খোঁজখবর
আব্দুস সালাম সরকার। বয়স পঁয়ষট্টির
কাছাকাছি। পেশায় কৃষক—জীবনের প্রায়
পুরোটা সময় মাটির সঙ্গে লড়াই করেই কাটিয়ে দিয়েছেন। নিজে প্রায় নিরক্ষর; কাগজে কলমে
সইটুকুও কারও সাহায্য ছাড়া করতে পারেন না। কিন্তু বুকের ভেতর ছিল একটাই স্বপ্ন—একমাত্র ছেলে
রফিকুল ইসলামকে মানুষ করবেন, শিক্ষিত করবেন, মানুষের কাতারে
দাঁড় করাবেন।
সেই স্বপ্ন আগলে রাখতে গিয়ে কত না কষ্টই সহ্য করেছেন!
খেতের ফসল ভালো হলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতেন, খারাপ হলে রাতভর দুশ্চিন্তায় ছটফট
করতেন। নিজের গায়ের কাপড় জীর্ণ হলেও ছেলের পড়াশোনায় কোনোদিন ঘাটতি হতে দেননি।
হোস্টেলের খরচ, বইখাতা—সবই জুটেছে
বাবার অক্ষয় জেদের জোরে।
এভাবেই কত আষাঢ়, কত কার্ত্তিক পেরিয়ে অগ্রহায়ণে
তুলাইয়ের পাড় ভরে উঠেছে সোনালী শীষে। আর রফিকুলও মনোযোগ সহকারে লেখাপড়া করেছে, পরীক্ষায়
ভালো রেজাল্ট করেছে, চাকরিও পেয়েছে।
এখন সে কলকাতায় সেটেল্ড। কিন্তু আব্দুস সালাম সরকার পড়ে আছেন সেই অজপাড়া গ্রাম—চণ্ডীপুরে, মাটির দেওয়াল
আর পুরোনো টিনের
চালা দেওয়া তাঁর জন্মভিটেতেই।
গ্রাম থেকে এক কিলোমিটার দূরে একটা ছোট্ট মোড়—নাম আয়ড়া।
দু-চারটে দোকান, ক’টা চায়ের ঠেক, তার এক কোণে
মোবাইল সারানোর একটা দোকান। সেদিন চৈত্রের দুপুর। আকাশ থেকে যেন আগুন ঝরছে। বৃদ্ধ আব্দুস
সালাম লাঠি হাতে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলেন মোড়ে।
মোবাইলের দোকানে ঢুকে খানিকটা সংকোচ, খানিকটা দ্বিধা
নিয়ে বললেন,
—হাঁ বো বাবাজি, একবার দেখো তো
বো... মোবাইলটার কী হইছে, ফোন কেনে যায় না?
দোকানের ছেলেটা কিছুক্ষণ ঘাঁটাঘাঁটি করে বলল,
—কোনো সমস্যা নেই
কাকু। একদম ঠিক আছে।
আব্দুস সালাম একটু চুপ করে রইলেন। তারপর খুব আস্তে, যেন নিজের
সঙ্গেই কথা বলছেন,
—তাইলে... রফিকুলের ফোন
কেনে আসে না?
পাঁচ দিন। আজ ধরে টানা পাঁচ দিন হল, ছেলের কোনো ফোন
আসেনি। বুকের ভেতরটা কেমন খাঁ খাঁ করছিল। রাতে ঠিকমতো ঘুমও
আসেনি। বারবার মনে হয়েছে—এই বুঝি ফোনটা
বেজে উঠল। কিন্তু ফোনটা নীরবই থেকেছে।
রাতটা কোনোরকমে কাটিয়ে ভোরবেলা, মোরগের ডাকাডাকি
আরম্ভ হতেই ছুটে গেলেন পাশের বাড়ির ইমরানের কাছে। ইমরান স্নাতক তৃতীয় বর্ষের ছাত্র, সামনে ফাইনাল
পরীক্ষা। কাকভোরে উঠে পড়তে বসেছে। আব্দুস সালাম দরজায় দাঁড়িয়েই বললেন,
—হাঁ বেটা ইমরান, উঠিছি বা, ক’দিন ধরি তোর
রফিকুল দা’র ফোন আসে না। একবার এনা ফোনটা লাগেই দি তো।
ইমরান ফোনটা হাতে নিয়ে নম্বর ডায়াল করল। ফোনে কলার টিউন
বেজেই চলেছে—
“রাব্বির হাম্হুমা
কামা রাব্বাইয়ানি সাগীরা…”
দোয়ার সুরটা যেন আব্দুস সালামের বুকের ভেতর কোথাও
গিয়ে ধাক্কা মারছিল। রিং শেষ হলো, কেউ ধরল না। আবার ডায়াল। আবার সেই কলার টিউন—
“রাব্বির হাম্হুমা
কামা রাব্বাইয়ানি সাগীরা…”
প্রতিটা শব্দ যেন তাঁর জীবনের গল্পই বলছে—শৈশব থেকে কোলে
করে বড় করে তোলার গল্প, কাঁধে করে শাটিমারি-আঙ্গারিবন হাটে নিয়ে যাওয়ার গল্প, টাকা
বাঁচিয়ে বাতাসা-জিলিপি-খুরমা কেনার গল্প। তৃতীয়বার রিং
হতেই হঠাৎ ফোনটা রিসিভ হলো। আব্দুস সালাম আর নিজেকে সামলাতে
পারলেন না। উৎকণ্ঠা আর জমে থাকা অভিমান মিশিয়ে একনাগাড়ে বলে চললেন,
—রফিকুল, ভালো আছি বা তুই? আইজ ছ’দিন হলি তোর ফোন
আসে না, কুনো খোঁজখবর নাই। তোর মাও খুব
চিন্তা করছে...
ও প্রান্ত থেকে এক গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল,
—রফিকুল অসুস্থ।
এখন ঘুমোচ্ছে। আমি ওর শ্বশুর বলছি। আপনি পরে ফোন করবেন।
লাইন কেটে গেল।
কথাটা শুনে আব্দুস সালামের বুকটা কেমন ছ্যাঁত করে
উঠল। যেন ভেতরের সব শক্তি হঠাৎ ফুরিয়ে গেছে। গুম মেরে বসে
থাকলেন দীর্ঘক্ষণ। তারপর যখন ইমরানের ঘর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলেন, ততক্ষণে সূর্যের আলো এসে পড়েছে
পুন্যাদীঘির জলে। আর তাঁর চোখের কোণে জমে উঠেছে নোনাজল। ঘরে ফিরে দেখলেন, দরজার সামনে
দাঁড়িয়ে আছেন গিন্নী, তাঁর সহযোদ্ধা। চোখে উৎকণ্ঠা, মুখে অজানা
আশঙ্কা। আব্দুস সালাম মুখে কিছুই বলতে পারলেন না। কিন্তু তাঁর চোখের জল বাঁধ মানল
না। তবে সেই কান্নার
আসল কারণটা কী—ছেলের অসুস্থতা, না কি শহরের
জীবনে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া একমাত্র সন্তানের অবহেলার যন্ত্রণা—তা অজানাই থেকে
গেল।
০৪/০৫/২০১৬
পার্কসার্কাস, কোলকাতা

No comments:
Post a Comment