে যেত,
টেরই পেতাম না। সেই রকমই এক অগ্রহায়ণের বিকেল। চারিদিকে নবান্নের আবহ। নতুন ধানের গন্ধে পুরো গ্রাম মেতে উঠেছে। কোথাও ধান ভাণার উষ্ণ গন্ধ,
কোথাও নতুন চালের মিষ্টি ভাপ। উঠোনে শুকোতে দেওয়া শালপাতা, কাঁচা ধানের ঢিবি,
আর মাটির সোঁদা গন্ধ মিলে এক অদ্ভুত মাদকতা ছড়িয়ে আছে বাতাসে। এমনই একদিনে আমাদের এক ‘ধরম বেটি’, যার বাড়ি পাশের
ছকাঠি গ্রামে,
হঠাৎ এসে আমাদের উঠনে দাঁড়াল। মুখে তার চিরচেনা হাসি। বলল,
—“শোনো কাকা,
কাল বিকেলে কিন্তু তোমাদের আসতেই হবে। আমাদের বাড়িতে নবান্ন
উপলক্ষে একটু খাওয়া-দাওয়া আছে।”
আমরা তো শুনেই খুশি। আমু হেসে বলল,
—“খালি ডাকলে হবে না, পেট ভরে খাওয়াতে
হবে!”
সে মুচকি হেসে বলল,
—“সে তোমরা এসেই দেখো না,
না খাইয়ে ছাড়ব না।”
পরেরদিন সময় মতো আমরা ক’জন রওনা হলাম। বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে মলিন হয়ে আসছে।
সন্ধ্যার আধোঅন্ধকার গ্রাম্য পথের ওপর নেমে এসেছে। আকাশে কুয়াশার প্রথম পাতলা আস্তরণ, দূরের আকাশে সূর্যের হলদে আলো ধুলোভরা পথের সঙ্গে মিশে এক নরম আবছা দৃশ্য তৈরি
করেছে।
ছকাঠি আমাদের গ্রাম থেকে দেড়-দু’ কিমি পথ। মাথা-মুণ্ডুহীন কথার ফুলঝুরি ছড়াতে ছড়াতে কিছুক্ষণের
মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম ওদের বাড়ি। উঠোনে মাদুর পেতে আমাদের বসতে দেওয়া হল। আমরা সবাই গোল হয়ে বসলাম। মাদুরে
বসতেই শীতের মৃদু কাঁপুনি শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। বাতাসে লেপচাপা ধুলোর গন্ধ, কোথাও ধোঁয়া উঠছে চুলোর ভেতর থেকে। সব মিলিয়ে
যেন এক অদ্ভুত শান্তির আবহ।
ও ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করার পর বলল,
—“তোমরা একটু বসো, আমি এখনই খাবার নিয়ে আসছি।”
রুনা মজা করে বলল,
—“এই নবান্নে ক্ষীর না থাকলে কিন্তু চলবে না।”
ও হেসে বলল,
—“তোমাদের জন্য স্পেশাল করে করা
হয়েছে।”
কিছুক্ষণ পর আমাদের সামনে কলাপাতায় করে খই-মুড়ি আর ক্ষীর এনে দেওয়া হল। কী অপূর্ব স্বাদ—আজও মনে হয় জিভে লেগে আছে। নতুন চালের সেই মিষ্টি গন্ধ, খাঁটি দুধের কোমল স্বাদ—যেন সেদিন শুধু পেট নয়, মনটাও ভরে গেছিল।
আমু খেতে খেতে বলল,
—“আহা! এমন সুস্বাদু ক্ষীর জীবনে খাইনি!”
ও একটু লজ্জা পেয়ে হেসে আমাকে বলল,
—“কাকা, আরও নাও।”
এরপর মূল খাওয়াদাওয়ার পালা। আমরা ধর্মে মুসলমান—কাটা মাংস খাই না,
সে কথাটা আমাদের ধরম বেটি ভালোভাবেই জানত।
তাই আমাদের জন্য আলাদা করে মাছ-ভাতের আয়োজন করেছিল। কলাপাতার ওপর গরম গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত ঢেলে দেওয়া হল। সাথে পাতলা ঝোলের রুই
মাছ। সঙ্গে এক টুকরো বেগুন ভাজা, একটু মাখামাখা পাঁচ মিশালি সবজি,
অল্প আলুভাজা আর পাতলা মুসুর ডাল। গ্রামের সাদামাঠা রান্না—কিন্তু সেই স্বাদ! যেন মাটির গন্ধ মিশে আছে তাতে। আমরা সবাই
ভরপেট খেলাম। খাওয়া শেষে আমি বললাম,
—“আচ্ছা, আজ আমরা তাহলে
উঠি।”
ও বলল,
—“আবার কিন্তু আসবে।”
আমরা মাদুর থেকে উঠে দাঁড়ালাম। ঠিক তখনই দেখলাম, তার ঠাকুমা এক ঘটি জল,
সঙ্গে একটু গোবর আর মাটির দলা নিয়ে উঠোনে এসে হাজির। আমরা তেমন গুরুত্ব দিলাম না। ভেবেছিলাম হয়তো উঠোন লেপবেন। কিন্তু আমরা
উঠতেই তিনি গম্ভীর মুখে আমাদের বসার জায়গাটায় গোবরজল ছিটিয়ে দিলেন, তারপর গোবর-মাটি মেখে সেই জায়গাটা লেপতে লাগলেন।
আমরা একটু অবাকই হয়েছিলাম, কিন্তু কেউই কিছু বলতে পারিনি। কোনো প্রশ্নও করিনি। তবে মনে হয়েছিল—কোথাও যেন একটা অদৃশ্য কাঁটা বিঁধে রইল। সেদিন ফেরার পথে নাসি ফিসফিস করে বলল,
—“ওই জায়গাটা ওভাবে লেপে দিল কেন?”
আমু বলল,
—“আরে থাক, হয়তো ওটাও নিয়ম।”
আমরাও এ নিয়ে আর কিছু বলাবলি করিনি। কারণ আমাদের ধরম বেটির মন খারাপ হোক—তা আমরা চাইনি। দিন গেল, রাত এল। সপ্তাহ
কেটে মাস,
মাস কেটে বছর। তুলাই নদী দিয়ে বয়ে গেল কত বর্ষা। আমাদের দেখা হতো। সে মাঝেমধ্যে আমাদের বাড়িতেও আসত। বসে গল্প করত, হাসত, আবার চলে যেত। তবে কখনো কখনো তার চোখে একটা অদ্ভুত সংকোচ দেখতাম। কথার মাঝে একটা অদৃশ্য থেমে
যাওয়া,
আচরণে একটুখানি দূরত্ব। তখন বুঝতাম না।
বহু বছর পরে,
একদিন হঠাৎ করেই জানতে পারলাম সেই দিনের আসল কারণ। সেদিন আমাদের চলে যাওয়ার পর আমাদের বসার জায়গাটা গোবরজল
দিয়ে লেপে দেওয়া হয়েছিল—কারণ আমরা নাকি ম্লেচ্ছ। আমাদের স্পর্শে সেই জায়গাটা অপবিত্র হয়ে গেছিল।
তাই তাকে আবার পবিত্র করতে হয়েছিল।
কথাটা শুনে মনে হয়েছিল—কেউ যেন বুকের ভেতর ধীরে ধীরে একটা দরজা বন্ধ করে দিল। সেদিনের সেই ক্ষীরের মিষ্টি স্বাদ, কলাপাতার ওপর ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত,
আর সরল আতিথেয়তার স্মৃতি—সবকিছুর ওপর যেন হঠাৎ একটা অদ্ভুত ছায়া পড়ে গেল। তবে আমি আজও তাকে দোষ
দিতে পারি না। কারণ আমাদের মতো সেও এই সমাজেরই সন্তান—যে সমাজ মানুষকে মানুষ হিসেবে নয়, আগে তার পরিচয় খোঁজে ধর্মে, বর্ণে,
স্পর্শে।
আজও কখনো অগ্রহায়ণের সন্ধ্যায় নতুন ধানের গন্ধ ভেসে এলে সেই দিনের কথা মনে
পড়ে।
মনে হয়—সেদিন আমরা শুধু
নবান্ন খেতে যাইনি,
অজান্তেই শিখে এসেছিলাম সমাজের এক নিঃশব্দ পাঠ—মানুষের হৃদয় কখনো কখনো খুব সহজেই আপন হয়ে যায়, কিন্তু সমাজ এখনও অনেক জায়গায় মানুষকে ছুঁতে শেখেনি। আর তাই মাঝে মাঝে মনে হয়—সেদিন আমাদের বসার জায়গাটা শুধু গোবরজল দিয়ে লেপা হয়নি, নীরবে লেপে দেওয়া হয়েছিল মানুষে মানুষে দূরত্বের সেই অদৃশ্য দেয়ালটাও।
বাঁশকুড়ি, দঃ দিনাজপুর
০৭/০৫/২০২০
No comments:
Post a Comment